শিশুর যত্নে কর্মজীবী মা-বাবার ভরসা ডে কেয়ার সেন্টার, সেবার মান কেমন?

সন্তানকে নিরাপদ হাতে রেখে কাজে বের হওয়া কর্মজীবী মা-বাবার জন্য এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং প্রতিদিনের প্রয়োজন। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে যৌথ পরিবারের সংখ্যা কমে যাওয়া, কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বাড়া এবং দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে থাকার কারণে মানসম্মত শিশু পরিচর্যা বা দিবাযত্ন কেন্দ্রের প্রয়োজন ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় বাংলাদেশে এমন সেবার পরিধি এখনও সীমিত। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর সেবার মান, খরচ, প্রশিক্ষিত কর্মী এবং নিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-সমর্থিত ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, কর্মজীবী মা-বাবার ৫৪ শতাংশ মনে করেন, সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রের অভাব নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ ও চাকরিতে টিকে থাকার ক্ষেত্রে বড় বাধা। একই গবেষণায় ১৮ শতাংশ মা-বাবা জানিয়েছেন, কোনও একসময় শিশু পরিচর্যার দায়িত্বের কারণে তাদের চাকরি ছাড়তে হয়েছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারি দিবাযত্ন কেন্দ্রের পাশাপাশি বেসরকারি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগেও শিশু পরিচর্যা সেবা দেওয়া হচ্ছে। তবে বেসরকারি কেন্দ্রের বড় একটি অংশ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের নাগালের বাইরে। ফলে যাদের জন্য সাশ্রয়ী ও নিরাপদ শিশু পরিচর্যা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাদের একটি বড় অংশই এই সেবার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
সরকারি ব্যবস্থায় কতটা সুযোগ?
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের অধীনে বিভিন্ন এলাকায় ৬৪টি দিবাযত্ন কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। এসব কেন্দ্রে প্রায় ৪ হাজার ৫০টি শিশুর দিনের বেলায় পরিচর্যার ব্যবস্থা রয়েছে। শিশুদের বয়স ১৫ দিন থেকে ছয় বছর পর্যন্ত। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, আরও ৬০টি দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপনের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

এ ছাড়া সরকারি ব্যবস্থায় আগে থেকেই কর্মজীবী মায়েদের জন্য বিভিন্ন দিবাযত্ন কর্মসূচি রয়েছে। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজস্ব খাতের ৪৩টি কেন্দ্রের পাশাপাশি প্রকল্পের আওতায় আরও ২০টি কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। জাতীয় মহিলা সংস্থার অধীনেও কর্মজীবী নারীদের সন্তানদের জন্য দিবাযত্ন কেন্দ্র রয়েছে।
সরকারি এসব কেন্দ্রে শুধু শিশু দেখাশোনাই নয়, বয়স অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষা, খেলাধুলা, বিনোদন, স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থাও রয়েছে। নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য ভর্তুকিমূল্যে সেবা দেওয়ার উদাহরণও রয়েছে। ফলে অনেক কর্মজীবী মা, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের নারীর জন্য এসব কেন্দ্র কর্মজীবন চালিয়ে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হয়ে উঠেছে।
কিন্তু সেবার মান কি সব জায়গায় সমান?
শিশুকে একটি কেন্দ্রে রেখে যাওয়ার ক্ষেত্রে শুধু জায়গা বা আসন থাকাই যথেষ্ট নয়। প্রশিক্ষিত পরিচর্যাকারী, শিশু ও কর্মীর উপযুক্ত অনুপাত, নিরাপদ পরিবেশ, স্বাস্থ্যবিধি, পুষ্টি, খেলাধুলা, বয়স উপযোগী শেখার সুযোগ এবং শিশুর মানসিক বিকাশ—সবকিছুই মানসম্মত শিশুযত্নের অংশ।
বাংলাদেশে শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রগুলোর মান নিয়ে ২০২১ সালে বিশ্বব্যাংকের একটি সমীক্ষায় ১৯টি সরকারি, ২০টি বেসরকারি এবং ২৮টি এনজিও পরিচালিত কেন্দ্রের ১৭২ জন পরিচর্যাকারী ও ৪৮ জন ব্যবস্থাপকের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। সেখানে দেখা যায়, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পরিচর্যাকারী তাঁদের বর্তমান কাজে যোগ দেওয়ার আগে শিশু পরিচর্যা বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণ পাননি। একই গবেষণায় কেন্দ্রগুলোর স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন, পুষ্টি এবং শেখা ও খেলাধুলার উপকরণের মানে পার্থক্যের কথাও উঠে আসে।
এই গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ছিল, তখন শিশু পরিচর্যা খাতে একটি অভিন্ন জাতীয় মাননিশ্চিতকরণ ব্যবস্থা ছিল না। ফলে কেন্দ্রভেদে সেবার মানে পার্থক্য থাকার ঝুঁকি ছিল। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের উপযোগী ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও ঘাটতির কথা গবেষণায় উঠে আসে।
তবে এটি ২০২১ সালের তথ্যভিত্তিক গবেষণা। পরবর্তী সময়ে সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীদের উদ্যোগে প্রশিক্ষণ, মান নির্ধারণ ও নীতিমালা তৈরির কাজ এগিয়েছে। তাই ওই গবেষণার ফলাফলকে ২০২৬ সালের প্রতিটি কেন্দ্রের বর্তমান পরিস্থিতির সরাসরি চিত্র হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
বদলাচ্ছে প্রশিক্ষণ ও মান নির্ধারণের কাঠামো
শিশু পরিচর্যাকে শুধু ‘দেখাশোনার কাজ’ নয়, দক্ষ পেশা হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালে আইএলও জানায়, বাংলাদেশ সরকার শিশু পরিচর্যা কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানো ও সনদ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে ১০০ জন শিশু পরিচর্যা কর্মকর্তা ও কর্মীকে প্রশিক্ষণ ও সনদ দেওয়ার কর্মসূচি নেওয়া হয়।
এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বরে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় আইএলওর কারিগরি সহায়তায় ‘রোডম্যাপ ফর চাইল্ডকেয়ার ইন বাংলাদেশ’ চালু করে। এতে আগামী কয়েক বছরে শিশু পরিচর্যার পরিধি বাড়ানো, সেবার মান উন্নয়ন, খরচকে আরও নাগালের মধ্যে আনা, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং শিশু পরিচর্যাকে একটি স্বীকৃত দক্ষ পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে।

এই রোডম্যাপে স্বল্পমেয়াদে সুশাসন ও সচেতনতা বাড়ানো এবং শিশু পরিচর্যাকে দক্ষ কাজ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মধ্যমেয়াদে কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো, কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রাথমিক শৈশব শিক্ষা-পরিচর্যার মান বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে দেশজুড়ে আন্তর্জাতিক মান ও শিশু অধিকারভিত্তিক একটি মানসম্মত শিশু পরিচর্যা ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০২৬ সালে নতুন নির্দেশিকা
শিশুর নিরাপত্তা ও সেবার মান উন্নয়নে ২০২৬ সালে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় একাধিক নতুন নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে শিশুদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও সাধারণ স্বাস্থ্য পরিচর্যা, মানসিক বিকাশ ও মানসিক স্বাস্থ্য, খাদ্য ও পুষ্টি, শিশু নির্বাচন ও ভর্তি, দিবাযত্ন কেন্দ্রের নকশা ও কারিগরি নির্দেশিকা, শিশুর অধিকার ও নিরাপত্তা এবং সংক্রামক রোগ প্রতিরোধসংক্রান্ত নির্দেশিকা।
চাহিদা কেন এত বাড়ছে?
শিশু পরিচর্যার প্রশ্নটি মা-বাবার ব্যক্তিগত সমস্যা নয়। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নারীর কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ। একটি নির্ভরযোগ্য দিবাযত্ন কেন্দ্র না থাকলে অনেক নারী সন্তান জন্মের পর চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন অথবা কর্মজীবনে ফিরতে দেরি করেন।
বিশেষ করে নিম্ন আয়ের নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। গৃহকর্মী, পোশাকশ্রমিক, দিনমজুরসহ অনেক কর্মজীবী মা সন্তানকে কর্মস্থলে নিয়ে যেতে পারেন না। আবার ব্যক্তিগত বা বেসরকারি ডে-কেয়ারের খরচও তাঁদের সামর্থ্যের বাইরে।
ঢাকার আজিমপুর সরকারি দিবাযত্ন কেন্দ্রের উদাহরণটি এই বাস্তবতার একটি চিত্র তুলে ধরে। আইএলওর ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, সেখানে নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুদের জন্য ভর্তুকিমূল্যে সেবা দেওয়া হয়। শিশুদের দেখাশোনার পাশাপাশি বয়স অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষা, খেলাধুলা ও পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থাও রয়েছে।
সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
বাংলাদেশে শিশু পরিচর্যার ক্ষেত্রে এখন মূল চ্যালেঞ্জ কোথায় কেন্দ্র প্রয়োজন, কারা সেখানে সেবা পাবে, কত খরচ হবে এবং প্রতিটি কেন্দ্রে একই ধরনের নিরাপত্তা ও মান কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে সেই প্রশ্নগুলোর সমাধান করা।
সরকারি কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়লেও দেশের সব কর্মজীবী পরিবারের কাছে সেবা পৌঁছানো এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে বেসরকারি কেন্দ্রগুলো তুলনামূলক বেশি খরচের হওয়ায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবার সেখানে সহজে যেতে পারে না। আবার প্রশিক্ষিত কর্মী ধরে রাখা, শিশুদের জন্য নিরাপদ অবকাঠামো নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত তদারকি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে এ নিয়ে সরকারি উদ্যোগের গতি সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। নতুন কেন্দ্র স্থাপন, কর্মীদের প্রশিক্ষণ, মান নির্ধারণের নির্দেশিকা এবং জাতীয় রোডম্যাপ সবই ইতিবাচক কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তবে চাহিদার তুলনায় সেবার পরিধি কতটা বাড়ছে এবং নতুন মানদণ্ড বাস্তবে প্রতিটি কেন্দ্রে কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।



