২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | মঙ্গলবারবাংলা: ৭ আশ্বিন ১৪৩৩
স্বাস্থ্য

দীর্ঘক্ষণ বসে থাকছেন? বাড়তে পারে ডিস্ক প্রলাপসের ঝুঁকি

prolapsed-or-herniated-disc-in-the-neck

দীর্ঘ সময় বসে থাকা, শারীরিক পরিশ্রমের ধরন, অতিরিক্ত ওজন, ভুলভাবে ভার তোলা কিংবা বয়স বাড়ার সঙ্গে মেরুদণ্ডের ডিস্কে পরিবর্তন—বিভিন্ন কারণে কোমর ও মেরুদণ্ডে ব্যথা দেখা দিতে পারে। এর অন্যতম কারণ হতে পারে ডিস্ক প্রলাপস বা হার্নিয়েটেড ডিস্ক।

অনেকেই একে ‘স্লিপড ডিস্ক’ নামেও চেনেন। তবে নামের কারণে মনে হতে পারে পুরো ডিস্কটি জায়গা থেকে সরে গেছে। বাস্তবে মেরুদণ্ডের দুটি হাড়ের মাঝের ডিস্কের ভেতরের নরম অংশ বাইরের শক্ত আবরণে ফাটল বা দুর্বল অংশ তৈরি হলে বাইরে বেরিয়ে এসে আশপাশের স্নায়ুর ওপর চাপ দিতে পারে। তখন ব্যথা, ঝিনঝিনি, অবশভাব বা দুর্বলতার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ডিস্ক প্রলাপস কী?

মেরুদণ্ডের প্রতিটি কশেরুকার মাঝখানে নরম ও স্থিতিস্থাপক ডিস্ক থাকে। এটি হাড় দুটির মধ্যে এক ধরনের কুশনের মতো কাজ করে এবং মেরুদণ্ডকে নড়াচড়ায় সহায়তা করে।

ডিস্কের মাঝখানে জেলির মতো নরম অংশ এবং বাইরে তুলনামূলক শক্ত আবরণ থাকে। কোনো কারণে বাইরের আবরণে ক্ষতি বা ফাটল তৈরি হলে ভেতরের অংশ বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে। এই অবস্থাকে হার্নিয়েটেড বা প্রলাপসড ডিস্ক বলা হয়।

কোমরের নিচের অংশে এটি বেশি দেখা যায়। বেরিয়ে আসা ডিস্কের অংশ যদি কাছের কোনো স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তখন কোমর থেকে নিতম্ব, উরু, পায়ের পেছনের অংশ বা পায়ের পাতার দিকে ব্যথা ছড়িয়ে যেতে পারে।

কেন ডিস্ক প্রলাপস হয়?

ডিস্ক প্রলাপসের পেছনে সবসময় একটি নির্দিষ্ট কারণ থাকে না। অনেক ক্ষেত্রে বয়সের সঙ্গে ডিস্কের স্বাভাবিক ক্ষয় ও স্থিতিস্থাপকতা কমে যাওয়ার ফলে ধীরে ধীরে সমস্যা তৈরি হয়। আবার কিছু শারীরিক অভ্যাস ও কাজের ধরন ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

Advertisements

যেসব কারণে ঝুঁকি বাড়তে পারে

১. দীর্ঘ সময় বসে থাকা
একটানা বসে থাকা এবং কম নড়াচড়া করা কোমরের ওপর চাপ বাড়াতে পারে।

২. ভুলভাবে ভার তোলা
কোমর বাঁকিয়ে ভারী জিনিস তোলা বা ভার তোলার সময় শরীর মোচড়ানো ডিস্কের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

৩. অতিরিক্ত ওজন
শরীরের অতিরিক্ত ওজন কোমরের মেরুদণ্ড ও ডিস্কের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।

৪. শারীরিক পরিশ্রমের ধরন
যেসব কাজে নিয়মিত ভার তোলা, ঠেলা, টানা, ঝুঁকে কাজ করা বা শরীর মোচড়ানোর প্রয়োজন হয়, সেসব ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়তে পারে।

৫. বয়সজনিত পরিবর্তন
বয়স বাড়ার সঙ্গে ডিস্কের পানি ও স্থিতিস্থাপকতা কমে যেতে পারে। ফলে ছোটখাটো নড়াচড়াতেও ডিস্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

৬. শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা
নিয়মিত শরীরচর্চা না করা এবং দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকা কোমরের পেশি দুর্বল করে দিতে পারে।

৭. ধূমপান
ধূমপান মেরুদণ্ডের ডিস্কের স্বাভাবিক ক্ষয়কে ত্বরান্বিত করতে পারে।

৮. আঘাত
পড়ে যাওয়া, দুর্ঘটনা বা কোমরে সরাসরি আঘাতের পরও ডিস্কের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ডিস্ক প্রলাপসের প্রধান লক্ষণ

লক্ষণ নির্ভর করে কোন ডিস্ক আক্রান্ত হয়েছে এবং সেটি কোনো স্নায়ুর ওপর চাপ দিচ্ছে কি না। অনেকের আবার ডিস্ক প্রলাপস থাকলেও কোনো উপসর্গ থাকে না।

সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—

  • কোমরের নিচের অংশে ব্যথা
  • কোমর থেকে নিতম্ব বা পায়ের দিকে ব্যথা ছড়িয়ে পড়া
  • পায়ে ঝিনঝিনি বা সুচ ফোটার মতো অনুভূতি
  • পা বা শরীরের নির্দিষ্ট অংশ অবশ হয়ে যাওয়া
  • আক্রান্ত পায়ে দুর্বলতা অনুভব করা
  • হাঁটা বা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে অসুবিধা
  • বসে থাকলে বা নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে ব্যথা বেড়ে যাওয়া
  • কাশি, হাঁচি বা কোনো নির্দিষ্ট নড়াচড়ায় ব্যথা বেড়ে যাওয়া

স্নায়ুর ওপর চাপ পড়লে ব্যথা অনেক সময় কোমর থেকে নিতম্ব হয়ে পায়ের পেছনের দিকে নামতে পারে। একে সাধারণভাবে সায়াটিকা বলা হয়।

কখন দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি?

কোমর ব্যথার সঙ্গে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা না করে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।

বিশেষ করে—

  • হঠাৎ পায়ে উল্লেখযোগ্য দুর্বলতা তৈরি হলে
  • যৌনাঙ্গ, নিতম্বের ভেতরের অংশ বা উরুর মাঝামাঝি এলাকায় অনুভূতি কমে গেলে
  • প্রস্রাব করতে না পারলে
  • প্রস্রাব বা পায়খানা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হলে
  • দ্রুত বাড়তে থাকা অবশভাব বা দুর্বলতা দেখা দিলে

এগুলো বিরল হলেও মেরুদণ্ডের নিচের অংশের গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ুগুচ্ছে চাপের লক্ষণ হতে পারে, যা কাউডা ইকুইনা সিনড্রোম নামে পরিচিত এবং জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?

শুধু কোমর ব্যথা হলেই ডিস্ক প্রলাপস হয়েছে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। চিকিৎসক সাধারণত রোগীর ব্যথার ধরন, কখন থেকে শুরু হয়েছে, কোথায় ছড়াচ্ছে এবং কোনো দুর্বলতা বা অবশভাব আছে কি না, তা জানতে চান।

এরপর শারীরিক ও স্নায়বিক পরীক্ষা করা হতে পারে। পেশির শক্তি, রিফ্লেক্স, হাঁটার ধরন এবং অনুভূতি পরীক্ষা করে আক্রান্ত স্নায়ু সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

প্রয়োজন অনুযায়ী এমআরআই করা হতে পারে। এমআরআইয়ের মাধ্যমে ডিস্কের অবস্থা এবং কোন স্নায়ুর ওপর চাপ পড়ছে তা তুলনামূলকভাবে পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। তবে প্রত্যেক কোমর ব্যথার রোগীর শুরুতেই এমআরআই প্রয়োজন হয় না। উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরীক্ষা নির্ধারণ করা হয়।

চিকিৎসা কী?

ডিস্ক প্রলাপস হলেই অস্ত্রোপচার করতে হবে—এ ধারণা সঠিক নয়। অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রে প্রথমে অস্ত্রোপচার ছাড়া চিকিৎসার চেষ্টা করা হয় এবং সময়ের সঙ্গে উপসর্গ কমে যেতে পারে।

১. স্বাভাবিক নড়াচড়া বজায় রাখা

তীব্র ব্যথার সময় কিছু কার্যক্রম সাময়িকভাবে কমাতে হতে পারে। তবে দীর্ঘ সময় সম্পূর্ণ বিছানায় পড়ে থাকা সাধারণত উপকারী নয়। সহনীয় মাত্রায় হালকা হাঁটাচলা ও দৈনন্দিন কাজ ধীরে ধীরে চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে।

২. ওষুধ

ব্যথার ধরন ও রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসক ব্যথানাশক, প্রদাহ কমানোর ওষুধ বা প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য ওষুধ দিতে পারেন। নিজের ইচ্ছায় দীর্ঘদিন ব্যথানাশক বা স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ গ্রহণ করা উচিত নয়।

৩. ফিজিওথেরাপি

উপসর্গ ও শারীরিক পরীক্ষার ভিত্তিতে ফিজিওথেরাপি দেওয়া যেতে পারে। একজন প্রশিক্ষিত ফিজিওথেরাপিস্ট রোগীর অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যায়াম, স্ট্রেচিং, পেশি শক্তিশালী করার অনুশীলন এবং নিরাপদভাবে নড়াচড়ার কৌশল শেখাতে পারেন।

৪. ইনজেকশন

কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী বা তীব্র হলে চিকিৎসক নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আক্রান্ত স্নায়ুর আশপাশে স্টেরয়েড ইনজেকশনের কথা বিবেচনা করতে পারেন। এটি সবার জন্য প্রয়োজনীয় নয়।

৫. কখন অস্ত্রোপচার লাগতে পারে?

বেশিরভাগ রোগীর অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয় না। তবে দীর্ঘদিন চিকিৎসার পরও গুরুতর ব্যথা না কমলে, উল্লেখযোগ্য পেশিশক্তি কমে গেলে, হাঁটা বা দাঁড়াতে সমস্যা হলে কিংবা মূত্র-পায়খানা নিয়ন্ত্রণের মতো জরুরি উপসর্গ দেখা দিলে সার্জারি বিবেচনা করা হতে পারে।

ডিস্ক প্রলাপস প্রতিরোধে কী করবেন?

সব ক্ষেত্রে ডিস্ক প্রলাপস পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে মেরুদণ্ড সুস্থ রাখতে কিছু অভ্যাস সহায়ক হতে পারে।

  • নিয়মিত শরীরচর্চা করুন
  • কোমর ও পেটের পেশি শক্তিশালী রাখুন
  • শরীরের স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন
  • দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকবেন না
  • বসার সময় মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক ভঙ্গি বজায় রাখুন
  • ভারী জিনিস তুলতে হলে কোমর না বাঁকিয়ে হাঁটু ভাঁজ করে তুলুন
  • ভার তোলার সময় শরীর মোচড়ানো এড়িয়ে চলুন
  • ধূমপান থেকে বিরত থাকুন
  • দীর্ঘক্ষণ গাড়ি চালানোর সময় বিরতি নিয়ে নড়াচড়া করুন
  • ব্যথা শুরু হলে নিজের মতো করে কঠিন ব্যায়াম বা ভারী ওজন তোলা শুরু করবেন না।

শেষ কথা

ডিস্ক প্রলাপস একটি পরিচিত মেরুদণ্ডজনিত সমস্যা হলেও এর চিকিৎসা রোগীর উপসর্গ ও স্নায়ুর অবস্থার ওপর নির্ভর করে। কোমর ব্যথা হলেই ডিস্ক প্রলাপস হয়েছে—এমন ধারণা যেমন ঠিক নয়, তেমনি ডিস্ক প্রলাপস মানেই অস্ত্রোপচার প্রয়োজন—এটিও সঠিক নয়।

কোমর থেকে পায়ে ব্যথা ছড়িয়ে পড়া, অবশভাব, ঝিনঝিনি বা দুর্বলতার মতো উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। আর প্রস্রাব-পায়খানা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা, যৌনাঙ্গ বা উরুর ভেতরের অংশে অনুভূতি কমে যাওয়া কিংবা দ্রুত বাড়তে থাকা পায়ের দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।

Advertisements