তিন দিন ধরে হাসপাতালে অচেতন ক্রিস্টা পাইক, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা

প্রাণঘাতী ইনজেকশন (লেথাল ইনজেকশন) প্রয়োগের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রচেষ্টা থেকে বেঁচে ফিরেছেন টেনেসির নারী আসামি ক্রিস্টা পাইক। গত বুধবার থেকে গত তিন ধরে স্থানীয় একটি হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে আছেন তিনি।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) আদালতে জমা দেওয়া নথিতে তার আইনজীবীরা জানান, ন্যাশভিলের একটি হাসপাতালে ক্রিস্টাকে ইনটিউবেট করে ভেন্টিলেটরে রাখা হয়েছে। তিনি এখনও অচেতন অবস্থায় আছেন। পেন্টোবারবিটালের দুটি ডোজ দেওয়ার পর মৃত্যু না হওয়ায় তিনি চিকিৎসাধীন আছেন।
তবে তার চিকিৎসাগত ও আইনি ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
ক্রিস্টার আইনজীবী স্টিফেন ফেরেল ও লুক ইহনেন এক বিবৃতিতে বলেন, ‘মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টার সময় দেওয়া পেন্টোবারবিটালের গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার চিকিৎসা চলছে তার। দুই হাতে পাওয়া উল্লেখযোগ্য আঘাতেরও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’
ক্রিস্টার আইনি দল শুক্রবার ন্যাশভিলের আদালতে জরুরি পিটিশন দায়ের করেছে। ব্যর্থ এ প্রচেষ্টার সব প্রমাণ সংরক্ষণের জন্য টেনেসি ডিপার্টমেন্ট অব কারেকশনসকে নির্দেশ দিতে এবং দ্রুত শুনানির অনুরোধ করা হয় এতে। তবে বিচারাধীন এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
১৯৯৫ সালে ১৯ বছর বয়সী কলিন স্লেমারকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন ক্রিস্টা। গত ২০০ বছরের মধ্যে টেনেসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া প্রথম নারী হতে যাচ্ছিলেন তিনি।
চলতি বছর অঙ্গরাজ্যটিতে হতে যাওয়া সব মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করেছেন গভর্নর বিল লি। গতকাল বৃহস্পতিবার এ আদেশ দেন তিনি। গভর্নর বিল লি বলেন, ‘বুধবার কর্তৃপক্ষের কোথায় ভুল হয়েছিল, সে বিষয়ে একটি ‘বিস্তৃত ও তৃতীয় পক্ষের পর্যালোচনা’র শর্তসাপেক্ষে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আইনসম্মতভাবে আরোপিত সাজা কার্যকর করা অঙ্গরাজ্যের সবচেয়ে গুরুতর দায়িত্বগুলোর একটি। টেনেসির জনগণ প্রত্যাশা করে, এটি এমনভাবে করা হবে, যা শুধু আইনি ও সাংবিধানিকই নয়, বরং কার্যকরও হবে।’
জাস্টিস কোয়ালিশনের নির্বাহী পরিচালক রবার্ট ব্রেসওয়েল মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেন, ‘প্রশাসন স্লেমারের পরিবারকে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে কিছুই জানায়নি। তারা চরম বিপর্যস্ত ও ক্লান্ত। অঙ্গরাজ্য সাহায্য না করায় বা মুখ না খোলায় পরিবারটি ক্ষুব্ধ।’
এদিকে ডিসেম্বরে নির্ধারিত গ্যারি সাটন নামের আরেক আসামির মৃত্যুদণ্ডও স্থগিত করেছেন গভর্নর লি। সাটনের আইনজীবীরা এ সিদ্ধান্তে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘ক্রিস্টা পাইক যেভাবে ভুগেছেন, কাউকে সেভাবে ভুগতে বাধ্য করা উচিত নয়।’
শাস্তি কমানোর আহ্বান আইনজীবীদের
বুধবার সন্ধ্যায় ক্রিস্টা শেষ কথা বলার পর ইনজেকশনের দুটি ডোজ দেওয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ডোজ দেওয়ার পরও তিনি নাক ডাকছিলেন এবং তাকে জীবিত মনে হচ্ছিল। ডব্লিউপিএলএনের প্রতিবেদক ক্যাথরিন সুইনি বলেন, ‘এর কোনো কিছুই স্বাভাবিক ছিল না। এটি অত্যন্ত বাজেভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে।’
তবে টেনেসি ডিপার্টমেন্ট অব কারেকশনসের দাবি, তারা অনুমোদিত প্রোটোকলের প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করেছে। অতিরিক্ত কোনো পদ্ধতির অনুমতি প্রোটোকলে নেই।
ক্রিস্টার অন্যতম আইনজীবী র্যান্ডি স্পিভি প্রোটোকল পর্যালোচনার ঘোষণাকে ‘অপ্রতুল’ আখ্যা দিয়ে শাস্তি কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ক্রিস্টা আমেরিকার মৃত্যুদণ্ডের ইতিহাসে অন্য যেকোনো ব্যক্তির চেয়ে বেশি শাস্তি সহ্য করেছেন।’
স্পিভি ও কেলি গ্লিসন এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ‘আমাদের আশঙ্কাই সত্য প্রমাণিত হয়েছে—শিরায় পৌঁছাতে সমস্যা, ফেটে যাওয়া শিরা, নিম্নমানের ওষুধ ও জরুরি চিকিৎসাসেবা না থাকা; সবকিছুই ঘটেছে এক গোপন প্রোটোকলের অধীন।’
আরেক আইনজীবী ফেরেল বলেন, ‘ক্রিস্টার ভয় মৃত্যুর ছিল না, বরং দীর্ঘায়িত, বেদনাদায়ক ও মানসিক আঘাতজনিত মৃত্যুর ভয় ছিল। মৃত্যু ছাড়া ঠিক সেটাই ঘটেছে।’
মৃত্যুদণ্ড থেকে বেঁচে যাওয়ার নজির
এ ঘটনা টেনেসি কারেকশনস বিভাগের কমিশনার ফ্রাঙ্ক স্ট্রাডার অতীত রেকর্ডকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। অ্যারিজোনায় তার দায়িত্ব পালনের সময় ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে তিনটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা ‘সমস্যাময়’ ছিল।
আমহার্স্ট কলেজের অধ্যাপক অস্টিন সারাত বলেন, ত্রুটিপূর্ণ মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা ঘটলেও পুরোপুরি ব্যর্থ হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। এমন ঘটনা আইনি ব্যবস্থার জন্য এক সত্যিকারের দ্বিধা তৈরি করে।
অতীতে এমন ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৯৪৬ সালে লুইজিয়ানায় ইলেকট্রিক চেয়ারে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বেঁচে যান উইলি ফ্রান্সিস। সুপ্রিম কোর্টে আপিল খারিজ হলে দ্বিতীয়বার তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। অন্যদিকে ২০০৯ সালে ওহাইওতে রোমেল ব্রুম নামের এক আসামির শিরা খুঁজে না পাওয়ায় ইনজেকশন দেওয়া যায়নি। সুপ্রিম কোর্ট দ্বিতীয়বার কার্যকরের পক্ষে রায় দিলেও ২০২০ সালে ব্রুম কোভিডে মারা যান।
তবে সারাতের মতে, ক্রিস্টার বিষয়টি ব্যতিক্রম। কারণ প্রাণঘাতী ওষুধগুলো আসলেই তার শরীরে প্রবেশ করেছিল। তিনি বলেন, ক্রিস্টার ক্ষেত্রে আমরা এক নজিরবিহীন অবস্থার মধ্যে রয়েছি।



