বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬
বিবিধ

গাছে চড়ে বেঁচে যায় আট বছরের শিশু, হাসপাতালে পেল মায়ের দেখা

l

নেপালের ভয়াবহ বন্যার মধ্যে প্রাণ বাঁচাতে জঙ্গলে ঢুকে গাছে উঠে পড়েছিল আট বছরের শিশু জোয়াল ঘালে। এরপর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু তার মা জানতেন না ছেলে কোথায়। একপর্যায়ে দুই সন্তানই মারা গেছে বলে ধরে নিয়েছিলেন তিনি। অবশেষে এক সাংবাদিকের মাধ্যমে সন্ধান মেলে জোয়ালের। শুক্রবার হাসপাতালে ছেলের সঙ্গে দেখা হয় মায়ের।

বুধবার নেপালের উত্তরাঞ্চলীয় রসুয়া জেলায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের সময় স্কুলে ছিল জোয়াল ও তার ভাই। বন্যার পানি ও কাদার স্রোতে চারপাশের সবকিছু ভেসে যাওয়ার সময় জোয়াল এক বন্ধুর সঙ্গে স্কুল থেকে দৌড়ে জঙ্গলের দিকে চলে যায়। পরে গাছে উঠে প্রাণে বাঁচে সে।

উদ্ধারের পর তার ডান পা ভাঙা এবং মুখে কাটা ও আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। বৃহস্পতিবার তাকে রসুয়ার পার্শ্ববর্তী নুওয়াকোট জেলার ১৫ শয্যার চকরা দেব হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা তার পরিবারের কোনো সন্ধান পাচ্ছিলেন না।

এদিকে জোয়ালের মা ২৮ বছর বয়সী মত্তি মায়া তামাং এক আশ্রয়কেন্দ্র থেকে আরেক আশ্রয়কেন্দ্র এবং বিভিন্ন উদ্ধারকেন্দ্রে ছুটে বেড়াচ্ছিলেন দুই সন্তানের খোঁজে। কোথাও সন্তানদের নাম না পেয়ে একপর্যায়ে তিনি ধরে নিয়েছিলেন, দুজনই হয়তো আর বেঁচে নেই।

তামাং বলেন, ‘চতুর্থ জায়গাতেও আমার সন্তানদের নাম তালিকায় ছিল না, তারাও সেখানে ছিল না। আমি ধরে নিয়েছিলাম, আমার দুই সন্তানই আর নেই। শুধু কাঁদছিলাম। নিজেকে কোনোভাবেই সামলাতে পারছিলাম না।’

বৃহস্পতিবার হাসপাতালে জোয়ালের সঙ্গে কথা বলেছিলেন রয়টার্সের সাংবাদিক সাহানা বাজ্রাচার্য। পরিবারের সন্ধান না পাওয়ায় শিশুটির একটি ভিডিও ধারণ করা হয়, যাতে তার স্বজনেরা তাকে শনাক্ত করতে পারেন। সাংবাদিক তার ফোন নম্বর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে রেখে যান।

Advertisements

পরে সন্তানদের খোঁজ করতে গিয়ে তামাং সেই নম্বর পান এবং সাংবাদিককে ফোন করেন। তাকে জানানো হয়, জোয়াল বেঁচে আছে এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে কাঠমান্ডুতে নেওয়া হয়েছে।

তামাং বলেন, ‘আপনি যখন বললেন জোয়াল কোথায় আছে, তখন আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না। আমি ধরে নিয়েছিলাম, আর কখনো তাদের খুঁজে পাব না।’

এর মধ্যে তিনি তার ছোট ছেলেকেও জীবিত খুঁজে পেয়েছিলেন। তাই বড় ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ আরও বেশি ছিল তার কাছে। তামাং বলেন, ‘বড় ছেলেকে পাওয়ার পর মনে হলো, আমার জীবনটা যেন আবার ফিরে পেয়েছি।’

বুধবার সকালে অন্য দিনের মতোই জোয়াল ও তার ভাই স্কুলের গাড়িতে করে স্কুলে গিয়েছিল। বাড়িতে তখন তাঁতের কাজ করছিলেন তামাং। হঠাৎ তিনি ভূমিকম্পের মতো শব্দ শুনতে পান।

রসুয়ার বন্যার সূত্রপাত হয় লাংটাং লিরুং পর্বতের কাছে হিমবাহের নিচের অংশ ধসে পড়ার পর। বরফ ও পাথরের বিশাল ধস উপত্যকায় নেমে এসে ব্যাপক ভূমিধসের সৃষ্টি করে। এরপর পানি, কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত দ্রুত নিচের দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

তামাং সন্তানদের স্কুলের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। স্বাভাবিক সময়ে বাড়ি থেকে স্কুলে যেতে ১৫ থেকে ২০ মিনিট লাগলেও সেদিন তিনি পথ চিনতেই পারছিলেন না। বন্যায় স্কুল ভবনটি ধ্বংস হয়ে যায়।

তিনি বলেন, ‘কোথায় স্কুল ছিল, কোথায় বাজার ছিল-কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। চারদিকে শুধু পানি, পাথর আর কাদা।’

অন্যদিকে স্কুলে থাকা জোয়াল জানান, বন্যা আঘাত হানার সময় চারপাশ হঠাৎ ‘খুব, খুব অন্ধকার’ হয়ে যায়। এরপর সে এক বন্ধুর সঙ্গে জঙ্গলের দিকে দৌড়ে যায় এবং বাঁচার জন্য গাছে উঠে পড়ে।

উদ্ধারের সময় তার বাঁ হাতে শক্ত করে ধরা ছিল ১০ রুপির দুটি নোট। তাকে উদ্ধার করা পুলিশ সদস্যরা হাসপাতালে যেতে রাজি করানোর জন্য ওই টাকা দিয়েছিলেন বলে কর্মকর্তারা জানান।

বৃহস্পতিবার জোয়ালকে যখন হাসপাতালে পাওয়া যায়, তখনও চিকিৎসক বা কর্মকর্তারা জানতেন না তার পরিবারের অবস্থান। পরে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়।

শুক্রবার সেখানে পৌঁছান তামাং। বাস চলাচল বন্ধ থাকায় সাংবাদিক সাহানা বাজ্রাচার্য তার জন্য একটি গাড়ির ব্যবস্থা করেন। প্রায় দুই ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে হাসপাতালে পৌঁছে অবশেষে ছেলের শয্যার পাশে দাঁড়ান তিনি।

জাপানে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করা জোয়ালের বাবাও ছেলের কাছে আসার পথে ছিলেন বলে জানান তামাং।

ভয়াবহ বন্যায় রসুয়ার বহু মানুষের জীবন ও ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে। নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে অন্তত ৬১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় আড়াই হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। জাতিসংঘের শিশু সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, রসুয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিং জেলায় প্রায় ১৭ হাজার শিশু বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তবে সব হারানোর এই পরিস্থিতির মধ্যেও তামাংয়ের কাছে শুক্রবারের দিনটি ছিল স্বস্তির। হাসপাতালের বিছানায় ছেলেকে ফিরে পাওয়ার পর তিনি বলেন, ‘ও খুব দুষ্টু ছেলে। এই প্রথম যে ওর হাড় ভেঙেছে, তা নয়।’

Advertisements