আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস আজ: আয়ু বাড়ছে, বাড়াতে হবে প্রবীণবান্ধব ব্যবস্থাও

সম্প্রতি আগারগাঁও মেট্রোরেল স্টেশনে মতিঝিল যাওয়ার জন্য এসেছিলেন এক প্রবীণ নারী। স্টেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীকে তিনি বলেন, সরকার মেট্রোরেলের ভাড়ায় প্রবীণ নাগরিকদের ২৫ শতাংশ ছাড় দিয়েছে। কিন্তু সহযোগিতা না করে ঐ কর্মী তাকে বলেন, ‘আপনি অন্যদিকে যান, এখানে এসব হবে না।’ ঐ নারী বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) সাবেক মহাব্যবস্থাপক মঞ্জু আরা বেগম।
ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে মঞ্জু আরা বেগম বলেন, ২০১৩ সালে সরকার জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা এবং একই বছর পিতা-মাতা ভরণপোষণ আইন করেছে। কিন্তু এসবের বাস্তবায়ন নেই। দেশে প্রবীণের সংখ্যা বাড়লেও প্রবীণবান্ধব কার্যক্রম সেভাবে গড়ে ওঠেনি।
আজ ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘দ্য এজ অব লংজিভিটি : রিথিংকিং সিস্টেমস ফর লংগার লাইভস’ ‘দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুন ভাবনা’।

জাতিসংঘ বলছে, মানুষ আগের চেয়ে দীর্ঘজীবী হচ্ছে। ফলে স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা, আবাসন, কর্মসংস্থান ও যত্নব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রবীণবান্ধব ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন বাড়ছে।
বাড়ছে প্রবীণ জনগোষ্ঠী: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২৮ শতাংশের বয়স ৬০ বছর বা তার বেশি। বাংলাদেশে এই বয়সসীমাকেই প্রবীণ জনগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০০১ সালে এ হার ছিল ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং ২০১১ সালে ৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
জনগোষ্ঠীর এই পরিবর্তনের সঙ্গে প্রবীণদের স্বাস্থ্য, আর্থিক নিরাপত্তা, জীবনযাপন ও সামাজিক মর্যাদার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিশ্বে ৬০ বছর ও তার বেশি বয়সি মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১২০ কোটি। ২০৫০ সালে তা বেড়ে ২১০ কোটিতে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে।
ভাতা নয়, প্রয়োজন সামগ্রিক ব্যবস্থা: বাংলাদেশে প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তায় অন্যতম সরকারি কর্মসূচি বয়স্কভাতা। দরিদ্র, স্বল্প উপার্জনক্ষম বা উপার্জনে অক্ষম প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং পরিবার ও সমাজে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে এই কর্মসূচি চালু হয়। তবে শুধু ভাতা নয়, প্রবীণদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি যত্ন, নিরাপদ ও সহজগম্য পরিবেশ, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং পরিবারের মধ্যে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করাও জরুরি। মঞ্জু আরা বেগম বলেন, ‘মাসে আমার ওষুধ লাগে ২০ হাজার টাকা আর আমার স্বামীর ১০ হাজার টাকা। এই খরচ মধ্যবিত্ত মানুষের পক্ষে চালানো কষ্টকর।’

নিঃসঙ্গতা বড় সমস্যা: প্রবাসী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শামীমা বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অবস্থিত জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমসে থাকছেন। তার স্বামী-সন্তানরা বছরে দুই বার তাকে দেখতে আসেন। জীবনের শেষ সময়ে দেশের মানুষ, দেশীয় খাবার ও পরিবেশের মধ্যে থাকতে চেয়েছেন তিনি। এখানে এসে তিনি যেমন স্বস্তিতে আছেন, তার পরিবারও তেমনি নিশ্চিন্তে আছে।
এখানে অর্থনীতিবিদ ও সমাজচিন্তক ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদও সস্ত্রীক বসবাস করছেন। তিনি বলেন, ‘শিশু, তরুণ, পূর্ণবয়স্ক বা প্রবীণ—দেশের সব নাগরিকের মানবিক মর্যাদায় বসবাস করার অধিকার রয়েছে। বেশি বয়সে সাধারণত অসুখ-বিসুখ বাড়ে। কাজেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি বলেন, অতীতের যৌথ পরিবার ব্যবস্থা এখন প্রায় ভেঙে পড়েছে। শহরের পাশাপাশি গ্রামেও প্রবীণদের নিঃসঙ্গতা বড় সমস্যা হয়ে উঠছে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একজন মারা গেলে অন্যজনের একাকিত্ব আরো বাড়ে। সন্তানরা নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত থাকেন, নাতি-নাতনিরাও পড়াশোনা ও খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত। ফলে অনেক প্রবীণ নিজেকে গুরুত্বহীন বলে মনে করতে পারেন।

ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, ‘দরিদ্র ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল অনেক প্রবীণের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সংগতি নেই। তাদের সমস্যাগুলো বিবেচনায় নিয়ে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। পরিবারকে প্রাথমিক দায়িত্ব নিতে হবে। পরিবার দায়িত্ব পালন করতে না পারলে দায়িত্ব সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর বর্তায়। কিছু সামাজিক সংগঠন ও এনজিও কাজ করছে, কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। দেশে যেসব বৃদ্ধাশ্রম আছে সেগুলোর মধ্যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভালো কাজ করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে এগুলো মূলত মুনাফাভিত্তিক ব্যবসা হিসেবে পরিচালিত হয়। প্রবীণ সেবা তাদের প্রধান লক্ষ্য নয়। যারা প্রবীণদের সহায়তা করতে চান, তাদেরকে মানবিকতায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে।’
নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজন: জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমস অ্যান্ড হাসপাতাল (জেবিএফআরএইচ) প্রতিষ্ঠা করেছেন অধ্যাপক ডা. সরদার এ নাঈম। এখানে ৭০০ বর্গফুটের ৫-তারকা মানের ২৩২টি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। এর মধ্যে ২২৪টি বিক্রি হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আশা ইসলাম নাঈমের বাবা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও ‘বাংলাপিডিয়া’র প্রধান সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম এই প্রবীণ নিবাসের প্রথম বাসিন্দা। তিনি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত।
আশা ইসলাম নাঈম বলেন, ‘বাবা প্রতিদিন বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতেন। আমরা অনেক কষ্ট ও অনিরাপত্তার মধ্যে ছিলাম। এখানে আসার পর তিনি সবার সঙ্গে আনন্দে আছেন।’

অধ্যাপক ডা. সরদার এ নাঈম বলেন, প্রবীণদের সেবা বলতে সাধারণত দরিদ্রদের থাকা-খাওয়া ও সামান্য চিকিৎসার ব্যবস্থাকেই বোঝানো হয়। কিন্তু উচ্চবিত্ত পরিবারের প্রবীণদের নিঃসঙ্গতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থ-সম্পদ থাকলেই একজন প্রবীণ নিরাপদ ও নিঃসঙ্গতামুক্ত থাকবেন এমন নয়, বরং অর্থ-সম্পদ নিয়ে একা থাকা অনেক সময় তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। প্রবীণ দিবস তাই শুধু প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর দিন নয়; দীর্ঘায়ু মানুষের জন্য কেমন সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রয়োজন, তা নতুন করে ভাবারও দিন।
দিবসটি উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, ‘প্রতিটি মানুষের বার্ধক্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ হওয়া আবশ্যক। প্রবীণগণ কেবল আমাদের অতীতের গল্প নন; তারা আমাদের বর্তমানের শিকড় এবং ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক। অথচ প্রবীণদের একটি বড় অংশ অবনতিশীল স্বাস্থ্য, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও নিঃসঙ্গতার মধ্যে দিন অতিবাহিত করছেন। একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্র বিনির্মাণে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর প্রতি আমাদের যত্নশীল দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাণীতে বলেন, বর্তমান সরকার নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লিখিত কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের ধারণার আলোকে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা শক্তিশালী করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে। দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বয়স্কভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি এবং উপকারভোগীর সংখ্যা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের অন্যতম নির্বাচনি অঙ্গীকার ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী শক্তিশালী করার কার্যক্রম এগিয়ে চলেছে।



