৮ অক্টোবর, ২০২৬ | বৃহস্পতিবারবাংলা: ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩
বিনোদন

স্ত্রীর সঙ্গে ৩৫ বছর আলাদা, দুই তারকার সঙ্গে প্রেমের টানাপোড়েন – তবু কেন ডিভোর্স নেননি নানা পাটেকর?

1684096766_16-lead

পর্দায় তিনি ছিলেন কঠিন, তীক্ষ্ণ আর আপসহীন এক চরিত্রের প্রতীক। সংলাপ, চোখের দৃষ্টি কিংবা অভিনয়ের গভীরতায় দর্শককে বারবার চমকে দিয়েছেন নানা পাটেকর। কিন্তু পর্দার সেই কঠোর মানুষটির ব্যক্তিজীবনের গল্প ছিল অনেক বেশি নরম, জটিল এবং বেদনাবিধুর। সন্তান হারানোর শোক, দীর্ঘদিনের দাম্পত্যে দূরত্ব, বছরের পর বছর আলাদা থাকা এবং বলিউডের জনপ্রিয় দুই অভিনেত্রীর সঙ্গে সম্পর্কের গুঞ্জন—সব মিলিয়ে নানা পাটেকরের জীবন ছিল নানা স্তরের গল্পে ভরা।

মৃত্যুর পর সেই পুরোনো অধ্যায়গুলোই আবার আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে একটি প্রশ্ন ঘুরছে বারবার—প্রায় ৩৫ বছর স্ত্রী নীলকান্তি পাটেকরের সঙ্গে আলাদা থেকেও কেন তাঁদের আইনগত বিচ্ছেদ হয়নি?

নানা পাটেকর ৮ অক্টোবর ভারতের গোয়ায় নিজের বাসভবনে হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার পর হাসপাতালে মারা যান বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। তাঁর প্রয়াণের পর অভিনয়জীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনের নানা অধ্যায়ও নতুন করে সামনে আসছে।

থিয়েটারের মঞ্চ থেকে দাম্পত্যের শুরু

১৯৭৮ সালে নীলকান্তি পাটেকরকে বিয়ে করেন নানা। থিয়েটারে কাজ করার সময় তাঁদের পরিচয়। নীলকান্তি তখন একটি ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন। এর আগে তিনি মারাঠি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। বিয়ের পর তাঁদের সংসারে আসে দুই সন্তান। কিন্তু সুখের সেই সংসারে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নেমে আসে গভীর শোক। তাঁদের প্রথম সন্তানকে মাত্র আড়াই বছর বয়সে হারাতে হয়। সন্তান হারানোর এই ঘটনা দুজনের জীবনেই তৈরি করে গভীর ক্ষত।

সন্তান হারানোর শোক

Advertisements

সন্তান হারানোর বেদনা কোনো পরিবারের জন্যই সহজ নয়। নানা পাটেকরের ক্ষেত্রেও এই শোক ছিল গভীর। বিভিন্ন সময়ে সাক্ষাৎকারে তিনি সন্তান হারানোর সেই কঠিন সময়ের কথা বলেছেন। জীবনের এই ঘটনা তাঁর মানসিক জগতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

তবে প্রথম সন্তানকে হারানোর পর দাম্পত্যজীবনও আর আগের মতো থাকেনি। মতের অমিল ও ব্যক্তিত্বের পার্থক্যসহ নানা কারণে ধীরে ধীরে তাঁদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। একসময় তাঁরা আলাদা থাকতে শুরু করেন।

৩৫ বছর আলাদা, তবু বিচ্ছেদ নয়

নানা ও নীলকান্তির দাম্পত্যের সবচেয়ে আলোচিত দিক সম্ভবত এটাই। দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর তাঁরা আলাদা জীবন কাটিয়েছেন। কিন্তু কাগজে-কলমে তাঁদের সম্পর্কের ইতি ঘটেনি।

অর্থাৎ, একই ছাদের নিচে না থেকেও তাঁরা আইনগতভাবে স্বামী-স্ত্রী ছিলেন। নানা পাটেকরের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল ছিল। কেন তাঁরা ডিভোর্স নেননি—এর সরাসরি ও নিশ্চিত ব্যাখ্যা নানা বা নীলকান্তির পক্ষ থেকে সবসময় পাওয়া যায়নি। তাই এ বিষয়ে নানা ধরনের আলোচনা থাকলেও নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।

তবে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা অতীতের স্মৃতির কারণে তাঁরা আইনি বিচ্ছেদের পথে হাঁটেননি—এমন ধারণা রয়েছে। আবার নানা পাটেকরের ব্যক্তিজীবনে পরবর্তী সময়ে উঠে আসা সম্পর্কের গুঞ্জনও এই দাম্পত্যকে আরও আলোচনায় এনেছিল।

মনীষা কৈরালাকে ঘিরে আলোচিত অধ্যায়

নানা পাটেকরের ব্যক্তিজীবনের সবচেয়ে আলোচিত সম্পর্কগুলোর একটি মনীষা কৈরালাকে ঘিরে। নব্বইয়ের দশকে ‘অগ্নি সাক্ষী’ ছবিতে একসঙ্গে কাজ করার সময় তাঁদের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় বলে ভারতীয় গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
পরে সেই ঘনিষ্ঠতা প্রেমের সম্পর্কে রূপ নেয়—এমন খবরও ছড়িয়ে পড়ে। তবে তখন নানা পাটেকর বিবাহিত ছিলেন। ফলে সম্পর্কটি স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।

সম্পর্কটি শেষ পর্যন্ত টেকেনি। তাঁদের সম্পর্কের ভেতরের নানা ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে নানা দাবি প্রকাশিত হয়েছে। মনীষা কৈরালাও পরবর্তী সময়ে সেই সময়কার কিছু অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেছেন। তবে তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের সব ঘটনা নিয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না।

আয়েশা জুলকার নামও এসেছিল আলোচনায়

নানা পাটেকরের সঙ্গে অভিনেত্রী আয়েশা জুলকার ঘনিষ্ঠতা নিয়েও একসময় বলিউডে আলোচনা ছিল। ‘আঁচ’ ছবিতে একসঙ্গে কাজ করার সময় তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে নানা দাবি উঠে আসে। তবে এই সম্পর্কের বিষয়টিও মূলত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও দীর্ঘদিনের গুঞ্জনের ওপর নির্ভরশীল। তাই এটিকে নিশ্চিত প্রেমের সম্পর্ক হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত।

তাহলে কেন বিচ্ছেদ হয়নি?

নানা পাটেকরের জীবনকে বাইরে থেকে দেখলে প্রশ্নটি খুব স্বাভাবিক—যেখানে স্বামী-স্ত্রী প্রায় ৩৫ বছর আলাদা, সেখানে আইনি বিচ্ছেদ না করার কারণ কী? এর সুনির্দিষ্ট উত্তর হয়তো শুধু নানা ও নীলকান্তিই জানতেন। তাঁদের সম্পর্কের ভেতরে হয়তো ভালোবাসার চেয়ে অন্য কোনো বন্ধন বেশি শক্তিশালী ছিল—দায়িত্ব, সন্তানের প্রতি টান, পারস্পরিক শ্রদ্ধা কিংবা বহু বছরের যৌথ জীবনের স্মৃতি। দাম্পত্য সবসময় একই ছাদের নিচে বসবাসের নাম নয়। কখনো কখনো মানুষ সম্পর্কের ভেতর থেকেও দূরে সরে যায়, আবার দূরত্ব তৈরি হলেও সম্পর্কের একটি অদৃশ্য বন্ধন থেকে যায়। নানা ও নীলকান্তির সম্পর্ক হয়তো ছিল তেমনই এক জটিল সমীকরণ।

পর্দায় নানা পাটেকরকে দর্শক দেখেছেন শক্ত, রাগী ও আপসহীন চরিত্রে। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিজীবনের গল্পে ছিল হারানোর যন্ত্রণা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, দূরত্ব এবং না-বলা অনেক অনুভূতি। প্রথম সন্তানকে হারানোর বেদনা থেকে শুরু করে দীর্ঘ বিচ্ছিন্ন দাম্পত্য—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর জীবনও যেন তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলোর মতোই বহুস্তরীয়।

আর মৃত্যুর পর সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি থেকে গেল, তার উত্তর হয়তো কখনোই পুরোপুরি জানা যাবে না—৩৫ বছর দূরে থেকেও কেন নীলকান্তির সঙ্গে সম্পর্কের আইনি অধ্যায়টি শেষ করেননি নানা পাটেকর?

Advertisements