দেনমোহর স্ত্রীর অধিকার, আর্থিক সংকট দেখিয়ে স্বামী দায় এড়াতে পারবেন না: হাইকোর্ট

বিয়ের সময় দেনমোহর নির্ধারণ করে নিকাহনামায় লিখে রাখলেই তা অনির্দিষ্টকাল পরিশোধ না করার সুযোগ নেই। স্ত্রী দাবি করলে বিলম্বিত দেনমোহরও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করতে হবে—এমন গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
একটি মামলার রায়ে আদালত বলেছেন, দেনমোহর কোনো ঐচ্ছিক উপহার নয়; এটি বিয়ের মাধ্যমে স্ত্রীর অর্জিত একটি স্বীকৃত আর্থিক অধিকার। বিয়ের চুক্তি ও মুসলিম আইনের নীতিমালা অনুযায়ী, দেনমোহর অবিলম্বে অথবা স্ত্রীর দাবির পরিশোধযোগ্য। স্ত্রী স্বেচ্ছায় কোনো অংশ মওকুফ না করলে স্বামী সেই অর্থ নিজের কাছে রেখে দিতে পারেন না।
মামলার নথি পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট দেখতে পান, স্ত্রী তার বিয়ে, সন্তান জন্ম এবং পরবর্তী বিবাহবিচ্ছেদের বিষয় সাক্ষ্য ও প্রয়োজনীয় নথির মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন। নিম্ন আদালতগুলোও তার দেনমোহর ও ভরণপোষণের অধিকার স্বীকার করে রায় দিয়েছিলেন। সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্বামীর করা রিভিশন আবেদন শেষ পর্যন্ত খারিজ করে দেন হাইকোর্ট।
রায়ে দেনমোহরের ধর্মীয় ও আইনগত ভিত্তিও বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের আলোকে আদালত বলেন, দেনমোহর স্ত্রীর প্রতি স্বামীর কোনো সাধারণ উপহার নয়। বরং এটি বিয়ের সঙ্গে সঙ্গে স্বামীর ওপর সৃষ্টি হওয়া একটি আর্থিক দায়। ফলে স্ত্রী নিজ ইচ্ছায় তা ছেড়ে না দিলে ওই অর্থ থেকে স্বামী অব্যাহতি পেতে পারেন না।
মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯-এর নিকাহনামার বিষয়টিও রায়ে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দেনমোহরের মোট পরিমাণ, তাৎক্ষণিক দেনমোহর, বিলম্বিত দেনমোহর এবং ইতোমধ্যে পরিশোধিত অর্থের জন্য আলাদা ঘর রয়েছে। তবে নিকাহনামায় কোনো অংশকে বিলম্বিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলেই সেটি অনির্দিষ্ট সময় ধরে আটকে রাখা যাবে না। স্ত্রী দাবি করলে পরিস্থিতি অনুযায়ী ওই অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
বিচারপতি আবদুর রহমান রায়ে দেনমোহরকে স্বামীর কাছে স্ত্রীর পাওনা ঋণের সঙ্গে তুলনা করেছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেনমোহর আদায়ের জন্য কোনো স্ত্রীকে আদালতের দ্বারস্থ হতে হলে এবং স্বামীর সেই অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রাখলে, মামলার পরিস্থিতি বিবেচনায় বিচারিক আদালত ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও বিবেচনা করতে পারেন। দেনমোহর মওকুফের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, কোনো আদালত বা হাইকোর্ট কোনো স্ত্রীর দেনমোহর নিজের সিদ্ধান্তে মওকুফ বা কমিয়ে দিতে পারে না। তবে একজন স্ত্রী চাইলে নিজের ইচ্ছায় দেনমোহরের পুরোটা বা কোনো অংশ স্বামীর অনুকূলে মওকুফ করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে সেটি যে স্বেচ্ছায়, সচেতনভাবে এবং কোনো ধরনের চাপ বা প্রতারণা ছাড়া করা হয়েছে, তার প্রমাণ থাকতে হবে। অর্থাৎ জবরদস্তি, অযাচিত প্রভাব, প্রতারণা কিংবা স্বাধীন সম্মতিকে ক্ষুণ্ন করে নেওয়া কোনো মওকুফকে বৈধ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
মামলায় সন্তানের ভরণপোষণের বিষয়টিও বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেন, স্কুলপড়ুয়া একটি শিশুর খাবার, বাসস্থান, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ভরণপোষণ নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, আবাসন ব্যয় এবং উৎসবসহ শিশুর অন্যান্য প্রয়োজনও বিবেচনায় রাখতে হবে। শেষ পর্যন্ত স্বামীর রিভিশন আবেদন খারিজ করে দেন হাইকোর্ট। নিম্ন আদালতের রায় ও ডিক্রিতে আইনগত বা এখতিয়ারগত কোনো ত্রুটি না পাওয়ায় তা বহাল রাখা হয়। ফলে ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকার ডিক্রিও বহাল থাকে।
হাইকোর্টে স্ত্রীর পক্ষে শুনানি করা আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, দেনমোহর কমিয়ে দেওয়ার এখতিয়ার হাইকোর্টেরও নেই—রায়ে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, দেনমোহর আদায়ের জন্য একজন নারীকে মামলা করতে হলে মূল পাওনার বাইরে তাকে মামলা পরিচালনার জন্য অতিরিক্ত অর্থ ও সময় ব্যয় করতে হয়। অথচ স্বামীর দেনমোহর পরিশোধের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যদি তিনি স্ত্রীকে হয়রানি করেন, তাহলে পরিস্থিতি বিবেচনায় বিচারিক আদালত ক্ষতিপূরণের আদেশ দিতে পারেন।
আইনজীবীদের মতে, দেনমোহর নিয়ে হয়রানির ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি রায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। উদাহরণ হিসেবে তারা বলেন, কোনো নারীর দেনমোহর পাঁচ লাখ টাকা হলেও যদি তাকে বছরের পর বছর সেই অর্থ আদায়ের জন্য হয়রানির শিকার হতে হয়, আদালত পরিস্থিতি বিবেচনায় অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করতে পারেন। এর ফলে দেনমোহরকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ মামলা চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত সমঝোতার পথও তৈরি হতে পারে। সব মিলিয়ে হাইকোর্টের এই রায় দেনমোহরকে শুধু নিকাহনামায় উল্লেখ করা একটি অঙ্ক হিসেবে নয়, বরং স্ত্রীর আইনগত ও আর্থিক অধিকার হিসেবে দেখার বিষয়টি আরও স্পষ্ট করেছে। একই সঙ্গে স্বেচ্ছায় মওকুফ এবং চাপ প্রয়োগ করে মওকুফ করিয়ে নেওয়ার মধ্যেও যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, রায়ে সেটিও পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয়েছে।



