রেকর্ড গরমে পুড়ছে এশিয়া, সেদ্ধ হচ্ছে মাটির নিচের আলু

এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এবারের তীব্র তাপপ্রবাহ শুধু মানুষের জীবনযাত্রাকেই বিপর্যস্ত করছে না, এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষি, প্রাণী ও প্রকৃতির ওপরও। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, হংকং, চীনসহ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে একের পর এক তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙছে। কোথাও তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাচ্ছে, কোথাও আবার রাতেও স্বস্তি মিলছে না।

চরম গরমের এমনই ভয়াবহ প্রভাব দেখা গেছে দক্ষিণ কোরিয়ার কৃষিতে। দেশটির একটি এলাকায় মাটির নিচে থাকা আলু অতিরিক্ত তাপে নষ্ট হয়ে এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে কৃষকেরা সেগুলোকে ‘সেদ্ধ আলু’র সঙ্গে তুলনা করছেন। স্বাভাবিকভাবে মাটির নিচে থাকা ফসল তুলনামূলকভাবে তাপ থেকে সুরক্ষিত থাকার কথা। কিন্তু এবারের তাপপ্রবাহ সেই ধারণাকেও যেন ভুল প্রমাণ করছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউল থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে ইয়াংগু কাউন্টির একটি আলুখেতে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন কৃষক লি সাং-হিয়ক। মাত্র এক সপ্তাহ আগেও তার ক্ষেতের আলু স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু পরে মাটি খুঁড়ে ফসল তুলতে গিয়ে দেখা যায়, আলুগুলো অস্বাভাবিকভাবে নরম হয়ে গেছে এবং পচন ধরেছে।
স্থানীয় সম্প্রচারমাধ্যম এসবিএসকে লি জানান, অতিরিক্ত তাপে আলুগুলোর অবস্থা অনেকটা সেদ্ধ আলুর মতো হয়ে গেছে। ফলে এসব আলু আর সংরক্ষণ বা বাজারজাত করার মতো অবস্থায় নেই।
রেকর্ড তাপমাত্রায় বিপর্যস্ত দক্ষিণ কোরিয়া
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহ অব্যাহত রয়েছে। দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর ইয়াংসানে গত ২ আগস্ট তাপমাত্রা ৪২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। আধুনিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ শুরু হওয়ার পর এটিই দেশটিতে রেকর্ড করা সর্বোচ্চ তাপমাত্রা।

এই অস্বাভাবিক গরমের প্রভাব শুধু কৃষিজমিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। মানুষের স্বাস্থ্য, গবাদিপশু এবং মাছ চাষেও এর বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তীব্র গরমে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ৯ লাখের বেশি গবাদিপশু মারা গেছে। খামারে চাষ করা মাছের মৃত্যুর সংখ্যাও প্রায় ১৪ লাখে পৌঁছেছে।
পরিস্থিতির অবনতির কারণে কর্তৃপক্ষ তাপপ্রবাহের সতর্কতা জারি করেছে। মানুষকে দিনের তীব্র গরমের সময় বাইরের কার্যক্রম এড়িয়ে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
দেশটির প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং এই পরিস্থিতিকে আগে দেখা যায়নি এমন চরম আবহাওয়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, চরম আবহাওয়া যখন ক্রমেই স্বাভাবিক বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠছে, তখন জাতীয় পর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রচলিত পদ্ধতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
শুধু আলু নয়, নষ্ট হচ্ছে অন্যান্য ফসলও
অতিরিক্ত তাপের ধাক্কা খেয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার আরও অনেক কৃষিপণ্য। সিউল থেকে প্রায় ২৫৭ কিলোমিটার দক্ষিণে গোয়াংজু এলাকার কৃষক হং কিয়ং-হির তরমুজও তীব্র গরমে নষ্ট হয়ে গেছে।

সাধারণ সময়ে ভালো মানের তরমুজ তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি করা যায়। কিন্তু এবার তীব্র গরমের কারণে কয়েক দিনের মধ্যেই অনেক তরমুজ নরম হয়ে পচে গেছে। স্থানীয় সম্প্রচারমাধ্যম কেবিএসকে হং বলেন, প্রায় পাঁচ দশক ধরে কৃষিকাজ করলেও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি তিনি আগে কখনো হননি।
দক্ষিণ জেওলা প্রদেশের দামইয়াং কাউন্টিতেও একই ধরনের ক্ষতির চিত্র দেখা গেছে। সেখানে স্ট্রবেরিচাষি ইউন উ-হা প্রায় তিন মাস ধরে যত্ন নেওয়া চারাগাছ হারিয়েছেন।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ধরনের অস্বাভাবিক ক্ষতির ক্ষেত্রে অনেক কৃষক তাঁদের কৃষি বীমা থেকেও পর্যাপ্ত সহায়তা পাচ্ছেন না। দক্ষিণ কোরিয়ার কৃষি বীমা ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট ফসল, চাষের পদ্ধতি এবং নির্দিষ্ট অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে জলবায়ুজনিত এমন অস্বাভাবিক ক্ষতির ক্ষেত্রে অনেক কৃষক বীমার সুরক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
অর্থাৎ আবহাওয়া বদলে যাচ্ছে দ্রুত, কিন্তু কৃষকদের সুরক্ষার কাঠামো সেই গতিতে বদলাতে পারছে না।
জাপানেও ৪০ ডিগ্রির ওপরে তাপমাত্রা
দক্ষিণ কোরিয়ার পাশাপাশি জাপানেও এবারের গরম নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। দেশটির একাধিক অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হয়েছে।
চরম গরমের মাত্রা বোঝাতে জাপানের আবহাওয়া সংস্থা চলতি বছর ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার জন্য ‘কোকুশোবি’ বা ‘নিষ্ঠুর গরমের দিন’ নামে একটি নতুন শ্রেণি চালু করেছে।
তীব্র গরমের প্রভাব প্রাণীদের ওপরও পড়েছে। টোকিওর একটি চিড়িয়াখানায় অতিরিক্ত তাপের কারণে হিটস্ট্রোকে তিনটি সিংহের মৃত্যুর ঘটনাও সামনে এসেছে।
তাপপ্রবাহ যে শুধু মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে তা নয়, প্রাণীদের স্বাভাবিক জীবন ও বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনাকেও কঠিন করে তুলছে—এ ঘটনাগুলো তারই একটি উদাহরণ।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে তাপপ্রবাহের যোগসূত্র
এ ধরনের চরম তাপপ্রবাহের পেছনে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করছেন জলবায়ু গবেষকেরা।
জাপানের ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন সেন্টারের গবেষকেরা জানিয়েছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব না থাকলে জুলাইয়ে জাপানে দেখা দেওয়া এমন তীব্র তাপপ্রবাহ প্রায় অসম্ভব ছিল। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব ছাড়া এ মাত্রার তাপপ্রবাহ স্বাভাবিকভাবে প্রায় ১০ হাজার বছরে একবার ঘটতে পারত।
এই হিসাবের অর্থ হলো, জলবায়ু পরিবর্তন চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলোকে শুধু আরও উষ্ণ করছে না; অনেক ক্ষেত্রে এমন ঘটনাকে আগের তুলনায় অনেক বেশি সম্ভাব্য করে তুলছে।
কেন এতটা তীব্র হচ্ছে এবারের তাপপ্রবাহ?
পুসান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জলবায়ুবিজ্ঞানী জুন-ই লির মতে, এই অঞ্চলের তাপপ্রবাহের পেছনে একাধিক প্রাকৃতিক ও জলবায়ুগত কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
তিব্বত মালভূমি ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর শক্তিশালী উচ্চচাপ বলয় তৈরি হওয়া এবং এ বছরের এল নিনোর প্রভাব তাপপ্রবাহের তীব্রতা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা যত বাড়ছে, চরম গরমের ঘটনাগুলোর তীব্রতা ও ঘনত্বও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সর্বশেষ ‘স্টেট অব দ্য ক্লাইমেট ইন এশিয়া’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এশিয়ায় উষ্ণায়নের হার আগের তিন দশকের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এর অর্থ হলো, এশিয়ার মানুষের ভবিষ্যৎ জীবনে তাপপ্রবাহ আরও বড় বাস্তবতা হয়ে উঠতে পারে।
সামনে আরও কঠিন সময়?
জুন-ই লি সতর্ক করেছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপপ্রবাহের ঘটনা আরও ঘন ঘন এবং আরও তীব্র হতে পারে। একই সঙ্গে একের পর এক ভিন্ন ধরনের চরম আবহাওয়ার ঘটনা ঘটার প্রবণতাও বাড়ছে।
কখনো দীর্ঘ তাপপ্রবাহের পর ভারী বৃষ্টি, আবার কখনো অতিরিক্ত গরমের সঙ্গে খরা—এ ধরনের একাধিক দুর্যোগ একই অঞ্চলের মানুষকে পরপর আঘাত করতে পারে।
কৃষকদের জন্য এর অর্থ আরও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। কোন মৌসুমে কোন ফসল চাষ করা নিরাপদ, কতটা পানি প্রয়োজন, কীভাবে ফসল সংরক্ষণ করা যাবে—সবকিছু নতুন করে ভাবতে হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার মাটির নিচে আলু ‘সেদ্ধ’ হয়ে যাওয়ার ঘটনা তাই শুধু একটি বিচ্ছিন্ন কৃষি দুর্ঘটনা নয়। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কতটা গভীরে পৌঁছাতে পারে, তার একটি প্রতীকী উদাহরণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় একদিকে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ দ্রুত ও বড় মাত্রায় কমাতে হবে। অন্যদিকে যে জলবায়ু পরিবর্তন ইতিমধ্যে ঘটেছে, তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও বাড়াতে হবে।
কৃষি, স্বাস্থ্য, নগর পরিকল্পনা, প্রাণী সুরক্ষা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন পরিকল্পনা প্রয়োজন।
কারণ এবারের তাপপ্রবাহ হয়তো একটি রেকর্ড। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান গতিপথ যদি বদলানো না যায়, তাহলে এমন রেকর্ডই ভবিষ্যতে বারবার ভাঙতে পারে।
আর তখন শুধু মাটির নিচের আলু নয়—মানুষের বসবাসের পরিবেশ, খাদ্যনিরাপত্তা এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও প্রশ্নের মুখে পড়বে।



