কালিমার উচ্চারণে ভুল হলে কি মুসলমান থাকা যায়?

বর্তমান সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা মাতৃভাষা ছাড়া আরবি ভাষা শুদ্ধভাবে পড়তে বা উচ্চারণ করতে পারেন না। এমনকি ইসলামের অন্যতম মৌলিক ঘোষণা ‘কালিমায়ে শাহাদত’ও হয়তো তারা সম্পূর্ণ শুদ্ধ উচ্চারণে পড়তে পারেন না। তবে তাদের অন্তরে আল্লাহ তাআলার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে এবং ইসলামের প্রতি রয়েছে গভীর ভালোবাসা ও আস্থা।
এ কারণে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—আরবি উচ্চারণে ভুল হলে কি ইমান নষ্ট হয়ে যায়? কালিমায়ে শাহাদত পুরোপুরি শুদ্ধভাবে বলতে না পারলে কি একজন মানুষ নিজেকে মুসলমান হিসেবে পরিচয় দিতে পারবেন? ইসলামি শরিয়ত এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। বিষয়টি বুঝতে হলে প্রথমেই ইমানের মূল ভিত্তি সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন।
ইমানের মূল ভিত্তি কী?
কোনো ব্যক্তি যদি অন্তর থেকে আল্লাহ তাআলার একত্বে বিশ্বাস করেন, হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে আল্লাহর বান্দা, সর্বশেষ নবী ও রাসুল হিসেবে স্বীকার করেন এবং ইসলামের মৌলিক ও অকাট্য বিষয়গুলোর প্রতি বিশ্বাস রাখেন, তাহলে তিনি মুসলমান হিসেবে গণ্য হন।
শুধু আরবি ভাষা শুদ্ধভাবে উচ্চারণ করতে না পারা কিংবা কালিমায়ে শাহাদতের কিছু শব্দ সঠিকভাবে উচ্চারণে দুর্বলতার কারণে কোনো ব্যক্তি ইসলাম থেকে বের হয়ে যান না।
ইসলামের মৌলিক ভিত্তি সম্পর্কে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
بُنِيَ الإِسْلاَمُ عَلَى خَمْسٍ: شَهَادَةِ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَإِقَامِ الصَّلاَةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَالحَجِّ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ
‘ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত—এ সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল; নামাজ প্রতিষ্ঠা করা, জাকাত দেওয়া, হজ করা এবং রমজান মাসে রোজা রাখা।’
—সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, ইসলামের প্রথম ও অন্যতম মৌলিক বিষয় হলো আল্লাহর একত্ব এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রিসালাতের প্রতি বিশ্বাস ও স্বীকৃতি।
আলেমদের মতামত ও আকিদার ব্যাখ্যা
ইসলামি আকিদার আলোচনায় ইমানের কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে অন্তরের বিশ্বাসকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ইসলামের বিধান অনুযায়ী মৌখিক স্বীকৃতিরও গুরুত্ব রয়েছে।
আকিদাতুত তাহাবিয়্যাহ-তে বলা হয়েছে—
وَالإِيمَانُ هُوَ الإِقْرَارُ بِاللِّسَانِ وَالتَّصْدِيقُ بِالْجَنَانِ، وَأَنَّ جَمِيعَ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ فِي الْقُرْآنِ وَجَمِيعَ مَا صَحَّ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ الشَّرْعِ وَالْبَيَانِ كُلُّهُ حَقٌّ
এর অর্থ হলো, ‘ইমান হচ্ছে মুখে স্বীকার করা এবং অন্তরে সত্য বলে বিশ্বাস করা। আল্লাহ তাআলা কুরআনে যা নাজিল করেছেন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে শরিয়ত ও ব্যাখ্যার বিষয়ে যা সহিহভাবে প্রমাণিত হয়েছে, তার সবই সত্য বলে বিশ্বাস করা।’
—আকিদাতুত তাহাবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ১৪-১৫
এ ছাড়া শারহুল আকাইদিন নাসাফিয়্যাহ-তেও ইমানের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে—
إِنَّ الإِيمَانَ فِي الشَّرْعِ: هُوَ التَّصْدِيقُ بِمَا جَاءَ بِهِ النَّبِيُّ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ تَعَالَى أَيْ تَصْدِيقُ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالْقَلْبِ فِي جَمِيعِ مَا عُلِمَ بِالضَّرُورَةِ مَجِيئُهُ بِهِ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ تَعَالَى إِجْمَالاً … وَالإِقْرَارُ بِهِ أَيْ بِاللِّسَانِ
এর মর্মার্থ হলো, ‘শরিয়তের পরিভাষায় ইমান হচ্ছে—নবী (সা.) মহান আল্লাহর কাছ থেকে যা নিয়ে এসেছেন, সেগুলোকে অন্তর দিয়ে সত্য বলে বিশ্বাস করা এবং মুখে স্বীকার করা।’
—শারহুল আকাইদিন নাসাফিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ৩০২-৩০৩
অন্যদিকে আল-ইমানু বাইনাস সালাফি ওয়াল মুতাকাল্লিমিন (আল-ফিকহুল আকবরের ব্যাখ্যা) গ্রন্থে বলা হয়েছে—
فَمَنْ صَدَّقَ بِقَلْبِهِ، وَلَمْ يُقِرَّ بِلِسَانِهِ فَهُوَ مُؤْمِنٌ عِنْدَ اللَّهِ تَعَالَى، وَإِنْ لَمْ يَكُنْ مُؤْمِنًا فِي أَحْكَامِ الدُّنْيَا، وَمَنْ أَقَرَّ بِلِسَانِهِ، وَلَمْ يُصَدِّقْ بِقَلْبِهِ كَالْمُنَافِقِ فَهُوَ بِالْعَكْسِ
এর বাংলা অর্থে বলা হয়েছে, ‘অধিকাংশ গবেষক আলেমের মতে, ইমান মূলত অন্তরের তাসদিক বা বিশ্বাস। দুনিয়ার বিধান প্রয়োগের ক্ষেত্রে মৌখিক স্বীকৃতিরও প্রয়োজন রয়েছে। যে ব্যক্তি অন্তরে বিশ্বাস রাখে, সে আল্লাহর কাছে মুমিন।’
—আল-ইমানু বাইনাস সালাফি ওয়াল মুতাকাল্লিমিন, পৃষ্ঠা ৯৮
আল-ফিকহুল আকবরেও ইমানের বিষয়টি স্পষ্ট
আল-ফিকহুল আকবর-এ তাওহিদ ও ইমানের মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে বলা হয়েছে—
أَصْلُ التَّوْحِيدِ وَمَا يَصِحُّ الاعْتِقَادُ عَلَيْهِ يَجِبُ أَنْ يَقُولَ: آمَنْتُ بِاللَّهِ وَمَلاَئِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْبَعْثِ بَعْدَ الْمَوْتِ وَالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ مِنَ اللَّهِ تَعَالَى وَالْحِسَابِ وَالْمِيزَانِ وَالْجَنَّةِ وَالنَّارِ وَذَلِكَ كُلُّهُ حَقٌّ
এর অর্থ হলো, ‘তাওহিদ ও ইমানের ভিত্তি হচ্ছে এই বিশ্বাস রাখা—আমি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসুলগণ, মৃত্যুর পর পুনরুত্থান, তাকদিরের ভালো-মন্দ আল্লাহর পক্ষ থেকে হওয়া, হিসাব, মিজান, জান্নাত ও জাহান্নামের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলাম। এসবই সত্য।’
—আল-ফিকহুল আকবর, পৃষ্ঠা ৫/১৩
ভুল উচ্চারণ হলে কি কিছুই করার নেই?
কালিমা বা প্রয়োজনীয় দ্বীনি বিষয় উচ্চারণ করতে গিয়ে ভুল হওয়া এবং ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল করা এক বিষয় নয়। কোনো ব্যক্তি যদি আরবি উচ্চারণে দুর্বল হন, কিন্তু শেখার চেষ্টা করেন এবং অন্তর থেকে ইসলামের প্রতি বিশ্বাস রাখেন, তাহলে শুধু উচ্চারণের দুর্বলতার কারণে তার ইমান বাতিল হয়ে যায়—এমনটি বলা যায় না।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, শুদ্ধ উচ্চারণ শেখার প্রয়োজন নেই। একজন মুসলমানের জন্য তার দ্বীন পালনের জন্য যতটুকু প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করা জরুরি, ততটুকু শেখার চেষ্টা করা কর্তব্য।
বিশেষ করে কালিমায়ে শাহাদত, নামাজের প্রয়োজনীয় সূরা, দোয়া ও তাসবিহগুলো সঠিকভাবে শেখার চেষ্টা করা উচিত। কারণ ইবাদত যথাযথভাবে পালনের জন্য প্রয়োজনীয় দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রয়োজনীয় দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করা জরুরি
রদ্দুল মুহতার (ফাতাওয়ায়ে শামী)-তে দ্বীনের প্রয়োজনীয় জ্ঞান শেখার বিষয়ে বলা হয়েছে—
مِنْ فَرَائِضِ الإِسْلاَمِ تَعَلُّمُهُ مَا يَحْتَاجُ إِلَيْهِ الْعَبْدُ فِي إِقَامَةِ دِينِهِ وَإِخْلاَصِ عَمَلِهِ لِلَّهِ تَعَالَى … وَفَرْضٌ عَلَى كُلِّ مُكَلَّفٍ وَمُكَلَّفَةٍ بَعْدَ تَعَلُّمِهِ عِلْمَ الدِّينِ وَالْهِدَايَةِ تَعَلُّمُ عِلْمِ الْوُضُوءِ وَالْغُسْلِ وَالصَّلاَةِ وَالصَّوْمِ
এর মর্মার্থ হলো, ‘ইসলামের অন্যতম ফরজ হলো দ্বীন পালন, আল্লাহর জন্য আমলকে খাঁটি করা এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা। দ্বীনের মৌলিক জ্ঞান ও হেদায়েতের পর প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের জন্য অজু, গোসল, নামাজ ও রোজার প্রয়োজনীয় বিধান শেখা আবশ্যক।’
—রদ্দুল মুহতার, দারুল ফিকর, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪২
অতএব, কেউ যদি আরবি ভাষায় দুর্বল হন বা কালিমায়ে শাহাদত, কুরআনের আয়াত কিংবা নামাজের প্রয়োজনীয় দোয়া-কালাম পুরোপুরি শুদ্ধভাবে উচ্চারণ করতে না পারেন, তাহলে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। বরং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ধীরে ধীরে সঠিক উচ্চারণ শেখার চেষ্টা করা উচিত।
শেখার চেষ্টা করাটাই গুরুত্বপূর্ণ
ইসলামের প্রতি বিশ্বাস ও আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান একজন মুসলমানের জীবনের মূল ভিত্তি। আরবি উচ্চারণে দুর্বলতা থাকলেই একজন মানুষ নিজেকে মুসলমান হিসেবে পরিচয় দিতে পারবেন না—এমন ধারণা সঠিক নয়।
তবে মুসলমান হিসেবে নিজের দায়িত্বের জায়গা থেকে কালিমায়ে শাহাদত, নামাজের প্রয়োজনীয় সূরা ও দোয়া এবং কুরআন তিলাওয়াত শুদ্ধ করার চেষ্টা করা উচিত। বিশেষ করে যে বিষয়গুলো ইবাদতের জন্য অপরিহার্য, সেগুলো শেখার ব্যাপারে অবহেলা করা ঠিক নয়।
সুতরাং আরবি ভাষা পুরোপুরি শুদ্ধভাবে বলতে না পারা বা কালিমা উচ্চারণে কিছু ভুল থাকা মাত্রই কারও ইমান বাতিল হয়ে যায় না। অন্তরে ইসলামের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রেখে নিজের ভুলগুলো সংশোধনের জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
আল্লাহ তাআলা মানুষের নিয়ত, সামর্থ্য ও প্রচেষ্টার বিষয়ে অবগত। তাই ভুলের কারণে হতাশ না হয়ে ধীরে ধীরে শুদ্ধভাবে কালিমা, কুরআন তিলাওয়াত এবং প্রয়োজনীয় দ্বীনি বিষয় শেখার চেষ্টা করাই একজন মুসলমানের জন্য উত্তম পথ।



