বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বিবিধ

‘আই উইল সি ইউ এগেইন’—ডেঙ্গুতে হারানো বন্ধুর জন্য ৮ বছরের জাইমার শেষ চিঠি

F272F7FC-6889-43D8-80DA-0B11E79496B3

রাজধানীতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আট বছরের খায়রাতুন হিয়ার মৃত্যুতে শোকাহত তার পরিবার ও স্বজনেরা। তবে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছে হিয়ার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, সমবয়সী সুহায়লা জাইমা। বন্ধুকে হারানোর পর হাসপাতালেই পেনসিল দিয়ে ছবি এঁকে ছোট্ট একটি চিঠি লিখেছে সে—‘ডিয়ার হিয়া, আই লাভ ইউ সো মাচ। আই উইল সি ইউ এগেইন।’

হিয়া ও জাইমা প্লে গ্রুপ থেকে কেজি পর্যন্ত একই স্কুলে পড়েছে। একসময় তাদের বাসাও ছিল পাশাপাশি। প্রথম শ্রেণিতে ওঠার পর স্কুল ও বাসা বদলে গেলেও তাদের বন্ধুত্বে কোনো দূরত্ব তৈরি হয়নি। নিয়মিত ভিডিও কলে কথা বলা, জন্মদিন ও পারিবারিক আয়োজনে একসঙ্গে থাকা, ছবি আঁকা ও উপহার দেওয়া—সবকিছুই চলত আগের মতো।

গত ১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় হিয়া। এর আগে ২৫ আগস্ট তার মা শাহীনা আক্তার ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে হিয়ার ডেঙ্গু শনাক্ত হলে ২৮ আগস্ট তাকেও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে পরদিন তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়।

হিয়ার বাবা মো. খোকন মিয়া জানান, এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও হিয়া বুঝতে পারেনি তার অবস্থা কতটা গুরুতর। অ্যাম্বুলেন্সের দরজা খুলে দিয়ে বাসায় যেতে চেয়েছিল সে। জানতে চেয়েছিল ঘড়িতে কয়টা বাজে, দিন নাকি রাত। কিন্তু আইসিইউতে নেওয়ার পর মেয়ের সঙ্গে আর তেমন কথা বলার সুযোগ হয়নি পরিবারের।

হিয়ার মৃত্যুর খবর জাইমা জানতে পারে স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতির সময়। সেদিন স্কুলে যাওয়ার আগে বন্ধুকে হাসপাতালে দেখতে যাওয়ার কথা ছিল তার। খবর পাওয়ার পর স্কুলড্রেস পরা অবস্থাতেই বাবার হাত ধরে হাসপাতালে ছুটে যায় সে।

জাইমার বাবা জসীম উদ্দীন বলেন, কাছের কোনো মানুষের মরদেহ দেখার অভিজ্ঞতা এটাই ছিল মেয়ের প্রথম। হাসপাতালে বন্ধুর নিথর শরীর দেখে সে বারবার জানতে চাইছিল, এখন সে কী করবে। একপর্যায়ে বন্ধুর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া পা ধরে কাঁদতে থাকে।

Advertisements

বাসা থেকে বের হওয়ার সময় নিজের ব্যাগে প্যাডের কাগজ নিয়েছিল জাইমা। হাসপাতালে বসেই পেনসিল দিয়ে আঁকে দুজনের ছবি—একজন হিয়া, অন্যজন জাইমা। ছবিতে দুজনের হাত ধরা। নিচে শিশুসুলভ হাতে লিখে দেয়, ‘ডিয়ার হিয়া, আই লাভ ইউ সো মাচ। আই উইল সি ইউ এগেইন।’

ছবি আঁকা শেষ করে সেটি হিয়াকে দিতে চেয়েছিল জাইমা। পরে অ্যাম্বুলেন্সে হিয়ার কফিনের একটি রশির সঙ্গে ছবিসহ সেই চিরকুটটি বেঁধে দেওয়া হয়।

হিয়ার সঙ্গে জাইমার বন্ধুত্ব ছিল দীর্ঘদিনের। স্কুল ও বাসা বদলালেও সম্পর্কের উষ্ণতা কমেনি। জন্মদিনে একে অপরকে উপহার দেওয়া, ছবি আঁকা কিংবা দেখা হলেই গাল টিপে দেওয়া—এভাবেই চলছিল তাদের ছোট্ট বন্ধুত্ব।

হিয়ার নিজের জন্মদিন ছিল ১৩ জুলাই। সেদিন বন্ধুদের নিয়ে আনন্দ করে কেক কেটেছিল সে। আর মা শাহীনা আক্তারের জন্মদিন ১৮ সেপ্টেম্বর। মায়ের জন্মদিন উপলক্ষে আগেই একটি উপহার কার্ড বানিয়ে রেখেছিল হিয়া। পরিবারের সঙ্গে সাজেকে গিয়ে মায়ের জন্মদিন উদ্‌যাপনের পরিকল্পনাও ছিল তার। কিন্তু সেই পরিকল্পনা আর পূরণ হলো না।

মেয়েকে হারিয়ে হিয়ার মা-বাবার এখন একটাই চাওয়া—আর কোনো পরিবারকে যেন এমন শোকের মধ্য দিয়ে যেতে না হয়। হিয়ার বাবা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

এদিকে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার পরও জাইমার কান্না থামেনি। মা-বাবা নানা উপায়ে তার মন অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বারবার মনে পড়ছে প্রিয় বন্ধুর কথা। হাসপাতালেই সে বলছিল, ‘আই মিস ইউ হিয়া। আই লাভ ইউ সো মাচ।’

হিয়া আর কোনোদিন জাইমার আঁকা ছবিটি হাতে নিতে পারবে না। কিন্তু ছোট্ট বন্ধুর সেই চিঠিতে থেকে গেছে তাদের বন্ধুত্বের এক গভীর স্মৃতি—‘আই উইল সি ইউ এগেইন।’

Advertisements