তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি বাড়লে বছরে ৩ মাস চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে বাংলাদেশের প্রবীণরা

বিশ্বের তাপমাত্রা শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রবীণ জনগোষ্ঠী বছরে টানা তিন মাস মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে থাকতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় এমন আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে।
গবেষণায় বিভিন্ন বয়সের মানুষের ওপর ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন দক্ষিণ এশিয়া ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বয়স্ক মানুষ। দক্ষিণ এশিয়ার ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমার।

গবেষকদের মতে, এসব অঞ্চলে তুলনামূলক বেশি দারিদ্র্য, পর্যাপ্ত শীতলীকরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং উচ্চ তাপমাত্রার কারণে প্রবীণদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লেও ৬০ বছরের বেশি বয়সী বিশ্বের প্রায় ২২ শতাংশ মানুষ বছরে অন্তত এক মাস অসহনীয় তাপের মুখোমুখি হতে পারেন। তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রির পর আরও প্রতি ১ ডিগ্রি বাড়ার সঙ্গে প্রায় ১০০ কোটি মানুষ এমন তাপ ও আর্দ্রতার মধ্যে পড়তে পারেন, যা তাঁদের শরীরের স্বাভাবিক সহ্যক্ষমতার বাইরে।
তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। গবেষকদের মডেল অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়া ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রবীণরা বছরে টানা প্রায় তিন মাস—দিন-রাত মিলিয়ে ২৪ ঘণ্টার চক্রে—এমন তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার মুখোমুখি হতে পারেন, যা তাঁদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করবে।

বয়স ও তাপমাত্রার প্রভাবকে বিবেচনায় নিয়ে এই মডেল তৈরি করেছেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। গবেষণাটি সোমবার ‘দ্য ল্যানসেট প্ল্যানেটারি হেলথ’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে একই গবেষক দল বয়সভেদে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে গবেষণা করলেও সেসব গবেষণায় মূলত তরুণ ও সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
এবার বিশ্বের দ্রুত বাড়তে থাকা প্রবীণ জনগোষ্ঠীর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ২১০০ সাল পর্যন্ত তিনটি ভিন্ন বয়সী গোষ্ঠীর ওপর তাপমাত্রা বৃদ্ধির সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় ‘ওয়েট-বাল্ব টেম্পারেচার’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। এই পদ্ধতির মাধ্যমে উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার সম্মিলিত প্রভাবে মানুষের শরীর কতটা তাপ সহ্য করতে পারে, তা নির্ণয় করা হয়।
গবেষকদের মূল লক্ষ্য ছিল, মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কোন পর্যায়ে পৌঁছালে প্রবীণদের শরীরের স্বাভাবিক তাপ সহ্যক্ষমতা অতিক্রম করতে পারে, সেটি নির্ধারণ করা।

বয়স বাড়ার সঙ্গে মানুষের শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতাও কমতে থাকে। প্রবীণদের সাধারণত কম ঘাম হয়। পাশাপাশি বয়সজনিত হৃদ্যন্ত্রের দুর্বলতা ও বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা থাকায় অতিরিক্ত গরম ও আর্দ্রতার প্রভাব তাঁদের ওপর বেশি পড়তে পারে।
এই বিষয়টি বোঝার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের ওপর ‘ওয়েট-বাল্ব’ পরীক্ষা চালানো হয়। উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্র পরিবেশে তাঁদের শরীর কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষণার ফলাফল থেকে বোঝা যায়, বয়স বাড়ার সঙ্গে চরম তাপমাত্রার বিরুদ্ধে শরীরের সহনশীলতা কমে আসে।

এমন সময়ে গবেষণাটি প্রকাশিত হলো, যখন ইউরোপের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র তাপপ্রবাহ চলছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে সেখানে ইতোমধ্যে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। চলমান গ্রীষ্মকে ইউরোপের ইতিহাসের অন্যতম উষ্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। গবেষকদের আশঙ্কা, জলবায়ু পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় আগামী বছরগুলোতে তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে।



