৭ অক্টোবর, ২০২৬ | বুধবারবাংলা: ২২ আশ্বিন ১৪৩৩
স্বাস্থ্য

মেনোপজের পর রক্তপাতকে স্বাভাবিক ভাবছেন? হতে পারে ক্যানসার

1606327740_5fbe9dbc0deb4_uterus

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নারীদের মধ্যে এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসারের হার বাড়ছে। জরায়ুর ভেতরের আবরণ বা এন্ডোমেট্রিয়াম থেকে এই ক্যানসারের সূত্রপাত হয়। বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোতে এটি অন্যতম পরিচিত স্ত্রীরোগজনিত ক্যানসার। চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত ওজন, ডায়াবেটিস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং মানুষের গড় আয়ু বাড়ার মতো বিষয়গুলোর কারণে এ রোগের ঝুঁকি ও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।

গ্লোবোক্যান ২০২৪-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বে ওই বছর এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসারে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ৪ লাখ ৩৪ হাজার ৬২০ জন। একই সময়ে এ রোগে মৃত্যু হয়েছে ১ লাখ ৬৮০ জনের বেশি মানুষের। ভারতে নতুন রোগী শনাক্তের সংখ্যা ছিল ২৮ হাজার ৩০৮ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ৬ হাজার ৩৬২।

সংগৃহীত

এই ক্যানসারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেতগুলোর একটি হলো অস্বাভাবিক জরায়ু রক্তপাত। বিশেষ করে মেনোপজ হয়ে যাওয়ার পর আবার রক্তপাত হলে সেটিকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। মেনোপজের আগে নিয়মিত মাসিকের ধরন হঠাৎ বদলে যাওয়া, অতিরিক্ত রক্তপাত কিংবা অনিয়মিত রক্তপাতও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কারণ হতে পারে।

এ ছাড়া যোনিপথে পানির মতো বা রক্ত মেশানো স্রাব, তলপেটে ব্যথা, ভারী চাপ অনুভূত হওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। রোগটি শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়লে অস্বাভাবিক ওজন কমে যাওয়া, পেট ফাঁপা এবং দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল বা ক্লান্ত লাগার মতো সমস্যাও হতে পারে। তাই বিশেষ করে মেনোপজের পর রক্তপাত হলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।

এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে শরীরের হরমোনের ভারসাম্যের সম্পর্ক রয়েছে। অতিরিক্ত ওজন, কখনো গর্ভধারণ না করা, অল্প বয়সে মাসিক শুরু হওয়া এবং দেরিতে মেনোপজ হওয়া এ রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। পিসিওএস, শুধু ইস্ট্রোজেন ব্যবহার করে হরমোন থেরাপি নেওয়া এবং ট্যামোক্সিফেন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি বাড়তে পারে। টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপকেও এ রোগের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়।

অন্যদিকে স্বাস্থ্যকর ওজন ধরে রাখা এবং নিয়মিত শরীরচর্চার মতো অভ্যাস এ রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। একাধিকবার গর্ভধারণ এবং সম্মিলিত মুখে খাওয়ার জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি ব্যবহারের সঙ্গেও তুলনামূলক কম ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

Advertisements

এ রোগের পেছনে বংশগত কারণও ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে লিঞ্চ সিনড্রোম নামের একটি জেনেটিক অবস্থার সঙ্গে এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এই সিনড্রোমে আক্রান্ত নারীদের জীবদ্দশায় এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এ কারণে ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর টিউমারের জিনগত বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করাও চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

অস্বাভাবিক জরায়ু রক্তপাতের মতো সমস্যা নিয়ে কেউ চিকিৎসকের কাছে গেলে সাধারণত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগের কারণ খোঁজা হয়। শুরুতে ট্রান্সভ্যাজাইনাল আলট্রাসাউন্ড করা হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী জরায়ুর আস্তরণ থেকে নমুনা নিয়ে বায়োপসি করা হয়। রক্তপাত চলতে থাকলে বা বায়োপসির ফল পরিষ্কার না হলে হিস্টেরোস্কোপি কিংবা ডি অ্যান্ড সি করা হতে পারে।

ক্যানসার শনাক্ত হলে রোগটি কতটা ছড়িয়েছে এবং টিউমারের ধরন কী—তা জানতে এমআরআই, সিটি স্ক্যান বা পিইটি-সিটি স্ক্যানের মতো পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে। চিকিৎসার ধরন নির্ভর করে রোগের পর্যায়, টিউমারের বৈশিষ্ট্য এবং রোগীর সামগ্রিক অবস্থার ওপর।

এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসারের প্রধান চিকিৎসাগুলোর মধ্যে অস্ত্রোপচার অন্যতম। অনেক ক্ষেত্রে জরায়ুর পাশাপাশি উভয় ফ্যালোপিয়ান টিউব ও ডিম্বাশয় অপসারণ করা হয় এবং লিম্ফ নোডে ক্যানসার ছড়িয়েছে কি না তাও পরীক্ষা করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ ধরা পড়লে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমেই চিকিৎসা সম্পন্ন করা সম্ভব হতে পারে। তবে রোগের ঝুঁকি বেশি হলে বা ক্যানসার অগ্রসর পর্যায়ে থাকলে রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপির পাশাপাশি ইমিউনোথেরাপিও ব্যবহৃত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ক্যানসার প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মেনোপজের পর যেকোনো ধরনের রক্তপাতকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া হলে রোগটি প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত করার সুযোগ বাড়ে। আর প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসায় সফলতার সম্ভাবনাও তুলনামূলক বেশি।

Advertisements