কাক শুধু মুখ চেনে না, বিপজ্জনক মানুষকে চিনিয়ে দেয় অন্য কাককেও

কাককে অনেক সময় শুধু সাধারণ বুদ্ধির পাখি হিসেবে দেখা হলেও গবেষণায় তাদের আচরণ সম্পর্কে মিলেছে বেশ চমকপ্রদ তথ্য। মানুষের মুখ শনাক্ত করা, বিপজ্জনক কাউকে মনে রাখা এবং সেই তথ্য অন্য কাকের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো সামাজিক শেখার ক্ষমতাও তাদের রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে আমেরিকান কাক (Corvus brachyrhynchos) নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা যায়, কাক এমন মানুষের মুখ মনে রাখতে পারে, যাকে তারা আগে বিপদের সঙ্গে যুক্ত করেছে। গবেষকেরা বিশেষ মুখোশ ব্যবহার করে কিছু কাক ধরেছিলেন। পরে একই মুখোশ পরা মানুষকে দেখলে কাকগুলো উচ্চস্বরে ডাকতে এবং দলবদ্ধভাবে তাড়া করতে শুরু করে। আরও আশ্চর্যের বিষয়, যেসব কাক নিজেরা ধরা পড়েনি, তারাও অন্য কাকের আচরণ দেখে ওই মুখোশকে বিপজ্জনক হিসেবে চিনতে শেখে।
এই স্মৃতি খুব অল্প সময়ের জন্যও নয়। আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, আমেরিকান কাক প্রায় ২ বছর ৭ মাস পর্যন্ত কোনো বিপজ্জনক মানুষের মুখ মনে রাখতে পারে। গবেষণায় তারা ভিড়ের মধ্যেও সেই পরিচিত ‘বিপজ্জনক’ মুখোশ পরা মানুষকে শনাক্ত করে সতর্কতামূলক আচরণ দেখিয়েছে।

শুধু মুখ মনে রাখাই নয়, মানুষের আচরণও কাকের নজর এড়ায় না। Humboldt State University ও University of Washington-এর গবেষকদের একটি পরীক্ষায় দেখা যায়, কোনো মানুষ সরাসরি কাকের দিকে তাকালে কাক তুলনামূলক দ্রুত সরে যায়। অর্থাৎ মানুষের চোখের দৃষ্টি বা মনোযোগ তাদের আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে।
কাকের বুদ্ধিমত্তার আরেকটি বড় উদাহরণ তাদের টুল বা সরঞ্জাম ব্যবহারের ক্ষমতা। বিশেষ করে নিউ ক্যালেডোনিয়ান কাক (Corvus moneduloides) গাছের ডাল, পাতা কিংবা অন্যান্য উপাদান ব্যবহার করে খাবার বের করতে পারে। তারা প্রয়োজন অনুযায়ী সরঞ্জাম তৈরি ও পরিবর্তনও করতে পারে। গবেষণায় এমন কাকের সন্ধান পাওয়া গেছে, যারা একাধিক টুল ধারাবাহিকভাবে ব্যবহার করে খাবার সংগ্রহ করেছে।
আরও অবাক করার মতো বিষয় হলো, পরীক্ষাগারে কিছু নিউ ক্যালেডোনিয়ান কাক ছোট একটি সরঞ্জাম ব্যবহার করে আরেকটি লম্বা সরঞ্জাম বের করে, এরপর সেটি কাজে লাগিয়ে খাবার সংগ্রহ করতে পেরেছে। অন্য এক গবেষণায় কয়েকটি কাক আলাদা আলাদা অংশ জোড়া দিয়ে নতুন ধরনের ‘কম্পাউন্ড টুল’ তৈরি করেছে।

তবে কাককে মানুষের মতো করে চিন্তা করে—এমন সিদ্ধান্ত সরাসরি দেওয়া ঠিক হবে না। গবেষকেরা তাদের আচরণকে উন্নত স্মৃতি, সামাজিক শেখা, সমস্যা সমাধান ও পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে দেখেন। কোন আচরণের পেছনে ঠিক কী ধরনের মানসিক প্রক্রিয়া কাজ করে, তা নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে।
তাই কোনো কাককে বিরক্ত করে থাকলে বিষয়টি হয়তো এত সহজে ভুলে যাওয়ার নয়! অন্তত বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, কাক কোনো মানুষকে বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করলে সেই তথ্য নিজের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি অন্য কাকের কাছ থেকেও শিখতে পারে। ফলে একটি কাকের শেখা ‘বিপদের খবর’ পুরো কাকসমাজের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।



