বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬
জীবনযাপন

ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহারে কেন চোখে শুষ্কতা দেখা দেয়, সমাধান কী?

prothomalo-bangla_2026-08-12_rulyntyn_KBRH1920

সকাল থেকে রাত—কাজ, পড়াশোনা, বিনোদন কিংবা যোগাযোগ; জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এখন ডিজিটাল স্ক্রিনের উপস্থিতি। কম্পিউটার, স্মার্টফোন, ট্যাব কিংবা টেলিভিশনের সামনে দীর্ঘ সময় কাটানো তাই অনেকের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্ক্রিননির্ভর কাজও বেড়েছে।

এর প্রভাব পড়ছে চোখের ওপর। দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখ শুষ্ক হয়ে যাওয়া, জ্বালাপোড়া, চুলকানি, চোখে পানি পড়া, ঝাপসা দেখা, মাথাব্যথা কিংবা ঘাড়ে ব্যথার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এসব উপসর্গকে সাধারণভাবে ডিজিটাল আই স্ট্রেইন বলা হয়। একে অনেক সময় কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোমও বলা হয়।

চোখ শুষ্ক হয় কেন?

চোখের সামনের স্বচ্ছ অংশ কর্নিয়া। পরিষ্কার ও মসৃণভাবে দেখার জন্য কর্নিয়ার ওপর একটি পাতলা অশ্রুস্তর বা টিয়ার ফিল্ম থাকা জরুরি। চোখের পাতা নিয়মিত পলক ফেলার মাধ্যমে এই অশ্রুস্তর পুরো চোখের উপরিভাগে ছড়িয়ে দেয় এবং কর্নিয়াকে আর্দ্র রাখে।

স্বাভাবিক অবস্থায় চোখের পানি বাষ্পীভূত হলে চোখের স্নায়ু সেই ঘাটতির সংকেত দেয় এবং অশ্রুগ্রন্থি নতুন করে পানি তৈরি করে। এভাবেই চোখের আর্দ্রতা বজায় থাকে। কিন্তু স্ক্রিনের দিকে গভীর মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকার সময় পলক ফেলার স্বাভাবিক হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ফলে চোখের ওপরের টিয়ার ফিল্ম দ্রুত ভেঙে যায় বা বাষ্পীভূত হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় এভাবে চলতে থাকলে চোখের আর্দ্রতা কমে গিয়ে তৈরি হয় শুষ্কতা।

শুষ্ক চোখে শুধু অস্বস্তিই নয়, জ্বালাপোড়া, খসখসে অনুভূতি, চুলকানি কিংবা সাময়িক ঝাপসা দেখার সমস্যাও হতে পারে। দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহারের পর চোখ ভারী লাগা বা ব্যথা করাও অস্বাভাবিক নয়।

Advertisements

কীভাবে কমাবেন চোখের অস্বস্তি?

ডিজিটাল স্ক্রিন পুরোপুরি এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়। তবে ব্যবহারের ধরন কিছুটা পরিবর্তন করলেই চোখের ওপর চাপ কমানো যায়।
২০-২০-২০ নিয়ম মেনে চলুন। প্রতি ২০ মিনিট পর অন্তত ২০ সেকেন্ডের জন্য প্রায় ২০ ফুট দূরের কোনো কিছুর দিকে তাকান। এতে চোখকে কাছের স্ক্রিন থেকে সাময়িক বিরতি দেওয়া যায়। সচেতনভাবে পলক ফেলুন। কাজের সময় আমরা অনেকক্ষণ পলক না ফেলেই স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকি। তাই মাঝেমধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে কয়েকবার ধীরে ধীরে পলক ফেলার অভ্যাস করুন।

স্ক্রিনের দূরত্ব ঠিক রাখুন। কম্পিউটার মনিটর সাধারণত চোখ থেকে প্রায় ২০–২৮ ইঞ্চি দূরে রাখা আরামদায়ক হতে পারে। খুব কাছে থেকে স্ক্রিন দেখা এড়িয়ে চলুন। স্ক্রিনের অবস্থান ঠিক করুন। মনিটর চোখের সমান্তরালে বা সামান্য নিচে রাখলে ঘাড় ও চোখের ওপর চাপ কমতে পারে। স্ক্রিন এমনভাবে রাখুন, যাতে আলো সরাসরি প্রতিফলিত হয়ে চোখে না পড়ে।

উজ্জ্বলতা আরামদায়ক রাখুন। অতিরিক্ত উজ্জ্বল কিংবা খুব অন্ধকার স্ক্রিন—দুটিই চোখের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে। ঘরের আলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা ঠিক করুন।

প্রয়োজনে কৃত্রিম অশ্রু ব্যবহার করুন। চোখের শুষ্কতা বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে লুব্রিকেটিং আই ড্রপ বা কৃত্রিম অশ্রু ব্যবহার করা যেতে পারে। নিজের ইচ্ছায় যেকোনো ধরনের চোখের ড্রপ ব্যবহার না করাই ভালো।

শুধু স্ক্রিন নয়, জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ

চোখের সুস্থতার সঙ্গে পর্যাপ্ত ঘুম, পানি পান ও সামগ্রিক জীবনযাপনেরও সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুমের চেষ্টা করুন। বিশেষ করে ঘুমানোর আগে অপ্রয়োজনীয় স্ক্রিন ব্যবহার কমানো ভালো।পর্যাপ্ত পানি পান করুন এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের অভ্যাস গড়ে তুলুন। দীর্ঘ সময় বসে কাজ করলে মাঝেমধ্যে উঠে হাঁটুন এবং ঘাড়-কাঁধের হালকা ব্যায়াম করুন। অপ্রয়োজনীয় মোবাইল ও অন্যান্য স্ক্রিন ব্যবহারের সময়ও কমিয়ে আনুন।

তবে চোখের শুষ্কতা বা ব্যথা যদি দীর্ঘদিন ধরে থাকে, দৃষ্টির সমস্যা বাড়তে থাকে, অতিরিক্ত লালভাব দেখা দেয় কিংবা আলো সহ্য করতে কষ্ট হয়, তাহলে শুধু স্ক্রিনের কারণে হচ্ছে ধরে না নিয়ে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

ডিজিটাল প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু তার ব্যবহার যেন চোখের স্বাস্থ্যের জন্য বোঝা না হয়ে ওঠে—সেজন্য প্রয়োজন সচেতনতা। স্ক্রিন থেকে পুরোপুরি দূরে থাকা নয়, বরং সঠিক দূরত্ব, নিয়মিত বিরতি, পর্যাপ্ত পলক ফেলা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই হতে পারে চোখকে স্বস্তিতে রাখার সহজ উপায়।

Advertisements
চোখশুষ্কস্ক্রীন টাইমস্বাস্থ্য