বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬
জীবনযাপন

প্রেমের খোঁজে এবার সুপারশপে সিঙ্গেলরা, বাজারের ঝুড়িতেই মিলছে নতুন ‘সিগন্যাল’

indian-couple-shopping-groceries

কখনো ডেটিং অ্যাপে ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রোফাইল দেখা, কখনো ম্যাচ হওয়ার অপেক্ষা, আবার কখনো অনলাইনে পরিচয়ের পর দীর্ঘ কথোপকথন—আধুনিক প্রেমের শুরুটা অনেকটাই ভার্চুয়াল হয়ে গেছে। কিন্তু এই ডিজিটাল পদ্ধতিতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন অনেক সিঙ্গেল। তাই সঙ্গী খোঁজার পুরোনো, বাস্তব ও স্বতঃস্ফূর্ত পথেই ফিরতে শুরু করেছেন কেউ কেউ।

আর সেই নতুন-পুরোনো পথের একটি অদ্ভুত ঠিকানা হয়ে উঠেছে সুপারশপ।

ফিনল্যান্ডের কয়েকটি সুপারশপে বাজার করতে গিয়ে নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে চালু হয়েছে বিশেষ ধরনের গোলাপি শপিং ঝুড়ি। সাধারণ কালো বা ধূসর ঝুড়ির পাশাপাশি রাখা এই গোলাপি ঝুড়ি হাতে নেওয়ার মধ্যেই রয়েছে একটি ইঙ্গিত—ব্যক্তিটি সিঙ্গেল এবং নতুন কারও সঙ্গে পরিচিত হতে আগ্রহী।

অর্থাৎ বাজারের তালিকায় দুধ, ডিম, সবজি কিংবা পাউরুটির পাশাপাশি এবার যোগ হতে পারে ‘নতুন পরিচয়’ও।

ঝুড়িই যখন পরিচয়ের ইশারা

প্রথম দেখায় বিষয়টি মজার বা নিছক একটি সামাজিক ট্রেন্ড বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এর মধ্যে রয়েছে মানুষের সামাজিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

কেউ গোলাপি ঝুড়ি হাতে নিয়ে সুপারশপে ঢুকলে আশপাশের অন্য ক্রেতারা বুঝতে পারবেন, তিনি নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী। ফলে কাউকে আলাদা করে জিজ্ঞেস করার অস্বস্তিও কমে যায়।

Advertisements

এই উদ্যোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বেশ সাড়া ফেলেছে। গোলাপি ঝুড়ি নিয়ে তৈরি বিভিন্ন ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে এবং লাখ লাখ মানুষ সেগুলো দেখেছেন। অনেকের কাছে বিষয়টি ডেটিং অ্যাপের তুলনায় বেশি স্বাভাবিক মনে হয়েছে।

কারণ এখানে প্রথমেই কারও সাজানো অনলাইন প্রোফাইল দেখতে হচ্ছে না। ছবি, বায়ো কিংবা অ্যালগরিদমের পছন্দের ওপরও নির্ভর করতে হচ্ছে না। মানুষকে দেখা যাচ্ছে তাঁর স্বাভাবিক পরিবেশে—বাজার করতে গিয়ে, পণ্য বাছাই করতে গিয়ে কিংবা অন্য একজন ক্রেতার সঙ্গে সাধারণ কথাবার্তা বলতে বলতে।

সুপারশপ কি সত্যিই নতুন ‘ডেটিং স্পট’?

সুপারশপকে পরিচয়ের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করার ধারণা অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ২০২৪ সালে স্পেনে এমন একটি মজার ট্রেন্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিল।

সেখানে সিঙ্গেল ব্যক্তিরা শপিং ট্রলিতে উল্টো করে আনারস রাখতেন। সেটিও ছিল এক ধরনের সংকেত—ব্যক্তিটি নতুন সম্পর্কে আগ্রহী।

এমনকি সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৮টার সময়কে অনেকে অনানুষ্ঠানিক ‘ডেটিং আওয়ার’ হিসেবেও ব্যবহার করতেন। অর্থাৎ বাজার করার মতো একেবারে সাধারণ একটি দৈনন্দিন কাজও সেখানে পরিণত হয়েছিল সম্ভাব্য সঙ্গীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগে।

ফিনল্যান্ডের গোলাপি ঝুড়ির উদ্যোগ সেই ধারণাকেই আরও সরাসরি ও সহজভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।

কেন ডেটিং অ্যাপ থেকে মুখ ফেরাচ্ছেন কেউ কেউ?

এই পরিবর্তনের পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা দেখছেন ‘ডেটিং অ্যাপ ফ্যাটিগ’—অর্থাৎ দীর্ঘদিন ডেটিং অ্যাপ ব্যবহারের ফলে তৈরি হওয়া এক ধরনের ক্লান্তি।

ডেটিং অ্যাপে একজন ব্যবহারকারীকে একের পর এক প্রোফাইল দেখতে হয়। কারও ছবি পছন্দ করতে হয়, কারও সঙ্গে ম্যাচ হওয়ার অপেক্ষা করতে হয়, আবার ম্যাচ হওয়ার পরও শুরু করতে হয় কথোপকথন। অনেক সময় দীর্ঘ অনলাইন যোগাযোগের পরও সম্পর্ক বাস্তবে এগোয় না।

একই ধরনের অভিজ্ঞতা বারবার হতে থাকলে অনেকের কাছেই পুরো প্রক্রিয়াটি যান্ত্রিক মনে হতে পারে।

অন্যদিকে বাস্তব জীবনে পরিচয় অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত। কারও সঙ্গে একই পণ্যের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলা, কোনো খাবারের ব্র্যান্ড সম্পর্কে মতামত জানতে চাওয়া কিংবা বাজারের কোনো বিষয় নিয়ে ছোট্ট আলোচনা থেকেই কথোপকথনের শুরু হতে পারে।

সেখান থেকে বন্ধুত্ব, তারপর হয়তো আরও কিছু—সবটাই নির্ভর করছে দুই ব্যক্তির ওপর।

বাজারের জায়গাটাই কেন?

সুপারশপের একটি বিশেষ সুবিধা হলো, এখানে আসা মানুষদের অন্তত একটি সাধারণ উদ্দেশ্য থাকে—বাজার করা।

কেউ ফল কিনছেন, কেউ নতুন কোনো পণ্য দেখছেন, কেউ আবার সাপ্তাহিক বাজারের তালিকা মিলিয়ে নিচ্ছেন। এই স্বাভাবিক পরিবেশে অপরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলার সুযোগ তৈরি করা তুলনামূলক সহজ।

ডেটিং অ্যাপে যেখানে শুরুতেই বোঝা যায় যে দুজন মানুষ সম্ভাব্য সম্পর্কের উদ্দেশ্যে কথা বলছেন, সুপারশপে সেই চাপটা থাকে না। প্রথম কথোপকথনটি হতে পারে একেবারেই সাধারণ কোনো বিষয় নিয়ে।

এই স্বাভাবিকতাই হয়তো অফলাইন পরিচয়ের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।

শুধু প্রেম নয়, বাস্তব সম্পর্কের আকাঙ্ক্ষা

সুপারশপের এই ট্রেন্ডকে শুধু প্রেম খোঁজার নতুন পদ্ধতি হিসেবে দেখলে হয়তো পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। এর পেছনে রয়েছে মানুষের বাস্তব সামাজিক যোগাযোগের প্রতি নতুন করে আগ্রহ।

অনলাইন ডেটিংয়ের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় মানুষ এখন রানিং ক্লাব, বই পড়ার আড্ডা, ভ্রমণদল, শখের সংগঠন এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন। এসব জায়গায় পরিচয় তৈরি হচ্ছে কোনো নির্দিষ্ট ‘ডেটিং উদ্দেশ্য’ ছাড়াই।

ফলে সম্পর্কের শুরুটা আবারও ধীরে ধীরে বাস্তব জীবনের সামাজিক পরিসরে ফিরে আসছে।

একজন মানুষকে তাঁর অনলাইন প্রোফাইলের কয়েকটি ছবি বা কয়েক লাইনের বর্ণনা দিয়ে জানার বদলে তাঁকে বাস্তব পরিস্থিতিতে দেখার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তাঁর কথাবার্তা, আচরণ, রসবোধ কিংবা অন্য মানুষের সঙ্গে মেলামেশার ধরন—এসবও পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠছে।

ডিজিটাল যুগে অফলাইনে ফেরার ইঙ্গিত?

প্রযুক্তি মানুষের সম্পর্ক তৈরির পদ্ধতিকে অনেক সহজ করেছে। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে থাকা মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এখন কয়েকটি ক্লিকের ব্যাপার। কিন্তু সেই সুবিধার পাশাপাশি তৈরি হয়েছে এক ধরনের অতিরিক্ত ডিজিটাল নির্ভরতা।

ফিনল্যান্ডের গোলাপি শপিং ঝুড়ির মতো উদ্যোগগুলো হয়তো সেই বাস্তবতার বিপরীতে ছোট্ট একটি সামাজিক পরীক্ষা।

এখানে প্রযুক্তি কাউকে আপনার সামনে এনে দিচ্ছে না। বরং মানুষ নিজেই মানুষের কাছে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করছে।

একটি গোলাপি ঝুড়ি হয়তো সম্পর্কের নিশ্চয়তা দেয় না। এটি শুধু একটি সংকেত—‘আমি নতুন কারও সঙ্গে পরিচিত হতে আগ্রহী।’

তারপর বাকিটা নির্ভর করছে কথোপকথনের ওপর।

সম্ভবত এ কারণেই এই অদ্ভুত ধারণাটি এত দ্রুত মানুষের আগ্রহ তৈরি করেছে। কারণ প্রেমের খোঁজে মানুষ হয়তো আবারও সেই পুরোনো সত্যটির কাছে ফিরছে—সম্পর্কের শুরু অনেক সময় কোনো অ্যাপের ম্যাচ নয়, বরং একেবারে সাধারণ একটি মুহূর্ত থেকেই হতে পারে।

আজ সেই মুহূর্তটি হয়তো কোনো ক্যাফেতে, কোনো বইয়ের দোকানে কিংবা কোনো রানিং ক্লাবে তৈরি হচ্ছে। আর ফিনল্যান্ডে সেটি তৈরি হচ্ছে সুপারশপের বাজারের ঝুড়ি হাতে নিয়ে।

কে জানে, ভবিষ্যতে বাজারের তালিকার পাশে হয়তো নতুন সম্পর্কের সম্ভাবনাটিও যোগ হবে!

Advertisements
প্রেমবাজারসিঙ্গেলসুপারশপ