নিরাপদ পানির নিশ্চয়তায়, ২৫ হাজার কোটি টাকার সমন্বিত প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার

নদী-নালা, খাল-বিল আর অসংখ্য জলাধারে ঘেরা বাংলাদেশ। অথচ দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠীর জন্য এখনো নিরাপদ ও সুপেয় পানির নিশ্চয়তা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা, আর উত্তরের বিভিন্ন এলাকায় পানির সংকট ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতায় দেশের মানুষের কাছে নিরাপদ পানি পৌঁছে দিতে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার একটি সমন্বিত প্রকল্পের পরিকল্পনা করছে সরকার।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সচিবালয়ে জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান।
বৈঠকে আলোচনার মূল বিষয় ছিল দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করার উপায়। মন্ত্রী বলেন, পানি মানুষের জীবনের অপরিহার্য অংশ হলেও দূষিত ও জীবাণুযুক্ত পানি একই সঙ্গে মানুষের জন্য ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই শুধু পানির প্রাপ্যতা নয়, সেই পানি কতটা নিরাপদ—সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশের পানি পরিস্থিতির সঙ্গে জলবায়ু ও নদীর প্রবাহের বিষয়টিও গভীরভাবে জড়িত বলে উল্লেখ করেন তিনি। দেশের নদীগুলোতে একসময় প্রচুর পানি থাকলেও বর্তমানে অনেক নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। উজানে পানি প্রত্যাহারের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। এর একটি বড় প্রভাব দেখা যাচ্ছে উত্তরাঞ্চলে। পানির স্বল্পতার কারণে সেখানে ধীরে ধীরে মরুকরণের মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলে দেখা দিচ্ছে ভিন্ন সংকট। নদীপথে মিঠা পানির প্রবাহ কমে গেলে বঙ্গোপসাগরের লবণাক্ত পানি ক্রমে উজানের দিকে প্রবেশ করে। ফলে উপকূলীয় এলাকাগুলোতে সুপেয় পানির সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।

দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য এই সংকট নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে উপকূলের অনেক এলাকায় খাবার পানি সংগ্রহ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও দূর-দূরান্ত থেকে পানি আনতে হচ্ছে, আবার কোথাও লবণাক্ততার কারণে স্থানীয় পানির উৎস ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা এখন শুধু উন্নয়ন পরিকল্পনার বিষয় নয়, মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত একটি জরুরি প্রশ্ন।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় একটি সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভাবছে সরকার। মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার সমান। তবে এই অর্থ কোনো একক সংস্থার কাছ থেকে আসবে না। ইউনিসেফের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, ওয়াটারএইডসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাকে নিয়ে সমন্বিতভাবে পরিকল্পনাটি এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। প্রকল্পের অর্থায়ন কীভাবে হবে এবং বিভিন্ন সংস্থা কীভাবে একসঙ্গে কাজ করবে, বৈঠকে এসব বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, মানুষের কাছে নিরাপদ পানি পৌঁছে দেওয়া স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে শুধু অর্থ বরাদ্দ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না—বিদেশি সহায়তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় দাতা সংস্থার কাছ থেকে সহায়তা পেলেও অতীতে সেই অর্থ ও সহযোগিতার যথাযথ ব্যবহার সবসময় সম্ভব হয়নি। এর পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিদেশি সহায়তার পরিমাণও কমছে বলে জানান তিনি। ধনী দেশগুলো নিজেরাও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে থাকায় উন্নয়ন সহায়তার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে।
তবু নিরাপদ পানির মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে দেশের পানি সংকটাপন্ন অঞ্চলগুলোতে নিরাপদ পানির সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে পানি ব্যবস্থাপনায়ও পরিবর্তন আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কারণ বাংলাদেশের জন্য নিরাপদ পানি এখন আর শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্পের বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, জলবায়ু ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা একটি জাতীয় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার এই উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।



