ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোনের উত্তরাধিকার দাবি নয়: হাইকোর্ট

হিন্দু দায়ভাগা আইনের আওতায় ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোন ‘রিভার্সনার’ বা পরবর্তী উত্তরাধিকারী হিসেবে সরাসরি স্বত্ব দাবি করতে পারবেন না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ বিষয়ে করা একটি দেওয়ানি রিভিশন আবেদন খারিজ করে বৃহস্পতিবার পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অধস্তন আদালতগুলোর দেওয়া আগের রায়ও বহাল রেখেছেন উচ্চ আদালত।
গত ৯ জুলাই বিচারপতি শেখ আবদুল আউয়াল ও বিচারপতি মো. রাফিজুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। ‘অমর কুমার দাসের উত্তরাধিকারী লিলি রানী দাস ও অন্যান্য বনাম ড. মনোরঞ্জন মহুরী ও অন্যান্য’ মামলার প্রেক্ষাপটে রায়টি দেওয়া হয়। বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি মো. রাফিজুল ইসলাম মূল রায়টি লেখেন।
মামলায় রিভিশন আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী সমীরণ দাস গুপ্ত। অপর পক্ষের হয়ে শুনানি করেন আইনজীবী তৌফিক আনোয়ার চৌধুরী।
বিধবা স্ত্রীর অধিকার নিয়ে আদালতের ব্যাখ্যা
রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট হিন্দু দায়ভাগা আইনের অধীনে বিধবা নারীর সম্পত্তির অধিকার এবং উত্তরাধিকার নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
আদালত বলেছেন, কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার বিধবা স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় সেই সম্পত্তিতে তার বোন পরবর্তী উত্তরাধিকারী বা রিভার্সনার হিসেবে দাবি তুলতে পারবেন না। অর্থাৎ ভাইয়ের বিধবা স্ত্রী জীবিত থাকলে তার জীবদ্দশায় ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোনের উত্তরাধিকার দাবি করার সুযোগ নেই।
স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা স্ত্রী তার সম্পত্তিতে অধিকার অর্জন করেন। যদিও এই অধিকার প্রয়োগ ও সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে তার ক্ষমতা সীমিত, তবে তিনি কোনো সম্পত্তি হস্তান্তর করলে শুধু ভবিষ্যতে উত্তরাধিকারী হওয়ার সম্ভাবনার ভিত্তিতে অন্য কেউ তা চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন না।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কোনো বিধবা সম্পত্তি হস্তান্তর করলে সেই হস্তান্তরের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার থাকবে তার মৃত্যুর পর যিনি আইনগতভাবে ওই সম্পত্তির পরবর্তী প্রকৃত উত্তরাধিকারী বা রিভার্সনার হওয়ার যোগ্য।
অন্যদিকে, কোনো ব্যক্তির সম্পত্তিতে বর্তমানে বা ভবিষ্যতে আইনগত স্বার্থ না থাকলে তিনি শুধু এই যুক্তিতে আদালতের দ্বারস্থ হতে পারবেন না যে বিধবার করা হস্তান্তরটি ‘আইনগত প্রয়োজনের’ জন্য করা হয়নি।
যে জমি নিয়ে বিরোধ
মামলার নথি অনুযায়ী, চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার রামকান্ত বিশ্বাস ১৯২০ সালে নিজের অর্থে তার ছেলে সতীশ চন্দ্র বিশ্বাসের নামে ১ দশমিক ৩৫ একর জমি কিনেছিলেন।
তবে রামকান্ত বিশ্বাস জীবিত থাকতেই তার ছেলে সতীশ চন্দ্র মারা যান। এরপর ১৯৩৩ সালে রামকান্ত বিশ্বাসও মারা যান। সতীশ চন্দ্রের স্ত্রী সাবিত্রী বালা ওই জমির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উত্তরাধিকারসূত্রে অধিকার লাভ করেন।
পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে সাবিত্রী বালা ওই জমি ড. মনোরঞ্জন মহুরীর কাছে বিক্রি করেন।
এই বিক্রয় নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত হয় পরে। রামকান্ত বিশ্বাসের মেয়ে শৌল বালা দাস দাবি করেন, জমিটি বিক্রির দলিল জাল ও প্রতারণার মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। এ অভিযোগ তুলে ১৯৯৮ সালে তিনি পটিয়ার আদালতে উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তির স্বত্ব দাবি করে দেওয়ানি মামলা করেন।
নিম্ন আদালতে পরপর হেরে যায় মামলা
মামলাটিতে উপস্থাপিত সাক্ষ্যপ্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট আইনি বিষয় পর্যালোচনা করে পটিয়ার সাব-অর্ডিনেট জজ আদালত ২০০০ সালের ২২ জুন শৌল বালা দাসের করা মামলা খারিজ করে দেন।
এরপর ওই রায়ের বিরুদ্ধে তিনি চট্টগ্রামের প্রথম অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতে আপিল করেন। কিন্তু ২০০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সেই আপিলও খারিজ হয়ে যায়।
অধস্তন আদালতের এই সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ হয়ে বাদীপক্ষ ২০০৮ সালে হাইকোর্টে দেওয়ানি রিভিশন আবেদন করে। ওই বছরই হাইকোর্ট মামলাটিতে রুল জারি করেন।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর গত ৯ জুলাই হাইকোর্ট সেই রুল খারিজ করে দেন। এর মাধ্যমে অধস্তন আদালতের দেওয়া রায় ও ডিক্রি বহাল রাখেন উচ্চ আদালত।
হাইকোর্টের এই রায়ের ফলে সংশ্লিষ্ট মামলায় ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোনের ‘রিভার্সনার’ হিসেবে উত্তরাধিকার দাবি নিয়ে হিন্দু দায়ভাগা আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা স্পষ্ট হলো।



