নারীরা কি সত্যিই পুরুষের চেয়ে বেশি কথা বলেন?

‘মেয়েরা নাকি বেশি কথা বলে’—এই বাক্যটি এতটাই পরিচিত যে অনেকের কাছে এটি যেন প্রশ্নাতীত সত্য। বন্ধুদের আড্ডা থেকে শুরু করে পরিবার, কর্মক্ষেত্র কিংবা সামাজিক পরিসর—নারীর বেশি কথা বলাকে নিয়ে রসিকতা কম হয়নি। এমনকি একসময় বেশ জোরেশোরেই বলা হতো, একজন নারী দিনে প্রায় ২০ হাজার শব্দ বলেন, যেখানে পুরুষের শব্দের সংখ্যা নাকি মাত্র ৭ হাজার!
কিন্তু সত্যিই কি নারী-পুরুষের কথাবলার পরিমাণে এত বিশাল পার্থক্য রয়েছে? নাকি এটি বছরের পর বছর ধরে চলে আসা একটি প্রচলিত ধারণা, যার পেছনে শক্ত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গবেষকেরা মানুষের দৈনন্দিন কথাবার্তার ওপর নজর দিয়েছেন। ২০০৭ সালের একটি গবেষণায় ৩৯৬ জন মানুষের স্বাভাবিক কথোপকথন পর্যবেক্ষণ করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে থাকা ছোট শব্দরেকর্ডার নির্দিষ্ট সময় পরপর আশপাশের ৩০ সেকেন্ডের শব্দ ধারণ করত। সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা হিসাব করেন, একজন মানুষ দিনে আনুমানিক কত শব্দ ব্যবহার করেন।
ফলাফলটি প্রচলিত ধারণার সঙ্গে বেশ খানিকটা ভিন্ন। গবেষণায় নারীরা দিনে গড়ে ১৬ হাজার ২১৫টি শব্দ বলেছিলেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ৬৬৯। অর্থাৎ ব্যবধান মাত্র ৫৪৬ শব্দ। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পার্থক্যকে পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ পাওয়া যায়নি।
তবে গবেষণাটি নিয়ে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কি যথেষ্ট ছিল? এই সীমাবদ্ধতাকে সামনে রেখে পরবর্তী সময়ে আরও বড় পরিসরে গবেষণা করা হয়।
২০২৫ সালের একটি গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ড, সার্বিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার ২ হাজার ১৯৭ জন মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় ৬ লাখ ৩১ হাজারেরও বেশি শব্দরেকর্ড। বড় নমুনার এই গবেষণায় নারীরা দিনে গড়ে ১৩ হাজার ৩৪৯টি শব্দ এবং পুরুষেরা ১১ হাজার ৯৫০টি শব্দ বলেছেন। অর্থাৎ গড়ে প্রায় ১ হাজার ৩৯৯ শব্দের পার্থক্য দেখা যায়।
শুনতে সংখ্যাটি বেশ বড় মনে হতে পারে। কিন্তু গবেষকদের বিশ্লেষণে এই পার্থক্যকে এমন একটি নিশ্চিত লিঙ্গভিত্তিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি, যা দিয়ে বলা যায়—নারীরা স্বভাবগতভাবেই পুরুষের চেয়ে বেশি কথা বলেন। কারণ তথ্যের মধ্যে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা ছিল এবং ব্যক্তিভেদে কথাবলার পরিমাণে পার্থক্য ছিল অনেক বেশি।
এখানেই গল্পটি আরও interesting হয়ে ওঠে বয়সের বিষয়টি সামনে এলে। গবেষণায় দেখা যায়, সব বয়সে নারী-পুরুষের কথাবলার চিত্র একই নয়। তরুণ ও মধ্যবয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে নারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি শব্দ ব্যবহার করেছেন। কিন্তু বয়স্কদের ক্ষেত্রে চিত্র কিছুটা বদলে যায়—সেখানে পুরুষেরা সামান্য বেশি কথা বলেছেন।
অর্থাৎ একজন মানুষ দিনে কতটা কথা বলবেন, সেটি শুধু তার লিঙ্গ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বয়স, সামাজিক পরিবেশ, ব্যক্তিত্ব, সম্পর্কের ধরন এবং পরিস্থিতিও এতে ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের নিজেদের ধারণার দিকটিও ছিল বেশ interesting। তাদের জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, নিজেদের কতটা কথাবার্তাপ্রবণ বলে মনে করেন। সেখানে নারীরা নিজেদের পুরুষদের তুলনায় বেশি কথাবার্তাপ্রবণ বলে মনে করেছেন। অর্থাৎ সমাজে প্রচলিত ‘নারীরা বেশি কথা বলেন’ ধারণাটি নারীদের নিজেদের আত্মধারণাতেও কিছুটা প্রতিফলিত হয়েছে।
কিন্তু বাস্তব কথাবার্তার রেকর্ড সেই ধারণাকে সরলভাবে সমর্থন করেনি।
তাহলে কি শেষ পর্যন্ত বলা যায়, নারী-পুরুষ সমান কথা বলেন?
সেটিও পুরোপুরি বলা যায় না। গবেষণায় গড় হিসেবে কিছু পার্থক্য দেখা গেছে। তবে সেই পার্থক্যকে সব নারী বা সব পুরুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য একটি নিয়ম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং একজন মানুষ কতটা কথা বলেন, তার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পার্থক্যই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কেউ স্বভাবগতভাবে চুপচাপ, কেউ আবার গল্প করতে ভালোবাসেন। কেউ পরিচিত মানুষের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলেন, আবার অপরিচিত পরিবেশে প্রায় নিশ্চুপ থাকেন। কারও কাজের ধরন তাকে বেশি কথা বলতে বাধ্য করে, আবার কারও দৈনন্দিন জীবন কাটে তুলনামূলক নীরবতায়।
তাই ‘নারীরা বেশি কথা বলেন’—এই পরিচিত বাক্যটিকে বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে ধরে নেওয়ার আগে একটু থামা দরকার। গবেষণার বার্তা বরং অনেক বেশি সহজ—কথাবলার পরিমাণের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের চেয়ে মানুষে মানুষে পার্থক্যটাই হয়তো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।



