স্তনে চাকা নেই, তবুও হতে পারে ক্যানসার?

দীর্ঘদিন ধরে স্তনে চাকা বা গুটি হওয়াকেই স্তন ক্যানসারের অন্যতম প্রধান লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়। তবে চিকিৎসকদের মতে, সব ক্ষেত্রে স্তনে চাকা তৈরি হয় না। কখনো কখনো অন্য কিছু শারীরিক পরিবর্তনের মাধ্যমেও রোগটির ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে।
তাই স্তনে কোনো গুটি নেই বলে ক্যানসারের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়। নিজের স্তনের স্বাভাবিক গঠন ও পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং অস্বাভাবিক কিছু দেখা গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার ফিনিক্সে অবস্থিত ক্যানসার চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান সিটি অব হোপের মেডিকেল অনকোলজিস্ট ডা. সিনথিয়া লিঞ্চের পরামর্শ অনুযায়ী, স্তন পর্যবেক্ষণের সময় শুধু হাত শরীরের পাশে রেখে দেখলেই হবে না। হাত কোমরে রাখা কিংবা মাথার ওপর তোলার মতো ভিন্ন অবস্থানেও স্তনের আকৃতি ও ত্বকের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যেতে পারে।

চাকা ছাড়াও যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন
১. নিপলের আকৃতিতে হঠাৎ পরিবর্তন
নিপল হঠাৎ ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া বা আগের স্বাভাবিক অবস্থান থেকে পরিবর্তিত হওয়া নজরে এলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ ধরনের পরিবর্তনকে নিপল রিট্রাকশন বলা হয়।
২. নিপল থেকে অস্বাভাবিক তরল বা রক্ত বের হওয়া
নিপল থেকে অনিয়মিতভাবে তরল বের হওয়া, বিশেষ করে তাতে রক্তের উপস্থিতি থাকা বা বারবার এমন নিঃসরণ হওয়া স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়। পোশাকে রক্তের দাগ দেখা গেলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
৩. ত্বকের গঠন বদলে যাওয়া
স্তনের ত্বক হঠাৎ মোটা, শক্ত বা কুঁচকে যেতে পারে। কখনো এটি কমলার খোসার মতো দেখাতে পারে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘পো ডিঅরেঞ্জ’ বলা হয়।
এ ধরনের পরিবর্তন ইনফ্ল্যামেটরি ব্রেস্ট ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এটি তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও আক্রমণাত্মক ধরনের স্তন ক্যানসার। এ ক্ষেত্রে অনেক সময় স্পষ্ট কোনো চাকা থাকে না। স্তনের ত্বকে লালচে ভাব, চুলকানি, গরম অনুভূতি কিংবা একটি স্তন অন্যটির তুলনায় বেশি ভারী বা বড় মনে হওয়ার মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে।
৪. নিপলে দীর্ঘদিনের ক্ষত বা খসখসে ভাব
নিপল লাল হয়ে যাওয়া, ত্বক উঠে যাওয়া, খসখসে বা আঁশযুক্ত হয়ে পড়া কিংবা দীর্ঘদিন ধরে কোনো ক্ষত না শুকানোও অবহেলা করা উচিত নয়।
কিছু ক্ষেত্রে এসব পরিবর্তন প্যাজেটস ডিজিজ অব দ্য ব্রেস্টের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এটি স্তন ক্যানসারের একটি বিরল ধরন, যা সাধারণত নিপল অঞ্চল থেকে শুরু হয়।
৫. বগলের কাছে ফোলা বা অস্বাভাবিক অনুভূতি
স্তনে কোনো গুটি ধরা না পড়লেও বগলের কাছে ফোলা বা শক্ত কোনো অংশ অনুভূত হতে পারে। স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রে লিম্ফ নোড আক্রান্ত হলে এমন পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। তবে বগলের ফোলা হওয়ার আরও অনেক কারণ থাকতে পারে, তাই এমন কিছু অনুভূত হলে পরীক্ষা করে কারণ নিশ্চিত করা জরুরি।

৬. কোনো গুটি ছাড়াই স্তনে ব্যথা
স্তনে ব্যথা থাকলেই ক্যানসার হয়েছে—এমন নয়। হরমোনের পরিবর্তন, মাসিকের সময়, গর্ভাবস্থা কিংবা সংক্রমণসহ বিভিন্ন কারণেও স্তনে ব্যথা হতে পারে।
তবে ব্যথা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, বারবার ফিরে আসে কিংবা অন্য কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তনের সঙ্গে দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। বুকের বাম পাশে ব্যথা হলে সেটি হৃদ্যন্ত্রের সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, সেটিও চিকিৎসকের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
স্তনের আকার, ত্বক, নিপল বা বগলের অংশে নতুন কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা না করাই ভালো। বিশেষ করে পরিবর্তনটি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় বা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
তবে মনে রাখতে হবে, এসব লক্ষণ দেখা দিলেই যে স্তন ক্যানসার হয়েছে, এমন নয়। বিভিন্ন সাধারণ কারণেও একই ধরনের পরিবর্তন হতে পারে। তাই নিজে থেকে রোগ নির্ণয় না করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ ও পরীক্ষা করানোই সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।
নিজের শরীরের স্বাভাবিক পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকুন এবং অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়লে দেরি না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো সমস্যা শনাক্ত হলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগও থাকে।



