গোসল কম, সুগন্ধি বন্ধ- তবু বাড়বে আকর্ষণ?জেন–জিদের নতুন ডেটিং ট্রেন্ড ‘ফেরোমোন-ম্যাক্সিং’ কী?

কাউকে আকর্ষণ করতে হলে ভালো পোশাক, পরিপাটি চুল, মিষ্টি সুগন্ধি কিংবা সাজগোজ—এতদিন পর্যন্ত এসবই ছিল পরিচিত প্রস্তুতি। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দুনিয়ায় এখন দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ উল্টো এক প্রবণতা। সেখানে কেউ কেউ বলছেন, আকর্ষণ বাড়াতে সুগন্ধি তো দূরের কথা, ডিওডোরেন্টই নাকি বাদ দেওয়া উচিত!
এই অদ্ভুত ধারণার নাম ‘ফেরোমোন-ম্যাক্সিং’। ট্রেন্ডটির অনুসারীদের দাবি, কৃত্রিম সুগন্ধিতে শরীরের স্বাভাবিক গন্ধ ঢেকে না রেখে সেটিকে অক্ষত রাখলেই নাকি অন্যের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠা সম্ভব।
শরীরের স্বাভাবিক গন্ধই কি নতুন আকর্ষণের রহস্য?
‘ম্যাক্সিং’ শব্দটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন নয়। কোনো নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বা অভ্যাসকে বাড়িয়ে তোলা কিংবা সেটিকে নিজের সুবিধায় ব্যবহার করার প্রবণতাকে বোঝাতেই অনলাইনে শব্দটির ব্যবহার দেখা যায়। ‘ফেরোমোন-ম্যাক্সিং’ও সেই ধারণারই একটি সংস্করণ।
এই প্রবণতায় কেউ কেউ গোসলের অভ্যাস কমিয়ে দেওয়ার কথা বলছেন, আবার কেউ ডিওডোরেন্ট, সুগন্ধি কিংবা চুলের কিছু প্রসাধনী ব্যবহার বন্ধ করার পরামর্শ দিচ্ছেন। তাঁদের যুক্তি, এসব পণ্য শরীরের প্রাকৃতিক গন্ধকে ঢেকে দেয়। আর সেই স্বাভাবিক গন্ধের মধ্যেই নাকি লুকিয়ে থাকতে পারে আকর্ষণের রহস্য।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবশ্য বিষয়টি শুধু ডিওডোরেন্ট বাদ দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। শরীরের গন্ধ পরিবর্তন বা আরও ‘আকর্ষণীয়’ করার নানা অস্বাভাবিক পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা দেখা যাচ্ছে। তবে এসব দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
মানুষের কি সত্যিই ‘ফেরোমোন’ আছে?
‘ফেরোমোন’ শব্দটি শুনলেই অনেকের মনে এমন একটি রাসায়নিক সংকেতের ধারণা তৈরি হয়, যা একজন মানুষের শরীর থেকে বের হয়ে অন্য মানুষকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আকৃষ্ট করতে পারে। প্রাণিজগতে বিভিন্ন প্রজাতির ক্ষেত্রে এমন রাসায়নিক সংকেতের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা রয়েছে। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে বিষয়টি এতটা সরল নয়।
মানুষের শরীরে এমন কোনো নির্দিষ্ট ফেরোমোন শনাক্ত হয়েছে, যা অন্য মানুষকে যৌন বা রোমান্টিকভাবে আকৃষ্ট করে—এমন বৈজ্ঞানিক ঐকমত্য এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। শরীরের গন্ধ মানুষের সামাজিক ও ব্যক্তিগত আকর্ষণে কোনো ভূমিকা রাখে কি না, তা নিয়ে গবেষণা চললেও ‘নিজের গন্ধ যত বেশি, আকর্ষণ তত বেশি’—এমন সরল সূত্র বিজ্ঞান সমর্থন করে না।
একজন মানুষ অন্যজনের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠার পেছনে চেহারা, ব্যক্তিত্ব, আচরণ, সামাজিক যোগাযোগ, পরিচিতি, পরিস্থিতি এবং ব্যক্তিগত পছন্দ—অনেক বিষয় একসঙ্গে কাজ করতে পারে। গন্ধও কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই অভিজ্ঞতার অংশ হতে পারে।
প্রাকৃতিক গন্ধ আর অপরিচ্ছন্নতার গন্ধ এক নয়
এখানেই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় রয়েছে। শরীরের স্বাভাবিক গন্ধ থাকা আর দীর্ঘ সময় গোসল না করে ঘাম, তেল ও ত্বকের ব্যাকটেরিয়ার কারণে তৈরি তীব্র গন্ধ—দুটিকে এক করে দেখা ঠিক নয়। মানুষের শরীরের গন্ধ স্বাভাবিকভাবেই ব্যক্তি ভেদে আলাদা হতে পারে। খাদ্যাভ্যাস, ঘাম, হরমোন, পরিবেশ ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার মতো বিষয়েও শরীরের গন্ধ বদলাতে পারে। কিন্তু সেই স্বাভাবিক গন্ধকে ‘আকর্ষণের গোপন অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করার জন্য পরিচ্ছন্নতা বাদ দেওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত কোনো কৌশল নয়।
তাহলে হঠাৎ এত জনপ্রিয় কেন?
‘ফেরোমোন-ম্যাক্সিং’ নিয়ে আগ্রহের পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা বড়। বর্তমানে নিজের চেহারা, পোশাক, ত্বক, চুল থেকে শুরু করে কথা বলার ধরন—সবকিছুকেই যেন আরও আকর্ষণীয় করে তোলার নানা উপায় নিয়ে প্রতিনিয়ত আলোচনা চলছে। ডেটিংয়ের ক্ষেত্রেও বিষয়টি আরও স্পষ্ট। একটি ভালো ছবি, নিখুঁত সাজ, নির্দিষ্ট পোশাক কিংবা ব্যক্তিত্বের বিশেষ কোনো দিককে তুলে ধরার কৌশল—সবকিছুই যেন নিজেকে ‘আরও আকর্ষণীয় সংস্করণে’ উপস্থাপনের অংশ।
‘ফেরোমোন-ম্যাক্সিং’ সেই প্রবণতারই কিছুটা চরম ও কৌতূহলোদ্দীপক রূপ। যেখানে প্রচলিত সৌন্দর্যচর্চার বিপরীতে বলা হচ্ছে, নিজেকে বদলানোর প্রয়োজন নেই; বরং নিজের শরীরের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যই নাকি যথেষ্ট।
ট্রেন্ড মানেই সত্য নয়
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ধারণা দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেই সেটি বৈজ্ঞানিকভাবে সত্য হয়ে যায় না। বিশেষ করে শরীর, স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে যুক্ত কোনো প্রবণতা অনুসরণ করার আগে তার পেছনে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আছে কি না, তা জানা জরুরি। স্বাভাবিক শরীরের গন্ধ মানুষের ব্যক্তিগত পরিচয়ের একটি অংশ হতে পারে। কারও কাছে সেটি পরিচিত বা পছন্দনীয়ও লাগতে পারে। কিন্তু ডিওডোরেন্ট বা গোসল বাদ দিলেই আকর্ষণ বাড়বে—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক সূত্র এখনো পাওয়া যায়নি।
শেষ পর্যন্ত আকর্ষণের কোনো একক ‘ম্যাক্সিং ফর্মুলা’ নেই। বরং পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে নিজের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যকে গ্রহণ করা এবং অন্যের ব্যক্তিগত পছন্দ ও সীমার প্রতি সম্মান দেখানোই বাস্তবতার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।



