২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | মঙ্গলবারবাংলা: ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩
বিশ্ব

বন্যা-ভূমিধসে বিপর্যস্ত নেপালের পর্যটন, মৌসুমের শুরুতেই ধস ব্যবসায়

27d92168d33c0f4ba2fc7e9c433e8dd9

হিমালয়কন্যা নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের প্রভাবে পর্যটন খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। দেশটিতে পর্যটনের ব্যস্ত মৌসুম শুরু হলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিদেশি পর্যটকদের অনেকে সফর বাতিল করেছেন বা ভ্রমণ পিছিয়ে দিয়েছেন। এতে পর্যটননির্ভর ছোট-বড় ব্যবসাগুলোতে এরই মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

সংগৃহীত

আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মাসে নেপালের উত্তরাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যায় ১ হাজার ৪৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। বন্যায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। এমনকি যেসব এলাকায় সরাসরি বন্যার প্রভাব পড়েনি, সেসব স্থানেও পর্যটকের সংখ্যা কমে গেছে।

সংগৃহীত

প্রতি বছর আগস্টে বর্ষা শেষ হওয়ার পর সেপ্টেম্বর থেকে নেপালে পর্যটনের ব্যস্ত মৌসুম শুরু হয়। এ সময় সাধারণত আকাশ পরিষ্কার থাকে এবং বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক দেশটিতে ভ্রমণে আসেন। দেশটির অর্থনীতিতেও পর্যটন খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নেপালের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৮ শতাংশ পর্যটন খাতের সঙ্গে যুক্ত এবং এই খাতের ওপর নির্ভর করে ১০ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান।

গত বছর নেপালে ১১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি পর্যটক ভ্রমণ করেছিলেন। তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের ব্যস্ত পর্যটন মৌসুমে দেশটিতে গিয়েছিলেন।

সংগৃহীত

কাঠমান্ডুর ট্যুর প্ল্যানার ও ট্যাক্সিচালক পুষ্পরাজ রিমাল বলেন, বন্যার কারণে এ বছর অধিকাংশ বিদেশি পর্যটক তাদের সফর বাতিল করেছেন। সাধারণত তিনি কাঠমান্ডু ও পোখারার বিভিন্ন হোটেল এবং ট্রেকিং প্রতিষ্ঠানের হয়ে কমিশনের ভিত্তিতে কাজ করেন।

পুষ্পরাজ রিমালের ভাষায়, বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটা লকডাউনের মতো। দুই মাসের জন্য দুটি গাড়ি ভাড়া করেও স্বাভাবিক পর্যটন মৌসুমের তুলনায় এ বছর তিনি মাত্র এক-চতুর্থাংশ ব্যবসা করতে পেরেছেন।

Advertisements

কাঠমান্ডু, পোখারা ও চিতওয়ানের সঙ্গে সংযোগকারী মহাসড়কের পাশে ঘরে তৈরি ঘোল বিক্রি করেন ৬১ বছর বয়সী সীতা নেপালি ও তার ৬৮ বছর বয়সী স্বামী রামাকান্ত নেপালি। বন্যার কারণে সড়ক বন্ধ থাকায় টানা ১১ দিন তাদের কোনো বিক্রি হয়নি। পরে সড়কটি খুলে দেওয়া হলেও পর্যটকের সংখ্যা কম থাকায় আগের তুলনায় তাদের বিক্রি অর্ধেকেরও নিচে নেমে গেছে।

সংগৃহীত

বন্যার খবর এবং বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের ভ্রমণ সতর্কতার কারণেও অনেক বিদেশি পর্যটক নেপাল সফর বাতিল করেছেন। যুক্তরাজ্যের দূতাবাস ১১ সেপ্টেম্বরের এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, বন্যার কারণে নেপালের অনেক এলাকা অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে এবং দেশের অভ্যন্তরে নিরাপদে ভ্রমণের নিশ্চয়তা দেওয়া কঠিন। যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসও একই ধরনের সতর্কতা জারি করেছে এবং কয়েকটি এলাকাকে ভ্রমণ-নিষেধাজ্ঞার আওতায় রেখেছে।

তবে নেপালের কর্মকর্তারা বলছেন, বন্যায় পুরো দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। নয়াদিল্লিতে নেপালের দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স সুরেন্দ্র থাপা বলেন, নেপাল পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত ও নিরাপদ রয়েছে। তবে কিছু এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

চিতওয়ানের একটি রিসোর্টের কর্মী প্রমিলা ছেত্রী জানান, বন্যার পর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাদের রিসোর্টের প্রায় ৮০ শতাংশ বুকিং বাতিল হয়ে যায়। চিতওয়ানের প্রধান মহাসড়কটি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রায় দুই সপ্তাহ বন্ধ থাকায় পর্যটন ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।

সংগৃহীত

তার মতে, অনেক পর্যটক বন্যার সতর্কবার্তাকে পুরো নেপাল ভ্রমণ না করার নির্দেশনা হিসেবে ধরে নিয়েছেন। অথচ দেশের অনেক অঞ্চল বন্যার কবল থেকে নিরাপদ ছিল। ফলে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের পর্যটন মৌসুমের ওপর নির্ভরশীল ছোট-বড় বহু ব্যবসা ক্ষতির মুখে পড়েছে।

বন্যার কারণে নেপালের পর্যটন খাতে মোট অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। তবে পর্যটননির্ভর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে আয় কমে যাওয়ার চাপ অনুভব করছেন। ঘোল বিক্রেতা সীতা নেপালি জানান, আয় ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় তাদের এখন দুপুরের খাবার হিসেবে শুধু চিড়া ও ঘোল খেতে হচ্ছে।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যা ও ভূমিধসের প্রভাব কাটিয়ে নেপালের পর্যটন খাত কতটা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে পর্যটকদের আস্থা ফেরানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা কত দ্রুত স্বাভাবিক করা যায় তার ওপর।

Advertisements