বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬
বিবিধ

তিন দেশে শক্তিশালী ভূমিকম্প, সত্যিই কি সক্রিয় হচ্ছে ‘রিং অব ফায়ার’?

WhatsApp Image 2026-08-17 at 12.19.55 PM

প্রশান্ত মহাসাগর ঘিরে থাকা বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল ‘রিং অব ফায়ার’ আবারও আলোচনায় এসেছে। অল্প সময়ের ব্যবধানে ইন্দোনেশিয়া, কলম্বিয়া ও ভেনিজুয়েলায় শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঘটনা বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস অঞ্চলে ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্প এবং এর পর সুনামির ঢেউ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
শনিবার স্থানীয় সময় ভোর ৫টা ৫৮ মিনিটে ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব নুসা টেঙ্গারা প্রদেশের ফ্লোরেস অঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে, এন্ডে শহরের প্রায় ৬৮ কিলোমিটার উত্তর-উত্তরপশ্চিমে। এতে অন্তত ৫১ জনের মৃত্যু এবং বহু মানুষের আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

ভূমিকম্পের পর ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব উপকূলে সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়। পরে বড় ধরনের সুনামির আশঙ্কা না থাকায় সতর্কতা প্রত্যাহার করা হলেও এরই মধ্যে কয়েকটি এলাকায় সুনামির ঢেউ আঘাত হানে। এপির তথ্য অনুযায়ী, রিউং এলাকায় সর্বোচ্চ ১.৬১ মিটার এবং এন্ডে রেসিডেন্সির মাউরোলে ০.৯৪ মিটার উচ্চতার ঢেউ রেকর্ড করা হয়েছে। শক্তিশালী মূল কম্পনের পরও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। অন্তত ২৩৫টি আফটারশক রেকর্ড করা হয়, যার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালীটির মাত্রা ছিল ৬.২। এতে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

ধ্বংসস্তূপের নিচে উদ্ধার অভিযান

ভূমিকম্পের সঙ্গে ভূমিধস এবং যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষতি হওয়ায় ফ্লোরেসের দুর্গম এলাকাগুলোতে পৌঁছাতে উদ্ধারকারী দলকে বেগ পেতে হচ্ছে। নাগেকিওসহ বিভিন্ন এলাকায় বহু বাড়িঘর ধসে পড়েছে। ১৫০টিরও বেশি বাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

শুধু আবাসিক ভবন নয়, স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও সরকারি স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ২ হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস হওয়া সরকারি স্থাপনার সংখ্যা শতাধিক বলে জানা গেছে। ফ্লোরেসে ভয়াবহ ভূমিকম্পের ইতিহাস অবশ্য নতুন নয়। ১৯৯২ সালে এই অঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর সৃষ্ট সুনামিতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। বর্তমান ভূমিকম্পের কেন্দ্রও সেই ঐতিহাসিক দুর্যোগের এলাকার কাছাকাছি।


কেন ইন্দোনেশিয়ায় এত ভূমিকম্প?

Advertisements

ইন্দোনেশিয়ায় ঘন ঘন ভূমিকম্পের অন্যতম কারণ দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান। দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে অবস্থিত। ঘোড়ার খুরের মতো বিস্তৃত এই বলয়টি প্রশান্ত মহাসাগরকে ঘিরে রয়েছে এবং এখানে একাধিক টেকটোনিক প্লেটের পারস্পরিক সংঘর্ষ ও গতিবিধি ঘটে। বিশেষ করে সাবডাকশন জোনে একটি টেকটোনিক প্লেট অন্য একটি প্লেটের নিচে ঢুকে যাওয়ার সময় বিপুল চাপ তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা সেই শক্তি হঠাৎ মুক্ত হলে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। একই ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতেরও সম্পর্ক রয়েছে।

ইউএসজিএসের তথ্যমতে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভূমিকম্পগুলোর প্রায় ৮১ শতাংশ প্রশান্ত মহাসাগরীয় ভূমিকম্প বলয়ের আশপাশে ঘটে।


কলম্বিয়াতেও ভয়াবহ কম্পন

ইন্দোনেশিয়ার ঘটনার কয়েক দিন আগেই পশ্চিম কলম্বিয়ায় ৭.৪ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। চলতি শতাব্দীতে দেশটিতে আঘাত হানা অন্যতম শক্তিশালী এই ভূমিকম্পে ২৫০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। তিন শতাধিক মানুষ নিখোঁজ ছিলেন। ইউএসজিএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কলম্বিয়ার ভূমিকম্পটি ছিল ‘স্ট্রাইক-স্লিপ’ ধরনের। এ ধরনের ভূমিকম্পে টেকটোনিক প্লেটগুলো একে অপরের পাশ দিয়ে অনুভূমিকভাবে সরে যাওয়ার সময় সঞ্চিত শক্তি মুক্ত হয়। এর আগে জুনে ভেনিজুয়েলাতেও অল্প ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার খবর পাওয়া যায়। মাত্র ৩০ সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার কম্পন দেশটিতে বড় ধরনের প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি ঘটায়।


তাহলে কি ‘রিং অব ফায়ার’ জেগে উঠছে?

পরপর কয়েকটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঘটনা দেখে অনেকের মনে প্রশ্ন উঠেছে—পুরো ‘রিং অব ফায়ার’ কি নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠছে? ভূতত্ত্ববিদদের মতে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শক্তিশালী ভূমিকম্প ঘটলেই এগুলোকে একটি অভিন্ন ভূমিকম্পীয় সক্রিয়তার অংশ হিসেবে দেখা যায় না। একটি বড় ভূমিকম্প কাছাকাছি এলাকায় আফটারশক বা কিছু ভূকম্পনকে প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের পৃথক অঞ্চলে সংঘটিত ভূমিকম্পের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন প্রমাণ নেই।

অর্থাৎ ইন্দোনেশিয়া, কলম্বিয়া বা ভেনিজুয়েলায় সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলো ওই অঞ্চলগুলোর স্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গেই বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই কয়েকটি বড় ভূমিকম্পের ভিত্তিতে পুরো ‘রিং অব ফায়ার’ অস্বাভাবিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।

বিশ্বের আর কোন অঞ্চল ঝুঁকিতে?

‘রিং অব ফায়ার’-এর বিস্তৃতি বিশাল। ইন্দোনেশিয়ার পাশাপাশি জাপান, ফিলিপাইন, নিউজিল্যান্ড, আলাস্কা, যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চল, মেক্সিকো, মধ্য আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল এই ভূমিকম্পপ্রবণ বলয়ের মধ্যে পড়ে।
২০১১ সালে জাপানের তোহুকু অঞ্চলের ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামি এর অন্যতম বড় উদাহরণ। আবার ১৯৬৪ সালে আলাস্কায় ৯.২ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের এই ভূমিকম্পপ্রবণতার মূল কারণ পৃথিবীর শক্ত বাইরের আবরণ বা লিথোস্ফিয়ার কয়েকটি বিশাল টেকটোনিক প্লেটে বিভক্ত। এসব প্লেট ক্রমাগত নড়াচড়া করছে। কোথাও তারা একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে, কোথাও একটি প্লেট অন্যটির নিচে ঢুকে যাচ্ছে, আবার কোথাও পাশাপাশি সরে যাচ্ছে। এসব চলাচলের সময় সঞ্চিত শক্তি হঠাৎ মুক্ত হলেই সৃষ্টি হয় ভূমিকম্প।

তাই ‘রিং অব ফায়ার’ কোনো হঠাৎ জেগে ওঠা আগ্নেয় বলয় নয়; বরং এটি পৃথিবীর সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার একটি স্থায়ী অঞ্চল। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলো অবশ্যই এই অঞ্চলের ঝুঁকির কথা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে।

Advertisements
প্রশান্ত মহাসাগরভূমিকম্পরিং অব ফায়ারসক্রিয়