বিয়ে করেননি রেখারানী, সঞ্চয় দিয়ে গড়েছেন মেয়েদের স্কুল

নারী শিক্ষার প্রসারে নিজের জীবনের সঞ্চয় দিয়ে স্কুল প্রতিষ্ঠা করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার ৭৭ বছর বয়সী কুমারী রেখারানী ওঝা। বিয়ে না করে সারাজীবন মানুষের সেবা ও নারী শিক্ষার বিস্তারে কাজ করা এই নারী এখন নিজের প্রতিষ্ঠিত স্কুলটিকেই সন্তানের মতো আগলে রেখেছেন। তবে অর্থসংকট ও এমপিওভুক্ত না হওয়ায় স্কুলটি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন তিনি।

১৯৪৮ সালে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার কলাবাড়ী ইউনিয়নের প্রত্যন্ত বড় গ্রামে দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন রেখারানী ওঝা। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনা করে অধ্যাপক কিংবা বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর আগেই তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। একই সঙ্গে বাবা তাকে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
তবে বিয়েতে রাজি হননি রেখারানী। নিজের স্বপ্ন পূরণে কখনো বাড়ি ছেড়ে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন, আবার কখনো আত্মীয়দের সহায়তায় পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। পরে ঢাকার নার্সিং ইনস্টিটিউট থেকে পড়াশোনা করে নার্সিংকে পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি। কর্মজীবনে বিভিন্ন হাসপাতালে স্টাফ নার্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করে অসংখ্য মানুষের সেবা করেছেন।
২০১৩ সালে চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর জীবনের দীর্ঘ কর্মজীবনে সঞ্চয় করা অর্থ দিয়ে কোটালীপাড়ার প্রত্যন্ত এলাকায় মেয়েদের জন্য একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন রেখারানী। ২০১৪ সালে টিনশেড ঘরে মাত্র একজন শিক্ষার্থী নিয়ে স্কুলটির যাত্রা শুরু হয়।
পরবর্তীতে বিদ্যালয়টির জন্য সরকারি অর্থায়নে একটি একতলা ভবনও নির্মাণ করা হয়। এরই মধ্যে স্কুলটি থেকে তিনটি ব্যাচ এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিভিন্ন স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে। দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগও দেওয়া হয় সেখানে।

স্থানীয়রা জানান, এলাকায় মেয়েদের জন্য তেমন কোনো বিদ্যালয় নেই। ফলে রেখারানীর প্রতিষ্ঠিত স্কুলটি স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছে। তবে দীর্ঘদিনেও স্কুলটি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে অনেক অভিভাবক তাদের মেয়েদের অন্য স্কুলে নিয়ে যাচ্ছেন।
রেখারানী বলেন, জীবনের সমস্ত সঞ্চয় দিয়ে তিনি নারী শিক্ষার উন্নয়নের জন্য স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেছেন। কিন্তু কয়েক বছর আগে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ভারতে চিকিৎসা নিতে গিয়ে তার জমানো অর্থের প্রায় সবই শেষ হয়ে যায়। এরপর থেকে বিদ্যালয়ের ব্যয়ভার বহন করা তার জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
৭৭ বছর বয়সী এই নারী এখন অনেকটা ঘরহীন অবস্থায় নিজের প্রতিষ্ঠিত স্কুলেই থাকেন। নিজের হাতে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানটিকে তিনি সন্তানের মতোই যত্ন করে রেখেছেন। তবে বয়স ও অর্থসংকট—দুই দিক থেকেই এখন তিনি অসহায় হয়ে পড়েছেন।

রেখারানীর প্রত্যাশা, তার মৃত্যুর পরও যেন কেউ স্কুলটির দায়িত্ব নেন এবং মেয়েদের শিক্ষার এই উদ্যোগটি চালু রাখেন। মৃত্যুর আগে বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত অবস্থায় দেখে যেতে চান তিনি।
সরকারের প্রতি তার একটাই দাবি—নারী শিক্ষার উন্নয়নে জীবনের সর্বস্ব দিয়ে যে প্রতিষ্ঠান তিনি গড়ে তুলেছেন, সেটিকে এমপিওভুক্ত করে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া হোক। তার ভাষায়, এলাকার মেয়েদের জন্য এই স্কুলটি টিকে থাকলে শুধু মেয়েরাই নয়, পুরো এলাকার মানুষ উপকৃত হবে।



