বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
জীবনযাপন

পুরোনো প্রতারণার ভয় কেন নতুন সম্পর্কেও তাড়া করে?

post_img-1763042899206-122515061

একজন মানুষ আপনাকে কোনোদিন ঠকিয়েছে। হয়তো মিথ্যা বলেছে, বিশ্বাস ভেঙেছে, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি কিংবা এমনভাবে কষ্ট দিয়েছে, যার দাগ সহজে মুছে যায়নি। মানুষটি হয়তো আপনার জীবন থেকে অনেক আগেই চলে গেছে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া ভয়টা রয়ে গেছে মনের ভেতর।

এরপর জীবনে নতুন কেউ আসে। সে হয়তো যত্নশীল, আন্তরিক, দায়িত্বশীল। তবু কোথাও একটা প্রশ্ন ঘুরতে থাকে—‘যদি সেও একদিন বদলে যায়?’ ‘যদি সেও আমাকে ঠকায়?’ তখন অনেক সময় সমস্যাটা বর্তমানের মানুষটি নয়; বরং অতীতের অভিজ্ঞতা দিয়ে বর্তমানকে বিচার করতে থাকা আমাদের মন।

অতীত কেন বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ করে?
কোনো অভিজ্ঞতা যখন আমাদের গভীরভাবে আঘাত করে, তখন মস্তিষ্ক সেটিকে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বিপদ হিসেবে মনে রাখতে পারে। ফলে একই রকম কোনো পরিস্থিতি সামনে এলে আমরা আগেভাগেই সতর্ক হয়ে যাই।

একজন অতীতে মিথ্যা বলেছিল, তাই নতুন মানুষটি ফোন ধরতে একটু দেরি করলেই মনে হতে পারে—‘নিশ্চয়ই কিছু লুকাচ্ছে।’
আগের সম্পর্ক বিশ্বাস ভেঙেছিল, তাই নতুন মানুষটি কারও সঙ্গে কথা বললে মনে হতে পারে—‘আমাকেও হয়তো ঠকাচ্ছে।’
অর্থাৎ বর্তমানের ঘটনাটি যতটা না বড়, তার সঙ্গে মিশে যায় অতীতের ভয়।

সন্দেহ আর সতর্কতার মধ্যে পার্থক্য
সন্দেহ সবসময় খারাপ নয়। কেউ যদি নিয়মিত মিথ্যা বলে, কথা ও কাজের মধ্যে অসঙ্গতি থাকে, আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় কিংবা সীমারেখাকে অসম্মান করে, তাহলে সতর্ক হওয়া স্বাভাবিক।
কিন্তু সমস্যা হয় যখন প্রমাণের চেয়ে ভয় বড় হয়ে যায়।
কেউ কিছু না করেও যদি শুধু অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে তাকে সন্দেহ করতে থাকি, তাহলে সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি হয়। বারবার জিজ্ঞাসাবাদ, ফোন বা ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত নজরদারি, সামান্য পরিবর্তনেও ঝগড়া—এসব ধীরে ধীরে ভালো সম্পর্ককেও ক্লান্ত করে দিতে পারে।

‘সে এমন করবে’ আর ‘সে এমন করেছে’ এক নয়
পুরোনো আঘাত থেকে তৈরি ভয় অনেক সময় অনুমানকে সত্য বলে মনে করায়।
‘সে আমাকে ছেড়ে যাবে’—এটি ভয়।
‘সে আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা বলেছে’—এটি একটি ঘটনা।
‘সে নিশ্চয়ই আমাকে ঠকাচ্ছে’—এটি অনুমান।
‘সে ইচ্ছা করে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমার কাছ থেকে গোপন করেছে’—এটি পর্যবেক্ষণযোগ্য আচরণ।

Advertisements

এই পার্থক্য বোঝা জরুরি। কারণ সম্পর্কের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ভয় নয়, বাস্তব আচরণকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

নতুন মানুষকে পুরোনোর শাস্তি দেওয়া নয়
কেউ আপনাকে কষ্ট দিয়েছে বলে পরবর্তী মানুষটি সেই কষ্টের দায় বহন করবে—এটা ন্যায্য নয়। নতুন মানুষটি জানতেও পারে না তার আগে কেউ আপনাকে কীভাবে আঘাত করেছে। অথচ আপনার অজান্তেই আপনি হয়তো তার প্রতিটি আচরণকে পুরোনো অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করছেন।

তাই সন্দেহ তৈরি হলে নিজেকে একটি প্রশ্ন করা যেতে পারে—‘আমি কি সত্যিই তার আচরণে কোনো সমস্যা দেখছি, নাকি আমার পুরোনো অভিজ্ঞতা আমাকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছে?’
এই প্রশ্নটি অনেক কিছু পরিষ্কার করতে পারে।


কাউকে বিশ্বাস করার অর্থ নিজের সব ভয় মুছে ফেলা নয়। বরং সময়ের সঙ্গে তার কথা, কাজ ও ধারাবাহিক আচরণ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া। নিজের ভয়টাও প্রকাশ করা যায়। বলা যায়, ‘আগে আমি কষ্ট পেয়েছি, তাই কিছু বিষয়ে আমার ভয় কাজ করে।’ অভিযোগের বদলে এমন যোগাযোগ সম্পর্ককে অনেক বেশি নিরাপদ করে তুলতে পারে। আর যদি পুরোনো আঘাতের কারণে অবিশ্বাস এতটাই বেড়ে যায় যে তা বারবার সম্পর্ক নষ্ট করছে বা মানসিক শান্তি কেড়ে নিচ্ছে, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়াও উপকারী হতে পারে।

বিশ্বাস মানে অন্ধ হওয়া নয়

শেষ পর্যন্ত মনে রাখা দরকার—একজন মানুষ আপনাকে ঠকিয়েছে, এটি আপনার অতীতের সত্য; কিন্তু সবাই আপনাকে ঠকাবে, এটি ভবিষ্যতের সত্য নয়। অতীতকে ভুলে যেতে হবে না। বরং সেখান থেকে শিক্ষা নিতে হবে। সতর্ক থাকতে হবে, কিন্তু সেই সতর্কতাকে যেন অবিশ্বাসে পরিণত না করি। কারণ নতুন মানুষটি পুরোনো মানুষটি নয়। আর আপনার পুরোনো ক্ষত যেন নতুন একটি ভালো সম্পর্কের সম্ভাবনাকে নষ্ট না করে।

Advertisements