বিশ্ববাজারে আবারও কমল স্বর্ণের দাম, সামনে কী অপেক্ষা করছে?

যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থান প্রতিবেদন প্রকাশের আগে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে সামান্য পতন দেখা গেছে। তবে দৈনিক দরপতন সত্ত্বেও পুরো সপ্তাহের হিসাবে প্রায় ৫ শতাংশ বেড়েছে মূল্যবান এই ধাতুর দাম। ফলে দুই মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে ভালো সপ্তাহ পার করার পথে রয়েছে স্বর্ণ।
বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদহার নীতি—সব মিলিয়ে স্বর্ণের বাজারে চলছে নানা সমীকরণ। একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ সুদহারের গতিপথ সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের অপেক্ষা। এর মধ্যেই শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম কিছুটা কমেছে। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা ২৮ মিনিটে স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম ০.৩ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৭৬ দশমিক ৯১ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডিসেম্বর সরবরাহের স্বর্ণের ফিউচার দর ০.৬ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৮৮ ডলারে নেমে আসে। তবে সাপ্তাহিক হিসাবে স্বর্ণের দাম বেড়েছে প্রায় ৫ শতাংশ।

তেলের বাজারের অস্থিরতায় চাপে স্বর্ণ
স্বর্ণের দামের ওঠানামায় বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে জ্বালানি তেলের বাজার। তেলের দাম বাড়লে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বাড়ে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়ানো কিংবা দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে ধরে রাখার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, সুদের হার বাড়লে স্বর্ণের মতো সুদবিহীন সম্পদ ধরে রাখার সুযোগব্যয় বৃদ্ধি পায়। ফলে বিনিয়োগকারীদের কাছে স্বর্ণের আকর্ষণ কিছুটা কমতে পারে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলের পর দেশটির সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রশমিত হতে পারে—এমন প্রত্যাশাও জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলছে। সপ্তাহজুড়ে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমার পথে থাকলেও শুক্রবার তা আবার প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারে পৌঁছায়। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগও তেলের বাজারকে অস্থির করে রেখেছে।
ইউবিএসের বিশ্লেষক জিওভান্নি স্টাউনোভোর মতে, জ্বালানি তেলের দাম, মূল্যস্ফীতি এবং স্বর্ণের বাজারের মধ্যে বর্তমানে বেশ শক্তিশালী সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করতে হতে পারে। আর তাতে স্বর্ণের বাজারে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থান প্রতিবেদনের দিকে নজর
স্বর্ণের বাজারে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারের পরিস্থিতি। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ভবিষ্যতে সুদের হার বাড়াবে, কমাবে নাকি অপরিবর্তিত রাখবে—তা বুঝতে কর্মসংস্থান প্রতিবেদনের দিকে তাকিয়ে আছেন বিনিয়োগকারীরা।
শুক্রবার গ্রিনিচ মান সময় বেলা ১টা ৩০ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের নন-ফার্ম পেরোলস প্রতিবেদন প্রকাশের কথা রয়েছে। এই প্রতিবেদনে দেশটির শ্রমবাজারের শক্তি, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে। জিওভান্নি স্টাউনোভোর ধারণা, কর্মসংস্থান প্রতিবেদন বাজারের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে কিংবা প্রত্যাশার চেয়ে দুর্বল হলে স্বর্ণের দাম সমর্থন পেতে পারে। কারণ, শ্রমবাজার দুর্বল হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেলে সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা কমে যেতে পারে। এতে স্বর্ণের মতো সুদবিহীন সম্পদের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়তে পারে।
সুদের হার বাড়ানোর ইঙ্গিত, বাড়ছে উদ্বেগ
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি এখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রার ওপরে থাকায় ফেডের দুই কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার ছোট ও ধারাবাহিক সুদহার বৃদ্ধির পক্ষে মত দিয়েছেন। সিএমইর ফেডওয়াচ টুলের তথ্য অনুযায়ী, বাজারের লেনদেনকারীরা ডিসেম্বর মাসে ফেডের সুদহার বাড়ানোর সম্ভাবনা ৬৪ শতাংশ বলে মনে করছেন।
সুদের হার নিয়ে এমন প্রত্যাশা স্বর্ণের বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। কারণ, সুদের হার বাড়লে বন্ড ও অন্যান্য সুদভিত্তিক বিনিয়োগের আকর্ষণ বাড়তে পারে। বিপরীতে স্বর্ণ থেকে সরাসরি কোনো সুদ বা মুনাফা পাওয়া যায় না। ফলে বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে স্বর্ণ কিছুটা প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে।
২০২৬ সালের শেষ নাগাদ স্বর্ণের দামে কী হতে পারে?
স্বর্ণের ভবিষ্যৎ মূল্য নিয়ে পূর্বাভাসেও পরিবর্তন এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর মুদ্রানীতির সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ স্বর্ণের দামের পূর্বাভাস কমিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আগে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৪ হাজার ৬৫০ ডলার হতে পারে বলে ধারণা করেছিল। নতুন পূর্বাভাসে তা কমিয়ে ৪ হাজার ১৫০ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই সংশোধন বাজারে স্বর্ণের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। তবে স্বর্ণের দাম নির্ধারণে শুধু সুদের হার নয়, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনা এবং বিনিয়োগকারীদের চাহিদাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ভারতের বাজারে বাড়ছে স্বর্ণ কেনার আগ্রহ
আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে সাম্প্রতিক পতনের প্রভাব পড়েছে ভারতের খুচরা বাজারেও। দাম কিছুটা কমায় ক্রেতাদের মধ্যে কেনাকাটার আগ্রহ বেড়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামনে দীপাবলি উৎসবের প্রস্তুতি। ভারতের অন্যতম বড় উৎসব হওয়ায় এ সময় স্বর্ণ কেনার প্রচলন রয়েছে। ফলে উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশটির বাজারে মূল্যবান এই ধাতুর চাহিদা বাড়ছে। উল্লেখ্য, গত ৩০ অক্টোবর আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম কমে প্রতি আউন্স ৩ হাজার ৮৬৯ দশমিক ৮৫ ডলারে নেমেছিল। এটি ছিল এক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন দর।
শুধু স্বর্ণ নয়, কমেছে অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামও
শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের পাশাপাশি অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। স্পট মার্কেটে রুপার দাম ০.৬ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৫২ দশমিক ০৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। প্লাটিনামের দাম ১ শতাংশ কমে হয়েছে ১ হাজার ৫৩১ দশমিক ৯২ ডলার। অন্যদিকে, প্যালাডিয়ামের দাম প্রায় অপরিবর্তিত থেকে প্রতি আউন্স ১ হাজার ২৯ দশমিক ৮৭ ডলারে রয়েছে।
তবে দৈনিক দরপতন সত্ত্বেও সপ্তাহের হিসাবে রুপা, প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়াম—তিনটি ধাতুর দামই বাড়ার পথে রয়েছে।
স্বর্ণের বাজারে এখন অপেক্ষার পালা
আন্তর্জাতিক স্বর্ণবাজারে আপাতত বিনিয়োগকারীদের নজর যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থান প্রতিবেদন এবং ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দাম ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও স্বর্ণের ভবিষ্যৎ মূল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
একদিকে সপ্তাহজুড়ে শক্তিশালী মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে দৈনিক দরপতন—এই দুই বিপরীত প্রবণতা স্বর্ণের বাজারকে কিছুটা অনিশ্চিত করে তুলেছে। ফলে স্বল্পমেয়াদে দামের ওঠানামা অব্যাহত থাকতে পারে। বিনিয়োগকারী ও ক্রেতাদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাজারের পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকেতগুলো সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করা।



