২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | মঙ্গলবারবাংলা: ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩
নারী

মাসিক থেকে মানসিক চাপ, নারীদের মাইগ্রেন বাড়ায় যেসব কারণ

image-313417-1591515999

মাইগ্রেনকে অনেকেই সাধারণ মাথাব্যথা বলে মনে করলেও এটি আসলে একটি জটিল স্নায়ুবিষয়ক সমস্যা। তীব্র মাথাব্যথার পাশাপাশি বমি বমি ভাব, বমি, আলো বা শব্দে অস্বস্তি, মাথা ঘোরা কিংবা মনোযোগে সমস্যা—বিভিন্ন ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। বিশ্বজুড়ে পুরুষের তুলনায় নারীদের মধ্যে মাইগ্রেনের প্রবণতা প্রায় তিন গুণ বেশি। বিশেষ করে বয়ঃসন্ধির পর এই পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে ধরা হয় হরমোনের ওঠানামা। শৈশবে ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে মাইগ্রেনের হার মোটামুটি কাছাকাছি থাকলেও বয়ঃসন্ধির পর মেয়েদের মধ্যে এর প্রবণতা বাড়তে থাকে। মাসিক শুরু হওয়ার সময় থেকেই অনেকের মাইগ্রেনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

হরমোন কেন মাইগ্রেন বাড়ায়?

নারীদের মাইগ্রেনের সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িত হরমোন হলো ইস্ট্রোজেন। মাসিক শুরু হওয়ার আগে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা দ্রুত কমে যায়। এই আকস্মিক পরিবর্তন কিছু নারীর মস্তিষ্ককে মাইগ্রেনের প্রতি বেশি সংবেদনশীল করে তুলতে পারে। অর্থাৎ শুধু হরমোনের মাত্রা নয়, এর দ্রুত ওঠানামাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মাসিকের সময় হওয়া মাইগ্রেনকে মেনস্ট্রুয়াল মাইগ্রেন বলা হয়। এ ধরনের মাইগ্রেন সাধারণত মাসিক শুরুর দুই দিন আগে থেকে শুরু হয়ে মাসিকের প্রথম কয়েক দিন পর্যন্ত দেখা দিতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে এই সময়ের মাইগ্রেন অন্যান্য সময়ের তুলনায় বেশি তীব্র, দীর্ঘস্থায়ী এবং চিকিৎসায় তুলনামূলক কঠিন হতে পারে।

শুধু মাসিকের সময়ই নয়, নারীর জীবনের বিভিন্ন পর্যায়েও হরমোনের পরিবর্তনের সঙ্গে মাইগ্রেনের ধরন বদলাতে পারে। বয়ঃসন্ধি, গর্ভাবস্থা, সন্তান জন্মের পরের সময়, পেরিমেনোপজ এবং মেনোপজ—এসব পর্যায়ে কারও মাইগ্রেন কমতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে বাড়তেও পারে।

সংগৃহীত

হরমোন ছাড়াও যেসব কারণে মাইগ্রেন হতে পারে

মাইগ্রেনের জন্য সাধারণত একটি মাত্র কারণ দায়ী থাকে না। বিভিন্ন ব্যক্তির ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন বিষয় আক্রমণ শুরু করতে পারে। মানসিক চাপ, ঘুমের অনিয়ম, খাবার না খেয়ে থাকা, পানিশূন্যতা, অতিরিক্ত গরম, উজ্জ্বল আলো কিংবা নির্দিষ্ট খাবার—এসবও সম্ভাব্য ট্রিগার হিসেবে কাজ করতে পারে।

Advertisements

কিছু মানুষের ক্ষেত্রে আবহাওয়ার পরিবর্তন বা অতিরিক্ত শারীরিক চাপের সঙ্গেও মাইগ্রেনের সম্পর্ক দেখা যায়। আবার একই ব্যক্তির ক্ষেত্রেও সব সময় একই ট্রিগার কাজ করবে এমন নয়। তাই নিজের ক্ষেত্রে কোন পরিস্থিতির পর মাইগ্রেন শুরু হচ্ছে, সেটি খেয়াল রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

মাইগ্রেনের লক্ষণ কী কী?

মাইগ্রেনের প্রধান লক্ষণ তীব্র মাথাব্যথা হলেও সবার অভিজ্ঞতা এক রকম নয়। কারও মাথার এক পাশে ব্যথা হতে পারে, আবার কারও পুরো মাথায় ব্যথা অনুভূত হতে পারে। এর সঙ্গে বমি বমি ভাব, বমি এবং আলো বা শব্দ সহ্য করতে না পারার মতো উপসর্গও থাকতে পারে।

কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মাথাব্যথার আগে অরা দেখা যায়। এতে চোখের সামনে ঝিকিমিকি আলো, জিগজ্যাগ রেখা, ঝাপসা দেখা বা অন্যান্য সাময়িক দৃষ্টিগত পরিবর্তন হতে পারে। তবে সব মাইগ্রেন রোগীর অরা হয় না।

মাইগ্রেনের আক্রমণ শেষ হওয়ার পরও অনেকের ক্লান্তি, দুর্বলতা বা মনোযোগে সমস্যা কিছু সময় থাকতে পারে। ফলে মাথাব্যথা কমে গেলেও সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক কর্মক্ষমতায় ফিরে যাওয়া সবসময় সম্ভব হয় না।

কীভাবে মাইগ্রেন নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়?

মাইগ্রেন সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সবার ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি কাজ করে না। তবে নিয়মিত জীবনযাপন অনেকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমানো ও জেগে ওঠা, পর্যাপ্ত পানি পান করা, নিয়মিত খাবার খাওয়া এবং দীর্ঘ সময় না খেয়ে না থাকা উপকারী হতে পারে। নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও গুরুত্বপূর্ণ।

কোন বিষয়টি নিজের মাইগ্রেন বাড়াচ্ছে তা বুঝতে হেডেক ডায়েরি রাখা যেতে পারে। কখন মাথাব্যথা হয়েছে, তার আগে কী খাওয়া হয়েছিল, কতক্ষণ ঘুম হয়েছে, মাসিকের কোন পর্যায়ে ছিলেন এবং সেদিন মানসিক চাপ কেমন ছিল—এসব লিখে রাখলে সম্ভাব্য ট্রিগার শনাক্ত করা সহজ হতে পারে।

চিকিৎসার সুযোগও রয়েছে

মাইগ্রেনের চিকিৎসায় আক্রমণের সময় ব্যবহারের ওষুধের পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসাও দেওয়া হয়। ট্রিপটানসহ নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ মাইগ্রেনের আক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা হয়। যাদের ঘন ঘন মাইগ্রেন হয়, তাদের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে প্রতিরোধমূলক ওষুধ, CGRP-ভিত্তিক চিকিৎসা বা অন্যান্য পদ্ধতিও বিবেচনা করা যেতে পারে।

যাদের মাইগ্রেনের সঙ্গে মাসিকের স্পষ্ট সম্পর্ক রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে হরমোন-সম্পর্কিত চিকিৎসার বিষয়টিও চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। তবে গর্ভনিরোধক বা হরমোন থেরাপি সবার জন্য উপযুক্ত নয়; বিশেষ করে মাইগ্রেনের ধরন ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয় বিবেচনা করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

সবশেষে, নারীদের মাইগ্রেন বেশি হওয়ার পেছনে শুধু একটি কারণকে দায়ী করা যায় না। হরমোনের পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও ঘুম, মানসিক চাপ, খাবার, পানিশূন্যতা, পরিবেশ ও ব্যক্তিগত সংবেদনশীলতাও এতে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বারবার মাইগ্রেন হলে শুধু ব্যথা সহ্য না করে এর ধরন ও ট্রিগারগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।

Advertisements