বুলিং থেকে অস্কার জয়, ৮০০ কোটির মালিক কেট

সেই কবে ‘হেভেনলি ক্রিয়েচারস’ করেছিলেন। বয়স তখন সবে ১৭। এরপর কেটে গেছে তিন দশকের বেশি। সেদিনের কিশোরী কেট উইন্সলেট এখন ৫১ বছর বয়সের নারী। গত বছর ৫০ পূর্ণ করে তিনি বলেছিলেন, ‘নারীরা বয়সে যত বড় হন, তত সুন্দর হয়ে ওঠেন।’
একসময় কেটকে স্কুলে ‘ব্লাবার’ বলে ডাকা হতো। শরীর নিয়ে অপমান, অভিনয়জগতে প্রবেশের সংগ্রাম, ২২ বছর বয়সে ‘টাইটানিক’ দিয়ে বিশ্বখ্যাতি, খ্যাতির চাপ, ব্যক্তিজীবনের ভাঙাগড়া, নগ্ন দৃশ্যে অভিনয় নিয়ে বিতর্ক—সব পেরিয়ে আজ কেট উইন্সলেট এমন এক অভিনেত্রী, যিনি বয়স বাড়াকে লুকিয়ে নয়; বরং নিজের শক্তি হিসেবেই গ্রহণ করেছেন। ১৯৭৫ সালের ৫ অক্টোবর ইংল্যান্ডের রিডিংয়ে জন্ম নেওয়া উইন্সলেট আজ ৫১ বছরে পা দিলেন। তাঁর জন্মদিনে ফিরে দেখা তাঁর দীর্ঘ পথচলা।
অভিনয়ের পরিবার, কিন্তু পথটা সহজ ছিল না
কেটের জন্ম এমন একটি পরিবারে, যেখানে অভিনয় ছিল জীবনেরই অংশ। তাঁর বাবা রজার উইন্সলেট ও মা স্যালি দুজনই অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নানা-নানিও থিয়েটারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং রিডিং রিপার্টরি থিয়েটার পরিচালনা করতেন। পরিবারের আর্থিক অবস্থা অবশ্য খুব স্বচ্ছল ছিল না। তাঁর বাবা অভিনয়ের পাশাপাশি সংসার চালাতে নানা ধরনের কাজ করতেন।
শৈশবেই অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় কেটের। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে স্কুলের মঞ্চে অভিনয় করেন। ১১ বছর বয়সে ভর্তি হন রেডরুফস থিয়েটার স্কুলে। সেখান থেকেই বিজ্ঞাপন, মঞ্চ ও টেলিভিশনের ছোটখাটো কাজ শুরু। কিন্তু অভিনয়ের স্বপ্নের পাশাপাশি তখন কেটকে লড়তে হয়েছে নিজের শরীর নিয়ে মানুষের ধারণার সঙ্গেও।
‘মোটা মেয়ে’ বলে বুলিং
ছোটবেলায় ওজন বেশি হওয়ায় স্কুলে নিয়মিত বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন কেট। সহপাঠীরা তাঁকে ‘ব্লাবার’ বলে ডাকত। পরে অভিনেত্রী জানিয়েছেন, সেই সময় মাথা নিচু করে সব সহ্য করাই ছিল তাঁর বেঁচে থাকার কৌশল।
বিষয়টি সেখানেই থামেনি। অভিনয়জগতে ঢোকার পরও শরীর নিয়ে মন্তব্য শুনতে হয়েছে। এমনকি ১৯ বছর বয়সে কেট এতটাই মানসিক চাপে ছিলেন যে প্রায় না খেয়েই থাকতেন। কেটের জন্য সবচেয়ে কষ্টের ছিল, অভিনয়ের যোগ্যতা দিয়ে নয়, শরীরের মাপ দিয়ে তাঁকে বিচার করা। আজ সেই অভিজ্ঞতাই যেন তাঁকে নতুন প্রজন্মের অভিনেত্রীদের পাশে দাঁড়ানোর শক্তি দিয়েছে।
স্যান্ডউইচের দোকান থেকে ‘হেভেনলি ক্রিয়েচার্স’
১৯৯৪ সালে পিটার জ্যাকসনের ‘হেভেনলি ক্রিয়েচার্স’ ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পান কেট। এর আগে তিনি টেলিভিশন ও মঞ্চে কাজ করেছেন, কিন্তু এই ছবিই তাঁকে চলচ্চিত্রের জগতে আলাদা করে পরিচিত করে।
মজার ব্যাপার, ছবিতে অভিনয়ের খবর পাওয়ার সময় কেট একটি স্যান্ডউইচের দোকানে কাজ করছিলেন। ফোনে খবর পাওয়ার পর স্যান্ডউইচ ফেলে বাসে করে বাড়ি ফিরে সবাইকে জানান, তিনি ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছেন। এরপর আসে ‘সেন্স অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি’। ১৯৯৫ সালের ছবিতে এমা থম্পসন ও হিউ গ্রান্টের সঙ্গে অভিনয় করে মাত্র ২০ বছর বয়সেই অস্কারে মনোনয়ন পান কেট। সেখান থেকেই বোঝা যায়, তিনি শুধু তারকা হওয়ার জন্য আসেননি; অভিনেত্রী হিসেবে নিজের জায়গা তৈরি করতেই এসেছেন।
নগ্ন দৃশ্যে অভিনয় নিয়ে বিতর্ক
কেট উইন্সলেটের ক্যারিয়ারের আরেকটি বহুল আলোচিত দিক তাঁর সাহসী অভিনয়। ‘টাইটানিক’-এর বিখ্যাত নগ্ন পোর্ট্রেট দৃশ্য থেকে শুরু করে ‘হোলি স্মোক!’-এর মতো ছবিতে তাঁর খোলামেলা অভিনয় তাঁকে বারবার আলোচনায় এনেছে। কিন্তু কেট কখনোই এসব দৃশ্যকে নিজের অভিনয় পরিচয়ের একমাত্র অংশ হতে দেননি।
বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেটের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলেছে। নগ্ন দৃশ্যে অভিনয়ের ক্ষেত্রে এখন তাঁর আগের মতো স্বাচ্ছন্দ্য নেই। ভবিষ্যতে এমন দৃশ্যের সংখ্যা কমে আসতে পারে বলেও তিনি জানিয়েছেন। তবে বিষয়টিকে তিনি শুধু বয়সের সঙ্গে দেখেন না; বরং নিজের শরীর এবং পর্দায় সেটিকে কীভাবে দেখানো হচ্ছে, সেই সিদ্ধান্তের বিষয় হিসেবেই দেখেন। কেট তাঁর অবস্থানে বরাবরই স্পষ্ট, নারীর শরীরকে কেবল সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে বিচার করা উচিত নয়।
বয়স বাড়াকে ভয় পান না
বয়স বাড়া মানেই অনেকের কাছে একধরনের অস্তিত্ব সংকট, ভয় বা দুশ্চিন্তা। কিন্তু কেট একেবারেই তা নিয়ে ভাবেন না। নিজের মুখের রেখা লুকানোর পরিবর্তে গর্ব করে বলেন, ‘আমি আমার বলিরেখা নিয়ে গর্ব করি। এগুলো আমার জীবনের গল্প বলে; আমি কে, কোথায় গিয়েছি, কী দেখেছি।’
‘ভোগ ইউকে’–তে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন অভিনেত্রী। সেই সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন, ‘নারীরা বয়সে যত বড় হন, তত সুন্দর হয়ে ওঠেন। আমাদের মুখ আসলে আরও নিজের মতো হয়ে ওঠে, হাড়ের গড়নে ঠিকঠাক বসে যায় জীবনের ছাপ, ইতিহাস যুক্ত হয়। আমি চোখের কোণের রেখা, হাতের পেছনের বলিরেখাকে খুব সুন্দর মনে করি।’
তিন দশকের ক্যারিয়ারে নানা ধরনের কাজ করেছেন কেট উইন্সলেট, ঝুলিতে পুরস্কারের সংখ্যাও কম নয়। তবে এসব স্বীকৃতির চেয়ে সময়ের সঙ্গে তিনি যে পরিণত হয়ে উঠেছেন, সেটিই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অভিনেত্রীর ভাষ্যে, ‘গত কয়েক বছরে আমি নারীদের নানা বিষয়ে কথা বলেছি। আজকালকার মেয়েদের উৎসাহিত করার চেষ্টা করেছি। অনেকেই বার্তা পাঠিয়ে জানিয়েছেন, আমার কথা তাঁদের ভালো লেগেছে। মানুষের সঙ্গে এই যে যোগাযোগ, এটি আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
কত সম্পদের মালিক কেট?
‘সেলিব্রিটি নেট ওয়ার্থ’ অনুযায়ী, কেট উইন্সলেটের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এটি ৭৯০ কোটি টাকার কাছাকাছি।
‘টাইটানিক’, ‘দ্য রিডার’, ‘রেভোল্যুশনারি রোড’, ‘ফাইন্ডিং নেভারল্যান্ড’, ‘স্টিভ জবস’-এর মতো চলচ্চিত্রের পারিশ্রমিক, টেলিভিশনের কাজ, প্রযোজনা ও সম্পত্তি—সব মিলিয়েই তাঁর এই সম্পদ তৈরি হয়েছে।



