৪ অক্টোবর, ২০২৬ | রবিবারবাংলা: ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩
জীবনযাপন

ভালোবাসা ফুরিয়ে গেলেও কেন সম্পর্ক ছাড়তে পারেন না অনেকে?

6c2234be2b5ba8a189b5dbeea30fce4b

একই ঘরে বসবাস, অথচ দুজনের মধ্যে যেন তৈরি হয়েছে অদৃশ্য দেয়াল। কথাবার্তা প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ, একসঙ্গে সময় কাটানোর আগ্রহ নেই, এমনকি একই টেবিলে বসে খাওয়ার অভ্যাসও হারিয়ে গেছে। একসময় যে মানুষটির সঙ্গে ভবিষ্যৎ কল্পনা করা হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তার সঙ্গেই তৈরি হয় দূরত্ব।

এমন সম্পর্কের মধ্যে থেকেও অনেক মানুষ সহজে বেরিয়ে আসতে পারেন না। বাইরে থেকে বিষয়টি দেখে মনে হতে পারে, সম্পর্কটি যখন সুখ দিচ্ছে না, তখন বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে সিদ্ধান্তটি এতটা সরল নয়। ভালোবাসা, অভ্যাস, ভয়, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, সন্তান, সামাজিক চাপ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—সবকিছু মিলে একজন মানুষকে দীর্ঘদিন একই সম্পর্কে আটকে রাখতে পারে।

ভালো সময় ফিরে আসবে—এই আশাটাই বড় কারণ

সম্পর্কে সমস্যার পরও অনেকেই মনে করেন, পরিস্থিতি হয়তো আবার আগের মতো হয়ে যাবে। বিশেষ করে যখন খারাপ আচরণের পর কিছুদিন ভালো ব্যবহার পাওয়া যায়, তখন পুরোনো আশাটি আরও শক্তিশালী হয়।

কখনো সঙ্গী ক্ষমা চান, কখনো যত্ন নেন, আবার কখনো আগের মতো ভালোবাসার প্রকাশ করেন। ফলে খারাপ সময়ের মধ্যেও ভালো সময়ের স্মৃতি মানুষকে সম্পর্কটি ধরে রাখার কারণ দেয়। এভাবে বারবার খারাপ ও ভালো আচরণের পরিবর্তন চলতে থাকলে সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে।

নির্যাতনমূলক সম্পর্কে এই প্রবণতা আরও জটিল রূপ নেয়। কারণ সেখানে ভয় ও ভালোবাসা পাশাপাশি কাজ করতে পারে। নির্যাতনের পর সাময়িক ভালো আচরণ অনেক সময় ভুক্তভোগীর মনে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করে। তিনি ভাবতে পারেন, এবার হয়তো পরিস্থিতি সত্যিই বদলাবে।

যত বেশি বিনিয়োগ, তত কঠিন হয় ফিরে আসা

একটি সম্পর্কের পেছনে মানুষ শুধু সময় ব্যয় করেন না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে আবেগ, অর্থ, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক পরিচয় এবং ভবিষ্যতের নানা পরিকল্পনা।

Advertisements

বছরের পর বছর একটি সম্পর্ক ধরে রাখার পর হঠাৎ সেটি শেষ করার কথা ভাবলে অনেকের মনে হয়, এতদিনের চেষ্টা তাহলে কী হলো? বিয়ের অনুষ্ঠান, সংসার গড়া, সন্তান, যৌথ সম্পদ, পরিবার—সবকিছু ছেড়ে নতুন করে জীবন শুরু করার চিন্তা ভয় তৈরি করতে পারে।

মনোবিজ্ঞানে অতীতের বিনিয়োগকে ধরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এই প্রবণতাকে ‘সাংক কস্ট’ বা ডুবন্ত খরচের ধারণার সঙ্গে ব্যাখ্যা করা হয়। মানুষ অনেক সময় ভবিষ্যতে কী ভালো হবে তার চেয়ে ইতিমধ্যে কী হারিয়েছে, সেটাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।

একা হয়ে যাওয়ার ভয়

সম্পর্ক ভেঙে গেলে জীবন কীভাবে চলবে—এই প্রশ্নটিও অনেককে আটকে রাখে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন সম্পর্কে থাকার পর নিজের সামাজিক ও ব্যক্তিগত পরিচয় অনেক সময় সঙ্গীর সঙ্গে জড়িয়ে যায়।

‘একাই কি সব সামলাতে পারব?’—এই ভয় বাস্তব। অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও কঠিন হতে পারে। বাসস্থান, সন্তানদের দায়িত্ব, চিকিৎসা, দৈনন্দিন খরচ কিংবা কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তকে জটিল করে তোলে।

কেউ কেউ আবার মনে করেন, সম্পর্ক শেষ করলে পরিবার বা সমাজ তাদের দোষ দেবে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে বিবাহ টিকিয়ে রাখার সামাজিক প্রত্যাশা অনেক সময় তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে।

সন্তান থাকলে সিদ্ধান্ত আরও কঠিন

সন্তানের কথা ভেবে অনেক মানুষ অসুখী সম্পর্কেও থেকে যান। তাদের ধারণা, বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ সন্তানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে সন্তানকে ঘিরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় শুধু বিচ্ছেদের সম্ভাব্য প্রভাব নয়, দীর্ঘদিনের পারিবারিক অশান্তির প্রভাবও বিবেচনা করা প্রয়োজন। নিয়মিত ঝগড়া, ভয়, অপমান বা সহিংসতার পরিবেশও শিশুর মানসিক বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে।

ফলে সন্তানকে কেন্দ্র করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পরিস্থিতির ধরন, নিরাপত্তা এবং শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।

নির্যাতনকে অনেক সময় স্বাভাবিক মনে হতে শুরু করে

যে ব্যক্তি ছোটবেলা থেকেই পরিবারে ঝগড়া, অপমান বা সহিংসতা দেখে বড় হয়েছেন, তার কাছে এমন আচরণ অস্বাভাবিক না-ও মনে হতে পারে। শৈশবের অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনে সম্পর্ক সম্পর্কে মানুষের ধারণাকে প্রভাবিত করতে পারে।

ফলে কেউ হয়তো বুঝতেই পারেন না যে তিনি যে আচরণ সহ্য করছেন, সেটি স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবনের অংশ নয়। আবার কেউ বুঝলেও মনে করতে পারেন, সব সম্পর্কেই এমন সমস্যা থাকে এবং তাকে কোনোভাবে মানিয়ে নিতে হবে।

এই কারণেই পরিবারে সহিংসতার অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এটি কোনো অনিবার্য ভবিষ্যৎ নয়; সচেতনতা, সহায়তা এবং নিরাপদ পরিবেশের মাধ্যমে এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় সামাজিক চাপও বড় বিষয়

বাংলাদেশের মতো সমাজে বিয়ে শুধু দুজন মানুষের সম্পর্ক নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দুই পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং সামাজিক মর্যাদার বিষয়। ফলে সম্পর্ক ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত অনেক সময় ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

বিশেষ করে নারীরা বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিলে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারেন। সংসার কেন টিকল না, সন্তানদের কী হবে, সমাজ কী বলবে—এসব চাপ অনেককে সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত রাখে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়টি। নিজের আয় না থাকা কিংবা পর্যাপ্ত আর্থিক সঞ্চয় না থাকলে একটি সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসে নতুনভাবে জীবন শুরু করা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশ্বজুড়েই পরিস্থিতি উদ্বেগজনক

ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর সহিংসতা কোনো একটি দেশ বা সমাজের সমস্যা নয়। জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিশ্বজুড়েই বিপুলসংখ্যক নারী জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হন। অনেক ক্ষেত্রেই নির্যাতনকারী ব্যক্তি ভুক্তভোগীর পরিচিত বা ঘনিষ্ঠজন।

ফলে ‘কেন ছেড়ে চলে যায় না?’—এই প্রশ্নের পরিবর্তে পরিস্থিতিটিকে আরও গভীরভাবে দেখা প্রয়োজন। একজন মানুষ হয়তো ভয়, আর্থিক নির্ভরতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, সন্তানের নিরাপত্তা কিংবা প্রতিশোধের আশঙ্কার কারণে সম্পর্ক থেকে বের হতে পারছেন না।

সম্পর্ক ধরে রাখা সবসময় দুর্বলতার লক্ষণ নয়

কোনো মানুষ দীর্ঘদিন একটি অসুস্থ সম্পর্কে থাকার সিদ্ধান্ত নিলে তাকে শুধু দুর্বল বা সিদ্ধান্তহীন হিসেবে দেখা ঠিক নয়। তার সিদ্ধান্তের পেছনে এমন অনেক বাস্তব পরিস্থিতি থাকতে পারে, যা বাইরে থেকে দেখা যায় না।

তবে সম্পর্কের মধ্যে নিয়মিত অপমান, ভয় দেখানো, নিয়ন্ত্রণ, শারীরিক বা যৌন নির্যাতন থাকলে বিষয়টিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া উচিত নয়। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।

একটি সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার পথ সবার জন্য একই নয়। কারও প্রয়োজন হতে পারে পরিবারের সহায়তা, কারও আর্থিক পরিকল্পনা, কারও আইনি পরামর্শ, আবার কারও প্রয়োজন হতে পারে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহযোগিতা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—একজন মানুষ যেন নিজের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলার মতো নিরাপদ জায়গা পান এবং প্রয়োজনের সময় সাহায্য পাওয়ার সুযোগ থাকে।

কারণ অনেক সময় মানুষ সম্পর্কটিতে ভালোবাসার জন্য নয়, বরং ভয়, দায়িত্ব, অভ্যাস ও আশার কারণে থেকে যান। সেই অদৃশ্য কারণগুলো বোঝা গেলে ‘কেন চলে যাচ্ছে না’ প্রশ্নটির চেয়ে ‘কীভাবে নিরাপদভাবে তার পাশে দাঁড়ানো যায়’—এই প্রশ্নটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

Advertisements