শান্তিতে নোবেল পাওয়ার পর নাভি পিল্লাই বললেন, ‘এটি কি সত্যি?’

আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের পক্ষে দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রখ্যাত আইনজ্ঞ নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। অথচ জীবনের অন্যতম বড় স্বীকৃতির খবর শুনেও প্রথমে যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না ৮৫ বছর বয়সী এই আইনজ্ঞ। তার মুখে তখন একটাই প্রশ্ন—‘এটি কি সত্যি?’
নোবেল কমিটি পুরস্কারের খবর জানাতে তাকে ফোন করেছিল। কিন্তু ফোন ধরতে না পারায় সরাসরি কমিটির কাছ থেকে খবরটি শোনা হয়নি পিল্লাইয়ের। পরে সহকর্মীদের কাছ থেকে নোবেল পাওয়ার খবর জানতে পারেন তিনি। তবে এত বড় একটি ঘোষণা শুনেও নিশ্চিত হতে চাইছিলেন, খবরটি আদৌ সত্যি কি না। খবরটি প্রকাশ করেছে আরটিই।
একজন আইনজীবী ও বিচারক হিসেবে কোনো তথ্য যাচাই না করে মেনে নেওয়া তার স্বভাব নয়। তাই নিজের নোবেল পাওয়ার খবরটিও যাচাই করতে চেয়েছিলেন তিনি। পাশে থাকা একজন তাকে জানান, বিবিসিতেও খবরটি প্রচার করা হচ্ছে। অর্থাৎ, এটি নিছক গুজব হওয়ার কথা নয়। নোবেল পাওয়ার খবর শোনার পর পিল্লাইয়ের এই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ক্যামেরাবন্দি করেন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড। পুরস্কার ঘোষণার সময় পিল্লাই ছিলেন নুরেমবার্গ আদালতে। সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিদের সঙ্গে তার কথোপকথনে যেমন ধরা পড়ে বিস্ময়, তেমনি দেখা যায় তার স্বভাবসুলভ রসবোধও।
উপস্থিত ব্যক্তিরা যখন তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন, তখন মজা করে পিল্লাই বলেন, তারা যদি আরও বেশি অভিনন্দন জানান, তাহলে তিনি তার পুরস্কার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ভাগ করে নেবেন। তার এমন মন্তব্যে উপস্থিত সবাই হেসে ওঠেন। তবে হাসি-রসিকতার মধ্যেও নিজের পেশাগত সততার জায়গা থেকে সরে আসেননি তিনি। নোবেল পাওয়ার খবর সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করে বলেন, ‘একজন আইনজীবী এবং বিচারক হিসেবে, আমি এখনো এটির সত্যতা যাচাই করতে চাই।’
গাজা নিয়ে প্রতিবেদন, সাহসের প্রশ্ন
নাভি পিল্লাইয়ের নোবেলপ্রাপ্তির খবরের সঙ্গে আলোচনায় এসেছে ফিলিস্তিনের গাজা পরিস্থিতি নিয়ে তার কাজও। তার নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশন অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড তদন্ত করে। কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় ফিলিস্তিনিদের ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে ইসরায়েল গণহত্যা চালিয়েছে। গত বছর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে ইসরায়েল।
পুরস্কার পাওয়ার খবর শোনার পর নিজের সাম্প্রতিক কাজের প্রসঙ্গ টেনে পিল্লাই বলেন, গাজা নিয়ে তৈরি প্রতিবেদন জমা দেওয়াই ছিল তার সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, গাজায় গণহত্যা হচ্ছে। প্রতিবেদনটি পড়ার পর অনেকেই তার সাহসের প্রশংসা করেছেন বলে জানান তিনি। তবে সেই প্রশংসা তাকে বিস্মিত করেছে। তার প্রশ্ন, ‘শুধুমাত্র সত্য বলতে কেন কাউকে সাহসী হতে হবে?’
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ন্যায়বিচার ও সত্য প্রকাশের বিষয়ে তার অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার কাছে সত্য তুলে ধরা কোনো অসাধারণ সাহসিকতার বিষয় হওয়ার কথা নয়; বরং দায়িত্ব পালনেরই অংশ।
আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারে দীর্ঘ পথচলা
নাভি পিল্লাইয়ের কর্মজীবন আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার ও বিচারব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবেও কাজ করেছেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার, মানবাধিকারের সুরক্ষা এবং নিপীড়িত মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার তার সেই দীর্ঘ পথচলার স্বীকৃতি হিসেবে এসেছে।
তবে পুরস্কার পাওয়ার মুহূর্তে তার প্রতিক্রিয়া ছিল প্রচলিত উদ্যাপনের চেয়ে আলাদা। নিজের অর্জনের খবরেও প্রশ্ন তোলা, তথ্য যাচাই করতে চাওয়া এবং সত্য বলার জন্য সাহসের প্রয়োজন কেন—এমন প্রশ্ন সামনে আনা যেন তার পেশাগত দর্শনেরই প্রতিফলন।
নোবেল পাওয়ার খবর শুনে ‘এটি কি সত্যি?’—নাভি পিল্লাইয়ের এই বিস্মিত প্রশ্ন তাই কেবল একটি পুরস্কারপ্রাপ্তির মুহূর্তের গল্প নয়। এর সঙ্গে মিশে আছে তথ্যের সত্যতা যাচাই, ন্যায়বিচারের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সত্য উচ্চারণের অধিকার নিয়ে তার দীর্ঘদিনের অবস্থান।



