২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | সোমবারবাংলা: ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলাদেশ

শিক্ষার্থীশূন্য বরিশালের ৮ কলেজ, কোনো শিক্ষার্থীই ভর্তি হয়নি

untitled-17-1790570774 (1)

একসময় ছিল ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন। ছিল কলেজ, ছিল পাঠদানের অনুমতি, ছিল শিক্ষকও। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে চিত্র। কোথাও শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্তি না হওয়ায় তারা ছেড়েছেন প্রতিষ্ঠান, কোথাও স্থানীয় বিরোধে থমকে গেছে কার্যক্রম। আবার কোনো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ধরে রাখার মতো পরিবেশই তৈরি হয়নি। শেষ পর্যন্ত নীরব হয়ে গেছে কলেজগুলোর শ্রেণিকক্ষ।

বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের অধীন এমন আটটি কলেজ এবার উচ্চ মাধ্যমিক ভর্তিতে একজন শিক্ষার্থীও পায়নি। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর দেশের ১০টি কলেজে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। এর মধ্যে আটটিই বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন।

শিক্ষার্থী না পাওয়া এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে—বরগুনা সদর উপজেলার দক্ষিণ মনসাতলীর বরগুনা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ, বেতাগীর কদভানু মেমোরিয়াল সেকেন্ডারি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া সেকেন্ডারি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, পিরোজপুরের স্বরূপকাঠির পূর্ব জালাবাড়ি আদর্শ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও সেহাঙ্গল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, পটুয়াখালী সদরের পাজাখালী কলেজ, গলাচিপার পানপট্টি কলেজ এবং কাউখালীর ইজিএস শিক্ষা নিকেতন।

এর মধ্যে পাঁচটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে উন্নীত হয়েছিল। অন্য তিনটি প্রতিষ্ঠান শুরু থেকেই কলেজ হিসেবে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু দীর্ঘদিন চালানোর পর ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এমপিওভুক্তির আশায় অনেক শিক্ষক-কর্মচারী বিনা বেতনে কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও এমপিও না হওয়ায় তারা একে একে অন্যত্র চলে যান। ফলে শিক্ষক সংকট তৈরি হয়। কোথাও আবার স্থানীয় বিরোধ ও দলাদলি শিক্ষার্থী ভর্তিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

শিক্ষক নেই, শিক্ষার্থীও নেই

বরগুনার বেতাগীর চান্দুখালী বাজারের কদভানু মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৪ সালে। ২০১৬ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে উন্নীত হয় প্রতিষ্ঠানটি। প্রধান শিক্ষক শামীমা নাসরিনের দাবি, প্রতিবছর প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১০০ শিক্ষার্থী এসএসসি পাস করত। তাদের ওপর নির্ভর করেই কলেজ শাখা চালু করা হয়েছিল। কিন্তু শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে ২০২৪ সালে কলেজে ভর্তি বন্ধ হয়ে যায়। তবে স্থানীয়ভাবে জানা যায়, প্রতিষ্ঠাতা বীর মুক্তিযোদ্ধা মোশারফ হোসেন বিদ্যালয়ের পাশেই নিজের নামে একটি ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। ফলে এসএসসি পাস শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ ওই কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক শাখায় ভর্তি হতে থাকে। এতে কদভানু বিদ্যালয়ের কলেজ শাখায় শিক্ষার্থী সংকট আরও প্রকট হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালে সেখানে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ছিল মাত্র একজন।

Advertisements

ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজের গল্পটিও প্রায় একই। ২০১৪ সালে উচ্চ মাধ্যমিকে উন্নীত হওয়ার পর আশপাশের কয়েকটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক বিনা বেতনে সেখানে প্রভাষক হিসেবে ক্লাস নিতেন। কিন্তু এমপিওভুক্তি না হওয়ায় একপর্যায়ে তারা যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। সদ্য অবসর নেওয়া প্রধান শিক্ষক জলিলুর রহমান জানান, পরে বিদ্যালয়ের নিজস্ব শিক্ষকরাই কলেজ শাখায় ক্লাস নিতেন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের মধ্যেই প্রশ্ন তৈরি হয়—স্কুলের শিক্ষকরা কেন কলেজে পড়াবেন? শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের পর আর শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়নি।

দাতার সহায়তা থামতেই থেমে গেল কলেজ

পিরোজপুরের স্বরূপকাঠির সেহাঙ্গল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কলেজ শাখার যাত্রার পেছনে ছিলেন ঢাকার ব্যবসায়ী একেএম শামসুদোহা ফারুক। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মনিরুজ্জামানের ভাষ্য, দাতা হিসেবে তিনি উচ্চ মাধ্যমিক কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেন। কিন্তু বোর্ডের পাঠদান অনুমতি ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি আর তেমন কোনো সহায়তা পায়নি।

কলেজের ব্যয় বহন করতে গিয়ে একপর্যায়ে দাতাও সরে দাঁড়ান। এরপর প্রায় চার বছর আগে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। সর্বশেষ ২০২৪ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় দুজন অংশ নিয়ে একজন উত্তীর্ণ হন। একই উপজেলার পূর্ব জালাবাড়ি আদর্শ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইতিহাসও দীর্ঘ। ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি প্রায় তিন দশক আগে উচ্চ মাধ্যমিক কার্যক্রম শুরু করেছিল বলে জানান প্রধান শিক্ষক সঞ্জয় কুমার। তবে মাঝখানে কয়েক দফা কার্যক্রম বন্ধও ছিল।

প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ২১১ জন অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন ১৫৫ জন। ২০২৪ সালে পরীক্ষার্থী ছিলেন ছয়জন। এরপর আর শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি।

স্থানীয় বিরোধেও বন্ধ হয়েছে কলেজ

কাউখালীর ইজিএস শিক্ষা নিকেতনের কলেজ শাখা বন্ধ হওয়ার পেছনে স্থানীয় দলাদলিকে দায়ী করেছেন প্রধান শিক্ষক তানভীর আহমেদ। তাঁর দাবি, স্থানীয় একটি পক্ষ গ্রামে গ্রামে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সেখানে ভর্তি না হওয়ার জন্য উৎসাহিত করত। পরে ওই পক্ষই পাঠদানের অনুমতি বাতিলের জন্য শিক্ষা বোর্ডে আবেদন করে। ফলে প্রায় তিন বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটিতে উচ্চ মাধ্যমিকে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে না।

পটুয়াখালীর পাজাখালী কলেজের অচলাবস্থার কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠানের অন্য শিক্ষকদের দায়ী করেছেন প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ মো. আশরাফ আলী। ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠিত কলেজটিতে শুরু থেকেই নানা সমস্যা তৈরি হয় বলে তাঁর দাবি। তিনি কয়েকবার তাবলিগ জামাতে যাওয়ার সুযোগে শিক্ষকরা কৌশলে কলেজটিকে শিক্ষার্থীশূন্য করে ফেলেছেন বলেও অভিযোগ করেন। বর্তমানে স্থানীয় সংসদ সদস্যের সুপারিশ নিয়ে আবার কলেজটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

বোর্ডের তালিকায় এখনও ‘জীবিত’ প্রতিষ্ঠান

মজার বিষয় হলো, বাস্তবে কয়েক বছর ধরে কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও শিক্ষা বোর্ডের তথ্যভান্ডারে এসব প্রতিষ্ঠান এখনও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের কলেজ হিসেবেই রয়েছে। ফলে চলতি বছরের ভর্তি প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো শিক্ষার্থীই সেখানে ভর্তি হয়নি।

এ বিষয়ে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু তাহের মোহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম বলেন, তিনি মাত্র তিন মাস আগে দায়িত্ব নিয়েছেন। শিক্ষার্থীশূন্য কলেজগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাঁর জানা নেই। ভর্তি কার্যক্রম শেষ হওয়ায় এখন এসব প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠানো হবে।

ফলে প্রশ্ন উঠছে—যেসব কলেজের শ্রেণিকক্ষে দীর্ঘদিন ধরে পাঠদান নেই, শিক্ষক নেই, শিক্ষার্থীও নেই, সেগুলোর ভবিষ্যৎ কী? শুধু কাগজে-কলমে একটি কলেজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার বদলে বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাই এখন সামনে এসেছে।

Advertisements