বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬
জীবনযাপন

মানসিক ক্লান্তিতে কেন আমরা ভুল সিদ্ধান্ত নিই?

mentally-exhausted

সারাদিন কাজের চাপ, একের পর এক সিদ্ধান্ত, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, দায়িত্ব সামলানো—সব মিলিয়ে দিনের শেষে অনেক সময় মনে হয়, ‘আর কিছু ভাবতে পারছি না।’ তখন খুব সাধারণ বিষয়ও কঠিন মনে হয়। কারও কথায় অযথা রেগে যাওয়া, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খরচ করা, গুরুত্বপূর্ণ কাজ ফেলে রাখা কিংবা হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা, যা পরে ভেবে মনে হয়—‘এটা আমি কীভাবে করলাম?’

এর পেছনে কাজ করতে পারে মানসিক ক্লান্তি (mental fatigue)। এটি শুধু মন খারাপ বা শারীরিক অবসাদ নয়; দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ, চিন্তা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো মানসিক কাজ করতে করতে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতায় সাময়িক পরিবর্তন আসতে পারে। ফলে সিদ্ধান্তের মানও প্রভাবিত হয়।

মস্তিষ্ক যখন ‘ক্লান্ত’ হয়ে পড়ে
আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য সমান পরিমাণ মানসিক শক্তি প্রয়োজন হয় না। সকালে কী পোশাক পরব—এটি যেমন সহজ সিদ্ধান্ত, তেমনি চাকরি বদলানো, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা করা কিংবা সম্পর্কের জটিলতা সামলানো অনেক বেশি চিন্তাশক্তি দাবি করে।
বিশেষ করে prefrontal cortex বা মস্তিষ্কের সামনের অংশটি পরিকল্পনা, মনোযোগ, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং জটিল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক চাপ ও মনোযোগের প্রয়োজন এমন কাজ করতে থাকলে আমরা একই মাত্রায় মনোযোগ ধরে রাখতে পারি না।

তখন মস্তিষ্ক অপেক্ষাকৃত সহজ পথ বেছে নিতে চায়। জটিলভাবে বিশ্লেষণ করার বদলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, পরিচিত কোনো পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়া কিংবা তাৎক্ষণিক স্বস্তি দেয়—এমন বিকল্প বেছে নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে।

কেন তখন ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি বাড়ে?
মানসিক ক্লান্তির একটি বড় প্রভাব হলো মনোযোগের সংকোচন। কোনো সমস্যার সব দিক বিবেচনা করার বদলে আমরা সবচেয়ে চোখে পড়া তথ্যটির ওপর বেশি নির্ভর করতে পারি। ধরা যাক, সারাদিন কাজের চাপের পর রাতে অনলাইনে কেনাকাটা করতে বসেছেন। তখন প্রয়োজন, বাজেট ও ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিয়ে যথেষ্ট ভাবার বদলে ‘এখনই কিনলে ছাড়’—এই একটি তথ্যই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হতে পারে। ফলে এমন কিছু কেনা হয়ে যেতে পারে, যা স্বাভাবিক অবস্থায় হয়তো কিনতেন না।

আরেকটি বিষয় হলো আত্মনিয়ন্ত্রণ কমে যাওয়া। ক্লান্ত অবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি লাভের চেয়ে তাৎক্ষণিক স্বস্তি বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। তাই স্বাস্থ্যকর খাবারের বদলে অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার, প্রয়োজনীয় কাজের বদলে সোশ্যাল মিডিয়ায় দীর্ঘ সময় কাটানো কিংবা কঠিন কথোপকথন এড়িয়ে যাওয়ার মতো আচরণ দেখা দিতে পারে।

Advertisements

আবেগ তখন কেন বেশি প্রভাব ফেলে?
মানসিক ক্লান্ত অবস্থায় আবেগ নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হতে পারে। সাধারণ অবস্থায় যে কথাটি শুনে আমরা শান্তভাবে উত্তর দিতে পারি, ক্লান্ত অবস্থায় সেটিই বিরক্তি বা রাগ তৈরি করতে পারে।
কারণ সিদ্ধান্ত নেওয়া কেবল যুক্তির বিষয় নয়; আবেগও এর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ঘুমের ঘাটতি, দীর্ঘস্থায়ী চাপ এবং মানসিক ক্লান্তি একসঙ্গে থাকলে মনোযোগ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও ঝুঁকি মূল্যায়নের ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। তাই রাত গভীরে কোনো সম্পর্ক নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া, রাগের মাথায় চাকরি ছাড়ার মেসেজ পাঠানো কিংবা উত্তেজিত অবস্থায় কাউকে কঠিন কথা বলে ফেলা—এসব ক্ষেত্রে পরে অনুশোচনা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

‘Decision fatigue’ কী?
দিনের মধ্যে বারবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর মানসিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে অনীহা বা ক্লান্তি তৈরি হওয়াকে সাধারণভাবে decision fatigue বলা হয়। তবে এটিকে এমনভাবে বোঝা ঠিক নয় যে মস্তিষ্কের কোনো নি
র্দিষ্ট ‘সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি’ একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে থাকে এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তে সেটি সরাসরি কমতে থাকে।
গবেষণায় বিষয়টি বরং জটিল। মানসিক পরিশ্রমের পর মানুষ কতটা ভালো সিদ্ধান্ত নেবে, তা নির্ভর করতে পারে কাজের ধরন, প্রেরণা, মানসিক চাপ, ঘুম, ব্যক্তিগত পার্থক্য এবং পরিস্থিতির ওপর। অর্থাৎ ক্লান্ত হলেই সবাই অবশ্যই ভুল সিদ্ধান্ত নেবে—এমন সরল সমীকরণ বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়। তবে দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক পরিশ্রমের পর মনোযোগ ধরে রাখা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং জটিল তথ্য বিশ্লেষণ করা কঠিন হতে পারে—এটি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

ঘুমের সঙ্গে সম্পর্ক কোথায়?
মানসিক ক্লান্তি ও ঘুমের ঘাটতি একে অপরকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মনোযোগ, স্মৃতি, প্রতিক্রিয়ার গতি এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হতে পারে। ফলে পরদিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে যদি কেউ কয়েক দিন ধরে কম ঘুমান, অতিরিক্ত কাজ করেন এবং নিয়মিত মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন, তাহলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। তাহলে কী করা যায়? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মানসিকভাবে ক্লান্ত অবস্থায় বড় সিদ্ধান্ত না নেওয়া।

জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সম্ভব হলে এমন সময়ে নেওয়া ভালো, যখন আপনি তুলনামূলকভাবে বিশ্রামপ্রাপ্ত এবং মনোযোগী। সিদ্ধান্তটি যদি জরুরি না হয়, কিছু সময় বিরতি নেওয়া যেতে পারে। একসঙ্গে অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়ার বদলে দৈনন্দিন ছোটখাটো বিষয় আগে থেকে ঠিক করে রাখাও মানসিক চাপ কমাতে পারে। যেমন সপ্তাহের খাবারের পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয় কেনাকাটার তালিকা বা গুরুত্বপূর্ণ কাজের অগ্রাধিকার আগে নির্ধারণ করা।

এর পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা, বিরতি নেওয়া এবং কাজের মাঝে কিছুটা মানসিক বিশ্রামও গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে মনে রাখা দরকার, ক্লান্ত অবস্থায় নেওয়া সিদ্ধান্ত সবসময় ভুল হয় না। কিন্তু মানসিক ক্লান্তি আমাদের মনোযোগ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও তথ্য বিশ্লেষণের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই জীবনের বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজেকে একটি সহজ প্রশ্ন করা যেতে পারে—‘আমি কি সত্যিই এই সিদ্ধান্তটি নিতে প্রস্তুত, নাকি আমি শুধু ক্লান্ত?’

অনেক সময় সিদ্ধান্ত বদলানোর প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন হয় শুধু কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে সিদ্ধান্তটিকে নতুন করে দেখার।

Advertisements
অশান্তমনমানসিক ক্লান্তিমানসিক শান্তি