৯ অক্টোবর, ২০২৬ | শুক্রবারবাংলা: ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩
জীবনযাপন

একাকিত্ব কমিয়ে মন ভালো রাখে পোষা প্রাণী

IMG_5970

শহুরে ব্যস্ত জীবন, পরিবারের সদস্যদের দূরে সরে যাওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ কমে যাওয়ার কারণে অনেকের জীবনেই একাকিত্ব বাড়ছে। প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ বাড়লেও সরাসরি মানুষের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ কমে যাওয়ায় এই সমস্যা আরও প্রকট হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে পোষা প্রাণীর সঙ্গে তৈরি হওয়া সম্পর্ক অনেকের একাকিত্ব কমাতে এবং মানসিক প্রশান্তি আনতে সহায়ক হতে পারে।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষ স্বভাবতই সামাজিক প্রাণী। অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ, সঙ্গ এবং আবেগের আদান-প্রদান মানসিক সুস্থতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। পোষা প্রাণী মানুষের সেই সঙ্গের প্রয়োজন কিছুটা পূরণ করতে পারে। সময়ের সঙ্গে একটি পোষা প্রাণী শুধু ঘরের সদস্য বা পোষ্য হিসেবে থাকে না, অনেকের কাছে পরিবারের একজন হয়ে ওঠে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মল্লিকা রায় বলেন, ঘরে পোষা প্রাণী থাকলে মানুষের মধ্যে ভালো লাগা ও মানসিক প্রশান্তি তৈরি হতে পারে। প্রাণীগুলো সাধারণত বিশ্বস্ত ও আদুরে হয় এবং মালিককে চিনতে পারে। মানুষের মতো তারা সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিচার-বিশ্লেষণ করে না। বরং মালিককে তার নিজের মতো করেই গ্রহণ করে।

২০১৯ সালের মে মাসে হিউম্যান অ্যানিম্যাল বন্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এইচএবিআরআই) ও মার্স পেটকেয়ারের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত একটি জরিপেও পোষা প্রাণীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ইতিবাচক প্রভাবের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। জরিপে ৮৫ শতাংশ মানুষ বলেছেন, ঘরে পোষা প্রাণী থাকলে তার সঙ্গ একাকিত্বের অনুভূতি কমাতে পারে। ৭৬ শতাংশের মতে, পোষা প্রাণীকে কেন্দ্র করে তাদের সামাজিক যোগাযোগের পরিধি বেড়েছে। আর ৭২ শতাংশ বলেছেন, মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে তৈরি হওয়া বন্ধন সামাজিকীকরণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

পোষা প্রাণী মানুষের জীবনে নিয়মিত রুটিন তৈরিতেও ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে খাবার দেওয়া, পানি পরিবর্তন, পরিচর্যা, হাঁটাতে নিয়ে যাওয়া কিংবা খেলাধুলার মতো দায়িত্বগুলো মানুষকে ব্যস্ত রাখে। এতে দায়িত্ববোধ ও মমতা তৈরি হয়, পাশাপাশি প্রাণীটির সঙ্গে গড়ে ওঠে আবেগের সম্পর্ক। এই সম্পর্ক অনেকের জীবনের মানসিক শূন্যতা কমাতে পারে।

পোষা প্রাণীর উপস্থিতি মানসিক চাপ কমাতেও সহায়ক হতে পারে। বাইরে থেকে ঘরে ফেরার পর পোষা প্রাণীর স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যর্থনা, কাছে এসে বসা বা গা ঘেঁষে থাকার মতো আচরণ মানুষের মন ভালো করতে পারে। এতে দিনের জমে থাকা চাপ কিছুটা কমে এবং কারও কাছে নিজের গুরুত্ব রয়েছে—এমন অনুভূতি আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারে।

Advertisements

ড. মল্লিকা রায়ের মতে, পোষা প্রাণী অনেকটা ‘ন্যাচারাল থেরাপিস্ট’-এর মতো কাজ করতে পারে। মানুষের আবেগের পরিবর্তন অনেক সময় তারা বুঝতে পারে। মালিক মন খারাপ করে থাকলে তার কাছে গিয়ে বসে থাকা বা গা ঘেঁষে থাকার মতো আচরণ মানসিকভাবে স্বস্তি দিতে পারে।

এ ছাড়া পোষা প্রাণী সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবেও কাজ করতে পারে। পোষা প্রাণীকে বাইরে নিয়ে গেলে অন্য পোষ্যপ্রেমীদের সঙ্গে পরিচয় ও কথাবার্তার সুযোগ তৈরি হয়। প্রতিবেশীদের মধ্যেও পোষা প্রাণীকে কেন্দ্র করে নতুন সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে। ফলে সামাজিক যোগাযোগের পরিধি বাড়ে এবং একাকিত্বের অনুভূতি কমতে পারে।

মানুষ ও পোষা প্রাণীর সম্পর্কের পেছনে শারীরবৃত্তীয় প্রভাবও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পোষা প্রাণীর সঙ্গে পারস্পরিক যোগাযোগের ফলে শরীরে অক্সিটোসিন হরমোনের নিঃসরণ বাড়তে পারে। এই হরমোন মানসিক চাপ কমানো, আবেগগত বন্ধন ও আস্থা বাড়ানো এবং সামাজিক আচরণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে স্ট্রেসের সঙ্গে সম্পর্কিত কর্টিসল হরমোনের মাত্রা কমাতেও এর ভূমিকা থাকতে পারে।

তাই একাকিত্বের সময়ে পোষা প্রাণীর সঙ্গ শুধু সময় কাটানোর মাধ্যম নয়; নিয়মিত যত্ন, আবেগের বন্ধন, দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করে এটি অনেকের জীবনে মানসিক প্রশান্তি ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

Advertisements