সব ঠিকঠাক, তবু অজানা ভয়! ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার নেপথ্যে কী?

কিছুই ঘটেনি। তবু মনে হচ্ছে, কিছু একটা ঘটতে পারে। প্রিয় মানুষটি অসুস্থ হয়ে যেতে পারেন, হঠাৎ কোনো বিপদ আসতে পারে, চাকরিতে সমস্যা হতে পারে, সম্পর্ক ভেঙে যেতে পারে কিংবা জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে আচমকা কোনো অঘটন নেমে আসতে পারে—এমন নানা আশঙ্কা কখনো কখনো মনের ভেতর ঘুরপাক খায়। বাস্তবে তখন হয়তো সবকিছু স্বাভাবিক, কিন্তু মস্তিষ্ক যেন ভবিষ্যতের অদৃশ্য বিপদের জন্য আগেভাগেই সতর্ক হয়ে বসে থাকে।
এই অনুভূতিকে অনেক সময় ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বলা যায়। অজানা বিষয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার অস্বস্তি থেকেই এর শুরু হতে পারে। মানুষ স্বভাবতই অনিশ্চয়তা কমাতে চায়। তাই সামনে কী ঘটতে পারে, তার সম্ভাব্য সব চিত্র মস্তিষ্কে তৈরি করতে থাকে। সমস্যা হয় তখনই, যখন সম্ভাবনাকে মস্তিষ্ক সত্যিকারের বিপদের মতো অনুভব করতে শুরু করে।
ধরুন, আগামী সপ্তাহে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। কাজটি এখনো শুরুই হয়নি, কিন্তু মনে হতে পারে, ‘যদি ভুল করি?’, ‘যদি সবাই খারাপ ভাবে?’, ‘যদি শেষ মুহূর্তে কোনো সমস্যা হয়?’ একটি প্রশ্নের পর আরেকটি প্রশ্ন তৈরি হতে থাকে। উত্তর খুঁজতে গিয়ে মন আরও বেশি সম্ভাব্য বিপদের কথা ভাবতে থাকে। এভাবেই সামান্য উদ্বেগ ধীরে ধীরে বড় ভয় হয়ে উঠতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এই প্রবণতাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। প্রতিদিন দুর্ঘটনা, অসুস্থতা, বিচ্ছেদ, আর্থিক ক্ষতি কিংবা নানা নেতিবাচক ঘটনার খবর চোখের সামনে আসে। এসব ঘটনা বারবার দেখলে মস্তিষ্কের কাছে মনে হতে পারে, বিপদ যেন সব সময় খুব কাছেই আছে। অথচ আমরা যে অসংখ্য স্বাভাবিক ও নিরাপদ মুহূর্তের মধ্য দিয়ে প্রতিদিন পার করি, সেগুলো সাধারণত খবর হয়ে সামনে আসে না।
আরেকটি বিষয় হলো অতীতের অভিজ্ঞতা। আগে কোনো খারাপ ঘটনা ঘটে থাকলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের কিছু ঘটবে—এমন আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। যেমন, একবার সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর পরবর্তী সম্পর্কেও একই পরিণতির ভয় কাজ করতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতা তখন ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নয়, বরং ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা চিন্তা করা অস্বাভাবিক নয়। বরং পরিকল্পনা, প্রস্তুতি এবং সতর্কতার জন্য এটি প্রয়োজনীয়ও হতে পারে। সমস্যা তখনই, যখন ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে ভাবতে ভাবতে বর্তমান জীবনটাই অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। ঘুমানোর সময়ও যদি মাথায় একই চিন্তা ঘুরতে থাকে, গুরুত্বপূর্ণ কাজে মন বসে না, বারবার আশ্বাস খুঁজতে হয় কিংবা কোনো ঘটনা ঘটার আগেই তার নেতিবাচক পরিণতি কল্পনা করতে হয়, তখন বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এমন পরিস্থিতিতে প্রথম কাজ হতে পারে—‘এটা কি সত্যিই ঘটছে, নাকি আমি শুধু আশঙ্কা করছি?’—এই প্রশ্নটি নিজেকে করা। সম্ভাবনা আর বাস্তব ঘটনা এক নয়। এরপর ভবিষ্যৎ নিয়ে অসংখ্য ‘যদি’ তৈরি না করে বর্তমান মুহূর্তে নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিষয়গুলোর দিকে মন দেওয়া যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ভবিষ্যৎকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। জীবনে অনিশ্চয়তা থাকবেই। প্রতিটি সম্ভাব্য বিপদ আগে থেকে ভেবে রাখলেই যে বিপদ এড়ানো যাবে, এমনও নয়। বরং অদেখা দিনের ভয় করতে গিয়ে আজকের দিনটিকে হারিয়ে ফেলাই হতে পারে সবচেয়ে বড় ক্ষতি।
যদি ভবিষ্যৎ নিয়ে এই ভয় দীর্ঘদিন ধরে তীব্র থাকে এবং দৈনন্দিন জীবন, ঘুম বা কাজকর্মে প্রভাব ফেলে, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সঙ্গে কথা বলা সহায়ক হতে পারে। কারণ সব ভয়কে একা সামলাতে হয় না—কখনো কখনো ভয়কে বুঝে ওঠার জন্যও একজন সহযাত্রীর প্রয়োজন হয়।



