৭ নভেম্বর, ২০২৬ | শনিবারবাংলা: ২২ কার্তিক ১৪৩৩
বিশ্লেষণ

চীনা নাগরিকদের অলিগলিতে ভিডিও ধারণ, ঘরেও ঢুকে পড়ছেন তারা:ভিডিও যাচ্ছে কোথায়?

mhn_1296 (1)

হাতে দুটি স্মার্টফোন, চোখ ক্যামেরার পর্দায়। সকাল শুরু হতেই রাস্তায় নামেন তাঁরা, চলে রাত পর্যন্ত। কখনো অলিগলি, কখনো দোকানপাট, আবার কখনো মানুষের বসতঘরের ভেতরেও চলছে ভিডিও ধারণ। রাজধানীর উত্তরার টেকপাড়া ও আশপাশের এলাকায় চীনা নাগরিকদের এমন কর্মকাণ্ড ঘিরে তৈরি হয়েছে কৌতূহল, অস্বস্তি ও নানা প্রশ্ন। কিন্তু এত ভিডিও কেন করছেন তাঁরা? আর এসব ভিডিওই বা কোথায় প্রকাশিত হচ্ছে?

রাজধানীর উত্তরার কিছু এলাকায় গেলেই চোখে পড়বে এক অদ্ভুত দৃশ্য। রাস্তার এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত ঘুরে বেড়াচ্ছেন একদল বিদেশি নাগরিক। প্রত্যেকের হাতে দুটি করে মোবাইল ফোন। একটি ফোনে চলছে সরাসরি সম্প্রচার বা লাইভ ভিডিও, অন্যটিতে দেখা যাচ্ছে নানা ধরনের লেখা। কখনো রাস্তার দৃশ্য ধারণ করছেন, কখনো দোকানপাট কিংবা মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ক্যামেরায় তুলে ধরছেন।

প্রথম দেখায় তাঁদের সাংবাদিক, পর্যটক কিংবা গুগল স্ট্রিট ভিউয়ের কর্মী বলে মনে হতে পারে। কিন্তু তাঁদের এই কর্মকাণ্ড কোনো এক দিনের নয়। মাসের পর মাস ধরে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে ভিডিও ধারণের কাজ। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়, কখনো কখনো ভিডিও করতে করতে তাঁরা ঢুকে পড়ছেন স্থানীয় মানুষের বাড়িঘরের ভেতরেও। এমন ঘটনায় একদিকে যেমন কৌতূহলী হচ্ছেন পথচারীরা, অন্যদিকে ব্যক্তিগত পরিসরে অনাকাঙ্ক্ষিত ক্যামেরার উপস্থিতিতে বিরক্ত ও বিব্রত হচ্ছেন বাসিন্দারা।

উত্তরার অলিগলিতে ক্যামেরার রাজত্ব

উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টর ও টেকপাড়া এলাকায় চীনা নাগরিকদের এমন ভিডিও ধারণের ঘটনা বেশি চোখে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এলাকাটিতে দেড় শতাধিক চীনা নাগরিক বিভিন্ন সময় এভাবে ভিডিও ধারণ করেন। তবে তাঁদের প্রকৃত সংখ্যা কিংবা এই কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু একটি নির্দিষ্ট রাস্তা নয়, উত্তরার বিভিন্ন অলিগলিতে তাঁদের দেখা যায়। তবে টেকপাড়া এলাকাতেই তাঁদের আনাগোনা তুলনামূলক বেশি। উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটি খাল। সেই খালের তীরবর্তী এলাকায় গড়ে উঠেছে টেকপাড়া। উত্তরার অপেক্ষাকৃত উন্নত আবাসিক এলাকার তুলনায় এখানে নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস বেশি। ঘনবসতিপূর্ণ এই এলাকার রাস্তাঘাট, দোকানপাট ও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাই যেন তাঁদের ভিডিও ধারণের অন্যতম বিষয়। স্থানীয়দের প্রশ্ন, এলাকার সাধারণ জীবনযাত্রা কিংবা প্রতিদিনের কর্মকাণ্ড ভিডিও করে কী উদ্দেশ্য পূরণ করা হচ্ছে? এসব ভিডিও কোথায় যাচ্ছে, কারা দেখছেন কিংবা কী কাজে ব্যবহার করছেন—তার কোনো স্পষ্ট ধারণা তাঁদের নেই।

Advertisements

একই জায়গায় বারবার ভিডিও, বাড়ছে বিরক্তি

শুরুতে বিষয়টি স্থানীয়দের কাছে ছিল নিছক কৌতূহলের। বিদেশি নাগরিকেরা কেন তাঁদের এলাকার রাস্তাঘাট ও মানুষের জীবনযাত্রা এত আগ্রহ নিয়ে ভিডিও করছেন, তা নিয়ে আলোচনা হতো। কিন্তু দিনের পর দিন একই ঘটনা চলতে থাকায় সেই কৌতূহল এখন অনেকের কাছে বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই দিনে একই এলাকায় একাধিকবার ভিডিও ধারণ করতে দেখা যায় তাঁদের। কখনো রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে, কখনো দোকানের সামনে, আবার কখনো আবাসিক এলাকার ভেতরে ঘুরে ঘুরে ভিডিও করেন তাঁরা। উত্তরার টেকপাড়া এলাকার বাসিন্দা আকরাম হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘দু–এক দিনের ব্যাপার হলে হয়, কিন্তু এরা (চীনা নাগরিক) মাসের পর মাস এমন ভিডিও করে। আমরা ঘুম থেকে ওঠার আগে তারা ভিডিও করা শুরু করে। ঘুমাতে যাওয়ার সময়ও দেখি তারা ভিডিও করে। কিন্তু ভিডিওগুলো কী করে, আমরা জানি না।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, তাঁদের এই কর্মকাণ্ডের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। দিনের শুরু থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে ক্যামেরা হাতে ঘুরতে দেখা যায় তাঁদের। ফলে এলাকায় নতুন আসা মানুষেরাও বিষয়টি দেখে অবাক হন এবং জানতে চান, এত ভিডিও ধারণের কারণ কী।

ব্যক্তিগত পরিসরেও পৌঁছে যাচ্ছে ক্যামেরা

রাস্তা কিংবা দোকানপাটে ভিডিও ধারণ নিয়ে স্থানীয়দের আপত্তি থাকলেও সবচেয়ে বড় অস্বস্তির জায়গা তৈরি হয়েছে আবাসিক এলাকায় তাঁদের প্রবেশকে কেন্দ্র করে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভিডিও করতে করতে কখনো কখনো তাঁরা অনুমতি ছাড়াই মানুষের বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়েন। এমনকি ঘরের ব্যক্তিগত জায়গায়ও ক্যামেরা নিয়ে হাজির হন কেউ কেউ। এতে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় পরিবারের সদস্যদের।

স্থানীয় বাসিন্দা রোজিনা খাতুনের অভিযোগ, মাঝেমধ্যে তাঁরা বাড়ির ভেতরে ঢুকে ভিডিও ধারণ শুরু করেন। তাঁর কথায়, বাসার ভেতরে সব সময় মানুষ প্রস্তুত অবস্থায় থাকেন না। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ কেউ ক্যামেরা নিয়ে ঢুকে পড়লে স্বাভাবিকভাবেই অস্বস্তি তৈরি হয়। আরেক বাসিন্দা পাপিয়া বেগম বলেন, ‘ভিডিও করতে করতে বাথরুমেও ঢুকে পড়ে অনেকে। তাদের কিছু বললেও বোঝে না। হাসে আর স্যরি বলে চলে যায়। সারা দিনই তাদের এমন টালবাহানা চলতে থাকে। কেউ কোনো ব্যবস্থাও নেয় না। তাদের কিছু বললে চলে যায় আবার আসে।’ এ ধরনের অভিযোগ স্থানীয়দের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে আবাসিক বাড়িতে প্রবেশের ক্ষেত্রে অনুমতি ও ব্যক্তিগত পরিসরের প্রতি সম্মান দেখানো কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

ভিডিও কোথায় যাচ্ছে, জানেন না কেউ

এত বিপুলসংখ্যক ভিডিও ধারণ করা হলেও সেগুলো কোথায় প্রকাশ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারছেন না স্থানীয় বাসিন্দারা। ভিডিওতে কী ধরনের বক্তব্য বা তথ্য দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে কি না, কিংবা কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য তৈরি হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ও তাঁদের অজানা। দুটি ফোন ব্যবহারের কারণ নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। একটি ফোনে লাইভ ভিডিও চললেও অন্য ফোনে কী লেখা থাকে বা সেটি কী কাজে ব্যবহার করা হয়, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।

ফলে স্থানীয় মানুষের মধ্যে কৌতূহলের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। তাঁদের বক্তব্য, কেউ বৈধভাবে ভিডিও ধারণ করতেই পারেন। কিন্তু সেই কাজের উদ্দেশ্য, অনুমতি এবং ভিডিওর ব্যবহার সম্পর্কে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরে প্রবেশ করে ভিডিও ধারণের বিষয়টি কোনোভাবেই স্বাভাবিক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

পুলিশের নজরদারি কোথায়?

এত দিন ধরে উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় চীনা নাগরিকদের এমন কর্মকাণ্ড চললেও তাঁদের ভিডিও ধারণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে পুলিশের কাছেও স্পষ্ট তথ্য নেই। থানা-পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন এলাকায় তাঁদের ভিডিও করতে দেখা গেলেও তাঁরা ঠিক কী কারণে এসব ভিডিও করেন, তা জানা যায়নি। ভাষাগত জটিলতার কারণে তাঁদের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলাও কঠিন হয়ে পড়ে। আবার প্রশ্ন করলে অনেকেই বিরক্তি প্রকাশ করেন বলে বিষয়টি নিয়ে সরাসরি অনুসন্ধান করা সহজ হচ্ছে না।

উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ খালিদ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, ‘তারা কেন ভিডিও করে, সেটা আসলে আমি জানি না। ভিডিওগুলো কোথায় পাবলিশ করে, সেটাও জানি না। তবে তারা যে ভিডিও করে, সেটা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানিয়েছি। এটা নিয়ে কাজ চলছে।’ পুলিশের এই বক্তব্যে বোঝা যায়, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে। তবে ভিডিও ধারণের উদ্দেশ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় এবং তাঁদের কার্যক্রমের প্রকৃতি সম্পর্কে এখনো পরিষ্কার তথ্য সামনে আসেনি।

কৌতূহলের বাইরে এখন গোপনীয়তার প্রশ্ন

প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ভিডিও ধারণ ও সরাসরি সম্প্রচার এখন অনেক সহজ। ব্যক্তিগত ব্লগ, ভ্রমণকাহিনি কিংবা অনলাইন কনটেন্ট তৈরির জন্য অনেকেই রাস্তাঘাট ও জনজীবনের দৃশ্য ধারণ করেন। তবে প্রকাশ্যে ভিডিও ধারণের স্বাধীনতার পাশাপাশি অন্য মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। উত্তরার এই ঘটনাকে ঘিরে তাই শুধু বিদেশি নাগরিকদের ভিডিও করার উদ্দেশ্য জানার প্রশ্নই সামনে আসছে না; বরং মানুষের বাড়িঘরে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ, ব্যক্তিগত মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দী করা এবং সেই ভিডিওর সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা চান, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখুক। কারা এসব ভিডিও করছেন, কী উদ্দেশ্যে করছেন এবং ভিডিওগুলো কোথায় প্রকাশিত হচ্ছে—এসব বিষয়ে পরিষ্কার তথ্য জানা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কারও ব্যক্তিগত পরিসরে যেন অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ক্যামেরা প্রবেশ না করে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।

উত্তরার বাসিন্দাদের কাছে এখন প্রশ্ন একটাই—মাসের পর মাস ধরে চলা এই ভিডিও ধারণের পেছনে আসলে কী উদ্দেশ্য? আপাতত সেই প্রশ্নের উত্তর অজানাই রয়ে গেছে।

Advertisements