৯ অক্টোবর, ২০২৬ | শুক্রবারবাংলা: ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩
জীবনযাপন

বিশ্ব ডাক দিবস: নতুন সেবায় আয় বাড়ছে, তবু ঘাটতি কাটছে না ডাক বিভাগের

World-Post-Day-68e746853ee4e

ডিজিটাল যোগাযোগের বিস্তারে ব্যক্তিগত চিঠির প্রচলন কমেছে, বদলে গেছে মানুষের যোগাযোগের ধরনও। তবে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেবার পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করছে বাংলাদেশের ডাক বিভাগ। সরকারি নথি ও পাসপোর্ট পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে পার্সেল পরিবহন এবং ই-কমার্স পণ্য সরবরাহ—বিভিন্ন খাতে যুক্ত হচ্ছে নতুন কার্যক্রম। এতে আয় বাড়লেও প্রতিষ্ঠানের বিশাল পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে সেই আয় সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে উঠছে না।

আজ বিশ্ব ডাক দিবস। এমন সময়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে, যখন একদিকে ডাক বিভাগের সেবায় বৈচিত্র্য এসেছে, অন্যদিকে আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে প্রতিষ্ঠানটির সামনে রয়ে গেছে নানা চ্যালেঞ্জ।

একসময় দূর-দূরান্তে খবর পাঠানোর অন্যতম নির্ভরযোগ্য মাধ্যম ছিল ডাক বিভাগ। ডাকপিয়নের অপেক্ষা, হাতে লেখা চিঠি কিংবা দূরদেশ থেকে আসা খামের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মানুষের আবেগ ও স্মৃতি। মোবাইল ফোন, ই-মেইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তায় সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। ব্যক্তিগত চিঠির জায়গা নিয়েছে দ্রুতগতির ডিজিটাল যোগাযোগ। ফলে নিজেদের কার্যক্রম টিকিয়ে রাখতে ডাক বিভাগকে এখন নতুন ধরনের সেবার ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।

আয় বাড়লেও ব্যয়ের চাপ বড়

দেশে প্রায় ১০ হাজার ডাকঘর রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৬০০টি সরাসরি ডাক বিভাগের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। অন্যগুলো এজেন্টের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ব্যক্তিগত চিঠির ব্যবহার কমলেও সরকারি ও অন্যান্য ডাক পরিবহনের পরিমাণ বেড়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ডাক বিভাগের মাধ্যমে প্রায় ৩ কোটি ৫ লাখ সরকারি ও অন্যান্য চিঠিপত্র পরিবহন করা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আরও বেড়ে প্রায় ৩ কোটি ৬৪ লাখ হয়েছে।

Advertisements

ডাক পরিবহনের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি রাজস্ব আয়েও অগ্রগতি হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ডাক বিভাগের আয় ছিল প্রায় ২১৯ কোটি টাকা। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে ২৫৩ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয় আরও বেড়ে হয়েছে প্রায় ৩৩৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন বছরে আয় বেড়েছে প্রায় ১১৭ কোটি টাকা।

তবে আয়ের এই অগ্রগতি সত্ত্বেও আর্থিক চাপ কমেনি। কারণ, ডাক বিভাগের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় হয় প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। পেনশন ও আনুতোষিক খাতে ব্যয় ২৬০ কোটি টাকার বেশি। সব মিলিয়ে মোট বাজেটের প্রায় ৯৩ শতাংশ বেতন, পেনশন ও প্রশাসনিক ব্যয়ে চলে যায়। ফলে নতুন সেবা চালু করে আয় বাড়ানোর চেষ্টা চললেও আয়-ব্যয়ের ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে রয়ে গেছে।

চিঠি থেকে পার্সেল, সেবার ধরনে পরিবর্তন

আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে ডাক বিভাগ এখন প্রচলিত ডাকসেবার বাইরে বিভিন্ন কার্যক্রমে গুরুত্ব দিচ্ছে। পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং ভূমির খতিয়ান বা পরচা গ্রাহকের ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার মতো সেবা এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এ পর্যন্ত সাত লাখের বেশি ভূমি রেকর্ড গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

মোবাইল আর্থিক সেবা ‘নগদ’ থেকেও ডাক বিভাগ রাজস্ব আয় করে। ২০১৯ সালে চালু হওয়া এ সেবা থেকে আগে বছরে গড়ে ১৩ থেকে ১৪ কোটি টাকা আয় হতো। সর্বশেষ অর্থবছরে এ খাতের আয় হয়েছে ১৮ কোটি টাকা।

এ ছাড়া ডাকযোগে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থাও নতুন কার্যক্রমের তালিকায় যুক্ত হয়েছে। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে দেশে ও বিদেশে অবস্থানরত ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৩ জন এই সুবিধা নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পণ্য পরিবহনেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের মার্চে চালু হওয়া স্পিড পোস্টের মাধ্যমে এ পর্যন্ত প্রায় ৮১১ টন পণ্য পরিবহন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পার্সেল পরিবহনের পরিমাণও বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে যেখানে ২৪৩ টন পণ্য পরিবহন করা হয়েছিল, চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে ৩১৬ টনে পৌঁছেছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে চিঠিনির্ভরতা কমিয়ে বাণিজ্যিক সেবার পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি।

বেসরকারি কুরিয়ারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় চ্যালেঞ্জ

পণ্য পরিবহনের বাজারে ডাক বিভাগের সামনে বড় প্রতিযোগী বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো। দ্রুত ডেলিভারি, মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে পার্সেলের অবস্থান জানা এবং গ্রাহকের বাসা থেকে পণ্য সংগ্রহের মতো সুবিধা দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান নিজেদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেছে।

অন্যদিকে, ডাক বিভাগের কিছু কার্যক্রম এখনো পুরোনো অবকাঠামো ও জনবলসংকটের কারণে সীমাবদ্ধতার মুখে রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ কর্মী এবং দ্রুত পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে এগিয়ে থাকা কঠিন হতে পারে।

পচনশীল পণ্য পরিবহনেও রয়েছে সমস্যা। পর্যাপ্ত তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা ও আধুনিক সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে পরিবহনে দেরি হলে ফলসহ বিভিন্ন পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে শুধু সেবার সংখ্যা বাড়ানো নয়, সরবরাহের মান উন্নয়নও ডাক বিভাগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিসে ব্যয় কমানোর উদ্যোগ

পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও সেবার পরিধি বাড়ানোর লক্ষ্যে নতুন পদ্ধতি চালু করেছে ডাক বিভাগ। গত ২৯ জুলাই থেকে ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস ও পোস্ট পিকআপ পয়েন্টের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ঢাকা, রাজশাহী ও খুলনাসহ ১২টি অঞ্চলে এ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ে তা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এই ব্যবস্থায় চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ডাক বিভাগের নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে চিঠি ও পার্সেল সংগ্রহ এবং বিতরণ করতে পারবে। স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী এসব কেন্দ্র প্রচলিত ডাকঘরের তুলনায় দীর্ঘ সময় খোলা রাখার সুযোগও থাকবে।

এ উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন অবকাঠামো গড়ে তোলার ব্যয় কমিয়ে গ্রাহকদের কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে উদ্যোগটি কতটা কার্যকরভাবে পরিচালিত হয় এবং আর্থিক ঘাটতি কমাতে কতটা ভূমিকা রাখে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন ও সেবার মানের ওপর।

বিশ্ব ডাক দিবসে আধুনিকায়নের প্রত্যাশা

এ বছরের বিশ্ব ডাক দিবসের প্রতিপাদ্য ‘সমন্বিত ডাক নেটওয়ার্ক, সীমাহীন সম্ভাবনা’। বাংলাদেশে ৯ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত পালিত হচ্ছে ডাক সপ্তাহ। দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চিঠি উৎসব, ডাকটিকিট প্রদর্শনী ও ডাকমেলার আয়োজন করা হয়েছে। শুক্র ও শনিবার সঞ্চয় ব্যাংকের কার্যক্রম ছাড়া ডাকঘরের অন্যান্য সেবা চালু রাখার কথা জানানো হয়েছে।

বিশ্ব ডাক দিবস উপলক্ষে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেছেন, ডাক বিভাগ এখন আর কেবল প্রচলিত চিঠিপত্র আদান-প্রদানের মাধ্যম নয়; এটি আধুনিক ও বহুমুখী সেবা নেটওয়ার্কে রূপ নিচ্ছে। জনগণের আস্থা অর্জনকে তিনি প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

সব মিলিয়ে ডাক বিভাগের সামনে এখন দুটি বড় কাজ—নতুন সেবার মাধ্যমে আয় বাড়ানো এবং দীর্ঘদিনের ব্যয়ভার নিয়ন্ত্রণে আনা। পার্সেল পরিবহন, সরকারি নথি সরবরাহ ও ফ্র্যাঞ্চাইজি কার্যক্রম সম্প্রসারণের মতো উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও আর্থিক ব্যবধান কমাতে আরও কার্যকর ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা এবং দ্রুত ডেলিভারি নিশ্চিত করা জরুরি। ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠান কতটা সফলভাবে আধুনিক চাহিদার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যতের অগ্রগতি।

Advertisements