২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | শনিবারবাংলা: ১১ আশ্বিন ১৪৩৩
পরিবেশ

এলিফ্যান্ট বার্ড: যার ডিম সাগর ডিঙিয়ে পাড়ি দিয়েছিল হাজার মাইল

এলিফ্যান্ট বার্ড: যার ডিম সাগর ডিঙিয়ে পাড়ি দিয়েছিল হাজার মাইল

হাজার মাইল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ভাসতে ভাসতে একটি বিশাল ডিম পৌঁছে গেল অচেনা এক উপকূলে। কী, শুনতে রূপকথার মতো লাগছে? কিন্তু ঘটনাটি মাদাগাস্কারে ঘটেছিল। ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে ৭ হাজার থেকে ৯ হাজার কিলোমিটার দূরে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া উপকূলে অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল দুটি প্রকাণ্ড ডিম। সাধারণ যেকোনো পাখির ডিম এত দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় নোনাজলের চাপে বা পাথরের ধাক্কায় ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এই ডিম দুটি ছিল এলিফ্যান্ট বার্ডের। ওর নামের বাংলা করলে হয় হাতি পাখি। তাই এর ডিমের আকার যে অন্য পাখিদের ডিমের আকারের হবে না, এটাই তো স্বাভাবিক। প্রাগৈতিহাসিক এই দানবীয় পাখির দল বাস্তবেই ঘুরে বেড়াত এই পৃথিবীতে। উড়তে অক্ষম এই বিশালাকার পাখিদের রাজত্ব নিয়ে নানা গবেষণা আছে। ২০১৮ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর বিজ্ঞানীরা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন, এই এলিফ্যান্ট বার্ডের প্রজাতিই ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে টিকে থাকা সর্ববৃহৎ এবং সবচেয়ে ভারী পাখি।

ভেসে আসা ডিমের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
বহু বছর আগে মাদাগাস্কারের উপকূলে প্রচণ্ড ঝড়ের তোড়ে দুটি ডিম সাগরে ভেসে যায়। পানির ওপর ভেসে থাকার রহস্য ছিল, এর ভেতরে থাকা বাতাস ভর্তি ফাঁপা স্থান বা ‘এয়ার পকেট’ এবং অতি পুরু খোলস, যা নোনাজল এবং পাথরের আঘাত থেকে ভেতরের অংশ রক্ষা করে। সমুদ্রের অন্যতম শক্তিশালী স্রোত ‘অ্যান্টার্কটিক সার্কামপোলার কারেন্ট’-এর ওপর ভর করে মাসের পর মাস ভারত মহাসাগর পাড়ি দিতে থাকে বিশাল এই ডিম দুটি। অবশেষে দীর্ঘ পথ ভেসে এসে সেগুলো আছড়ে পড়ে অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে। তীরের নরম বালিয়াড়ির নিচে দ্রুত চাপা পড়ে যাওয়ায় রোদ ও বাতাসের হাত থেকে রক্ষা পায় এবং হাজার বছর অবিকৃত অবস্থায় সুরক্ষিত থাকে। বহুকাল পর, ১৯৩০ সালে স্কট রিভারে একটি এবং ১৯৯২ সালে সার্বান্তেস উপকূলে খেলার সময় শিশুদের হাতে পাওয়া যায় দ্বিতীয় ডিমটি। বিজ্ঞানের কল্যাণে প্রকাণ্ড এই ডিমগুলোর সমুদ্রজয়ের গল্প আজ প্রাকৃতিক ইতিহাসের এক রোমাঞ্চকর উপাখ্যান হয়ে টিকে আছে।

সংগৃহীত

নাম হাতি পাখি হলেও হাতি কিন্তু নয়!
‘হাতি পাখি’ নাম শুনে অনেকে ভাবতে পারেন, এরা হয়তো কোনো বড় হাতির মতো দেখতে ছিল বা হাতি আকৃতির। কিন্তু আদতে তা নয়। বিশাল আকৃতি ও শক্তিশালী গড়নের কারণে হয়তো এদের এমন নাম দেওয়া হয়েছিল। আবার অনেকের মতে, ১৩ শতকের বিখ্যাত ভেনেশীয় পর্যটক মার্কো পোলোর ভ্রমণকাহিনিতে বর্ণিত কিংবদন্তির ‘রুক’ বা ‘রক’ পাখির গল্প থেকে এই নামের উৎপত্তি, যা নাকি আস্ত একটা হাতিকে ছাঁ মেরে আকাশে তুলে নিয়ে যেতে পারত। তবে এদের শরীরে হাতির রক্ত না থাকলেও এরা আকারে আফ্রিকান হাতির সমান (৩ মিটার) উঁচু হতে পারত। যদিও ওজনের দিক থেকে হাতির চেয়ে অনেক হালকা ছিল (সর্বোচ্চ ৮০০ কেজি)। আনুমানিক ১০০০ বছর আগে মানুষের কর্মকাণ্ড এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে এরা পৃথিবী থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

দৈত্যকায় শরীর, কিন্তু খাবার নিরামিষাশী
এদের লম্বা পা, চুলের মতো খসখসে পালক এবং ধারালো শক্ত চঞ্চু বা ঠোঁট দেখে প্রাগৈতিহাসিক কোনো দানব মনে হতে পারে। কিন্তু খাবারের দিক থেকে এরা ছিল ভীষণ নিরীহ ও খাঁটি নিরামিষাশী। গভীর বনে ঘুরে ঘুরে এরা গাছে ঝুলে থাকা পাতা, ছোট ডালপালা ও ফলমূল খেয়ে জীবনধারণ করত। মাদাগাস্কারের বনে বীজ ছড়িয়ে দিয়ে বাস্তুতন্ত্র বজায় রাখতেও এরা বিশাল ভূমিকা রাখত। তবে সবচেয়ে বড় চমকটা রয়েছে এদের আত্মীয়তার সূত্রে। এত দিন অনেকে ভাবতেন, উটপাখি কিংবা মোয়াপাখি বুঝি এদের নিকটাত্মীয়। কিন্তু ২০১৪ সালের এক জিনগত গবেষণায় দেখা গেছে, এলিফ্যান্ট বার্ডের সবচেয়ে কাছের জীবিত আত্মীয় হলো নিউজিল্যান্ডের অতি ক্ষুদ্র ‘কিউই’ পাখি। বিবর্তনের ধারায় প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ বছর আগে কিউই এবং হাতি পাখির পূর্বপুরুষ একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে যায়। এরপর মাদাগাস্কার দ্বীপে কোনো বড় শিকারি প্রাণী না থাকায় ‘আইল্যান্ড জিগ্যানটিজম’ প্রক্রিয়ায় ডানা গুটিয়ে এরা হয়ে ওঠে অতিকায় এক রূপ।

সংগৃহীত

ডিম নাকি বাস্কেটবল
প্রাণিজগতের ইতিহাসে এলিফ্যান্ট বার্ডের ডিমই হলো এযাবৎকালে প্রাপ্ত সবচেয়ে বড় ডিম। একেকটি ডিমের ভেতরে ৮ দশমিক ৫ থেকে ১৩ লিটার পর্যন্ত তরল থাকত। সোজা কথায়, একটি ডিম দিয়েই বানিয়ে ফেলা যেত ১৫০ থেকে ১৮০টি মুরগির ডিমের সমান বিশাল এক ওমলেট! এদের ডিমের ফসিলে দূর সাগরের ভেসে আসার প্রমাণও মেলে। এমনকি অতীতে একটি ডিম বিক্রি হয়েছিল প্রায় এক লাখ ডলারে!

কোথায় গেল এই মহাদানব
লাখ লাখ বছর ধরে মাদাগাস্কার দ্বীপে রাজত্ব করার পর, প্রায় ১ হাজার ৫০০ বছর আগে যখন প্রথম মানুষের আগমন ঘটে সেখানে, তখন থেকে এদের ভাগ্যের চাকা উল্টো ঘুরতে শুরু করে। দ্বীপে মানুষ বসতি স্থাপন করে বন কেটে ঘাস জমিতে রূপান্তর করতে থাকে এবং খাদ্য হিসেবে এদের ডিম সংগ্রহ ও শিকার শুরু করে। খুব ধীরগতিতে বংশবৃদ্ধি করা এই বিশাল পাখিরা মানুষের তৈরি পরিবেশগত পরিবর্তন সহ্য করতে পারেনি। ফলে ৮০০ থেকে ১০৫০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে (আজ থেকে প্রায় ১০০০ বছর আগে) পৃথিবী থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই পাখি। আজ শুধু জাদুঘরের কঙ্কাল এবং ভাঙা ডিমের খোসাই আমাদের মনে করিয়ে দেয় এই বিস্ময়কর ‘এলিফ্যান্ট বার্ড’-এর কথা।

Advertisements

সূত্র: বিবিসি, ফার্স্ট পোস্ট

Advertisements