ক্যাফেইনের প্রভাব কেন ব্যক্তি ভেদে বদলে যায়?

ঘুম ঘুম ভাব কাটাতে, কাজের মধ্যে মনোযোগ বাড়াতে কিংবা দিনের শুরুতে সতেজ হতে অনেকেই কফির ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু একই পরিমাণ কফি পান করেও সবার অভিজ্ঞতা এক রকম হয় না। কারও এক কাপ কফিতেই বেশ চাঙ্গা লাগে, আবার কারও ক্ষেত্রে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না। এমনকি কারও রাতে ঘুমাতেও সমস্যা হতে পারে।
এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো ক্যাফেইন শরীরে সবার ক্ষেত্রে একই গতিতে কাজ করে না। জিনগত বৈশিষ্ট্য, ক্যাফেইন বিপাকের হার, নিয়মিত কফি খাওয়ার অভ্যাস, ধূমপান, কিছু ওষুধ এবং জীবনযাপনের ধরন—সবকিছু মিলেই এর প্রভাব নির্ধারণ করে।

মস্তিষ্কে কীভাবে কাজ করে ক্যাফেইন?
ক্যাফেইন একটি পরিচিত উদ্দীপক পদার্থ। কফির পাশাপাশি চা, কোমল পানীয়, এনার্জি ড্রিংক, চকলেট, কিছু চুইংগাম ও স্পোর্টস সাপ্লিমেন্টেও এটি পাওয়া যায়।
ক্যাফেইন শরীরে প্রবেশ করার পর মস্তিষ্কে অ্যাডেনোসিন নামের রাসায়নিকের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করে। অ্যাডেনোসিনের মাত্রা বাড়লে সাধারণত শরীরে ক্লান্তি ও ঘুমের অনুভূতি তৈরি হয়। ক্যাফেইন এই প্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়ায় কিছু সময়ের জন্য সতর্কতা ও মনোযোগ বাড়তে পারে এবং ক্লান্তি কম মনে হতে পারে।
কতক্ষণ শরীরে থাকে?
ক্যাফেইন দ্রুত রক্তে মিশে যায় এবং পরে মূলত লিভারের এনজাইমের মাধ্যমে শরীর থেকে ভাঙতে শুরু করে। তবে এই প্রক্রিয়ার গতি সবার এক নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যক্তিভেদে ক্যাফেইনের প্রভাব শরীরে প্রায় ৬ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত থাকতে পারে।
এ কারণেই বিকেলে কফি খাওয়ার পরও কেউ স্বাভাবিকভাবে ঘুমাতে পারেন, আবার অন্য কারও রাতে ঘুম আসতে দেরি হয়। বেশি পরিমাণে কফি বা অন্যান্য ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় গ্রহণ করলে অস্থিরতা, নার্ভাসনেস বা উদ্বেগের অনুভূতিও দেখা দিতে পারে।

জিনগত পার্থক্যেও বদলে যায় প্রভাব
ক্যাফেইন শরীরে কত দ্রুত বিপাক হবে, তার সঙ্গে জিনগত বৈশিষ্ট্যের সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে CYP1A2 নামের একটি জিন ক্যাফেইন বিপাকের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কারও শরীরে ক্যাফেইন দ্রুত ভেঙে যায়, আবার কারও ক্ষেত্রে একই প্রক্রিয়া তুলনামূলক ধীর। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যেও ক্যাফেইন বিপাকের গড় গতিতে পার্থক্য দেখা যেতে পারে। ফলে একই কাপ কফি দুই ব্যক্তির ওপর ভিন্ন ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
ধূমপান ও ওষুধও প্রভাব ফেলে
ধূমপানের অভ্যাস ক্যাফেইন বিপাকের গতি বাড়াতে পারে। ফলে নিয়মিত ধূমপায়ীদের শরীরে ক্যাফেইনের প্রভাব তুলনামূলক দ্রুত কমে যেতে পারে। আবার ধূমপান ছেড়ে দিলে ক্যাফেইনের প্রভাব আগের তুলনায় বেশি সময় অনুভূত হতে পারে।
এ ছাড়া কিছু ওষুধ ক্যাফেইন ভাঙার প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিতে পারে। নির্দিষ্ট কিছু অ্যান্টিবায়োটিক ও জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়িসহ কয়েক ধরনের ওষুধের ক্ষেত্রে এমন প্রভাব দেখা যেতে পারে। গর্ভাবস্থায় হরমোনগত পরিবর্তনের কারণেও ক্যাফেইন বিপাকের গতি কমতে পারে।
প্রতিদিন কফি খেলে কেন আগের মতো কাজ করে না?
প্রতিদিন নিয়মিত ক্যাফেইন গ্রহণ করলে শরীর ধীরে ধীরে এর সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যায়। ফলে প্রথম দিকে যে পরিমাণ কফি পান করলেই সতেজ লাগত, পরে একই পরিমাণে তেমন প্রভাব নাও পাওয়া যেতে পারে। একে ক্যাফেইনের প্রতি সহনশীলতা (tolerance) বলা হয়।
কিছুদিন ক্যাফেইন গ্রহণ থেকে বিরতি নিলে এই সহনশীলতা কিছুটা কমতে পারে। তখন আবার কফি পান করলে আগের তুলনায় এর প্রভাব বেশি অনুভূত হতে পারে।
ঘুমানোর কতক্ষণ আগে কফি বন্ধ করবেন?
ক্যাফেইনের কারণে ঘুমের সমস্যা এড়াতে ঘুমানোর অন্তত ছয় ঘণ্টা আগে ক্যাফেইন গ্রহণ বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে সবার শরীরে ক্যাফেইনের বিপাক একই গতিতে হয় না। তাই কারও ক্ষেত্রে আরও আগে কফি বন্ধ করা প্রয়োজন হতে পারে।
যেমন, রাত ১০টায় ঘুমানোর অভ্যাস থাকলে দুপুর ২টার পর কফি বা অন্য ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলা যেতে পারে। তবে ব্যক্তিগত সংবেদনশীলতার ওপর নির্ভর করে এই সময়সীমা কমবেশি হতে পারে।
গর্ভাবস্থায় বাড়তি সতর্কতা
গর্ভাবস্থায় ক্যাফেইন গ্রহণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (NHS) গর্ভবতীদের দিনে ২০০ মিলিগ্রামের কম ক্যাফেইন গ্রহণের পরামর্শ দেয়।
অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ কম ওজনের শিশু জন্মসহ কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাই এ সময়ে কফি, চা, এনার্জি ড্রিংক ও অন্যান্য ক্যাফেইনযুক্ত খাবার-পানীয় মিলিয়ে মোট গ্রহণের পরিমাণ বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।

পরিমিত কফি কি উপকারী হতে পারে?
পরিমিত পরিমাণ ক্যাফেইন সাধারণত অধিকাংশ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণে অস্থিরতা, ঘুমের ব্যাঘাতসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে অতিমাত্রায় ঘনীভূত ক্যাফেইনযুক্ত পণ্য গুরুতর বিষক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, কিছু পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণায় নিয়মিত ও পরিমিত কফি পানকারীদের মধ্যে কয়েকটি রোগের ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এসব গবেষণা থেকে সরাসরি বলা যায় না যে কফিই ওই স্বাস্থ্যগত সুবিধার একমাত্র কারণ।
তাই ক্যাফেইন গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্যের অভিজ্ঞতা অনুসরণ না করে নিজের শরীরে এর প্রভাব, ঘুমের ধরন ও দৈনন্দিন অভ্যাস বিবেচনা করে পরিমাণ ও সময় নির্ধারণ করাই গুরুত্বপূর্ণ।



