বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬
বিনোদন

সিনেমা যত খারাপ, দর্শক তত বেশি! বক্স অফিসে ‘নিউ লাই’-এর চমক

1786932748279_6a8150f8e4b08c07fd0de3611-1786884147355880448414

অগোছালো গল্প, দুর্বল অ্যানিমেশন, নিম্নমানের গ্রাফিকস এবং নানা ধরনের প্রযুক্তিগত ত্রুটি—সব মিলিয়ে চীনের স্বল্প বাজেটের অ্যানিমেশন সিনেমা ‘নিউ লাই’ মুক্তির পর দর্শক-সমালোচকদের কাছ থেকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়ারই কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা। সিনেমাটির দুর্বলতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হওয়া ব্যাপক হাস্যরস, সমালোচনা ও আলোচনা শেষ পর্যন্ত দর্শকদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি করেছে। আর সেই কৌতূহলই বাড়িয়ে দিয়েছে প্রেক্ষাগৃহে দর্শকসংখ্যা ও টিকিট বিক্রি।

চীনের সিনেমা ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম মাওইয়ানের তথ্য অনুযায়ী, মুক্তির পর প্রথম ১০ দিনে ‘নিউ লাই’ মাত্র ৭ হাজার ৭০৫ ইউয়ান আয় করেছিল। শুরুতে সিনেমাটির প্রতি দর্শকদের আগ্রহ ছিল খুবই কম। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিটির বিভিন্ন দৃশ্য, দুর্বল গ্রাফিকস ও অ্যানিমেশনের মান নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। কেউ কেউ সিনেমাটির দৃশ্য নিয়ে মজা করতে থাকেন, আবার অনেকে ছবিটির অদ্ভুত নির্মাণশৈলী নিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। ধীরে ধীরে সেই আলোচনা সিনেমাটির জন্য এক ধরনের ব্যতিক্রমী প্রচারণায় পরিণত হয়।

এরপর থেকেই ‘নিউ লাই’-এর টিকিট বিক্রি বাড়তে থাকে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিনেমাটির মোট আয় ১ কোটি ১৪ লাখ ইউয়ান ছাড়িয়ে গেছে। ফলে বড় বাজেটের হলিউড সিনেমা ‘দ্য ওডিসি’ ও ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’-এর পাশাপাশি চীনের বক্স অফিসে জায়গা করে নিয়েছে প্রায় নামমাত্র বাজেটে তৈরি এই অ্যানিমেশন সিনেমাটিও।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিনেমাটিকে ঘিরে নানা ধরনের মন্তব্যও ভাইরাল হয়েছে। একজন দর্শকের মন্তব্য বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। তিনি রসিকতা করে বলেছেন, সিনেমাটি দেখলে ৮০ মিনিট অনুশোচনা হতে পারে, কিন্তু না দেখলে হয়তো সারা জীবন আফসোস করতে হবে। এমন মন্তব্যই মূলত সিনেমাটিকে ঘিরে মানুষের কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

‘নিউ লাই’-এর গল্প একটি গরুর স্বপ্নকে কেন্দ্র করে তৈরি। সিনেমাটির দুর্বল ভিজ্যুয়াল, অস্বাভাবিক অ্যানিমেশন এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ত্রুটি নিয়েই দর্শকদের বড় একটি অংশ মজা করছেন। তবে বিষয়টি শুধু হাসি-ঠাট্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কেউ কেউ সিনেমাটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-নির্ভর নিম্নমানের কনটেন্টের বিপরীতে এক ধরনের ‘হাতে তৈরি’ চলচ্চিত্রের উদাহরণ হিসেবেও দেখছেন।

চীনের জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ওয়েইবোতেও সিনেমাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। বিভিন্ন ব্যবহারকারী ‘নিউ লাই’-কে চলতি গ্রীষ্মের বক্স অফিসের অন্যতম অপ্রত্যাশিত সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করছেন। অনেকে সিনেমাটিকে ‘ডার্ক হর্স’ হিসেবেও অভিহিত করছেন। কারণ মুক্তির আগে ছবিটি নিয়ে তেমন কোনো প্রত্যাশা বা আলোচনাই ছিল না, অথচ মুক্তির পর সমালোচনা ও হাস্যরসের মধ্য দিয়েই এটি দর্শকদের আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে।

Advertisements

সিনেমাটির নাম নিয়েও চীনে নানা ধরনের শব্দের খেলা চলছে। চীনা ভাষায় ‘নিউ’ শব্দটির অর্থ ষাঁড়। একই শব্দ চাঙা বা ঊর্ধ্বমুখী শেয়ারবাজার বোঝাতেও ব্যবহৃত হয়। ফলে দেশটির অর্থনৈতিক মন্দার সময় শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশার সঙ্গে ‘নিউ লাই’-এর নামের একটি মজার সম্পর্ক তৈরি করছেন অনেকে। কেউ কেউ সেই শব্দগত মিলকে কাজে লাগিয়ে সিনেমাটিকে সমর্থন ও প্রচার করছেন।

আরও অবাক করার মতো বিষয় হলো, মুক্তির আগে ‘নিউ লাই’-এর উল্লেখযোগ্য কোনো প্রচারণা ছিল না। এমনকি সিনেমাটির জন্য মানসম্মত একটি অফিসিয়াল পোস্টারও তৈরি করা হয়নি। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রেক্ষাগৃহে দর্শকদের ভিড়ও বাড়তে থাকে। দর্শকদের চাহিদা সামলাতে বিভিন্ন সিনেমা হলে অতিরিক্ত শো চালু করা হয়েছে।

কিছু প্রেক্ষাগৃহে সিনেমাটির প্রচারের ধরনও হয়ে উঠেছে বেশ ব্যতিক্রমী। দর্শক বাড়তে থাকায় কোথাও কোথাও হলকর্মীরা নিজেরাই কাগজ ও রং ব্যবহার করে গরুর ছবি এঁকে সিনেমাটির পোস্টার তৈরি করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব হাতে আঁকা পোস্টারের ছবিও ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে সিনেমাটির প্রচারণা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে দর্শকদের আগ্রহ।

তবে ‘নিউ লাই’-এর এই অপ্রত্যাশিত সাফল্য নিয়ে সবাই যে ইতিবাচক, তা নয়। সিনেমাটির অতিরিক্ত প্রদর্শন নিয়ে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম বেইজিং নিউজের একটি কলামে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, নিম্নমানের সিনেমাকে যদি অতিরিক্ত প্রদর্শনের সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে প্রেক্ষাগৃহগুলোর প্রতি দর্শকদের আস্থা কমে যেতে পারে।

সমালোচনা ও বিতর্কের মধ্যেও আপাতত চীনের বক্স অফিসে ‘নিউ লাই’-এর গল্প নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। যে সিনেমা শুরুতে প্রায় দর্শকহীন ছিল, সেটিই পরে সমালোচনা, হাস্যরস এবং নেতিবাচক আলোচনার কারণে বিপুল দর্শক টানছে। অর্থাৎ সিনেমাটিকে যত বেশি ‘খারাপ’ বলা হচ্ছে, ততই যেন সেটি দেখার আগ্রহ বাড়ছে এবং সেই আগ্রহ শেষ পর্যন্ত টিকিট বিক্রিতে পরিণত হচ্ছে।

‘নিউ লাই’-এর ঘটনাটি দেখিয়ে দিয়েছে, নেতিবাচক প্রচারণাও কখনো কখনো একটি সিনেমার জন্য কার্যকর প্রচারণায় পরিণত হতে পারে। দর্শকদের কৌতূহল তৈরি হলে তারা শুধু ইতিবাচক রিভিউয়ের কারণে নয়, কোনো সিনেমা কতটা খারাপ বা অদ্ভুত—সেটিও নিজের চোখে দেখার জন্য প্রেক্ষাগৃহে যেতে পারেন। তবে এই ধরনের সাফল্য দীর্ঘমেয়াদে চলচ্চিত্রের মান, নির্মাণশৈলী এবং দর্শকদের আস্থার বিকল্প হতে পারে না।

Advertisements
দর্শকনিউ লাইসিনেমা