তারেকের পর ক্যাথরিন: ‘আমরা’ হারিয়ে ‘আমি’ হয়ে ওঠার গল্প

কিছু সম্পর্ক শুধু দুজন মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সময়ের সঙ্গে তা হয়ে ওঠে একসঙ্গে স্বপ্ন দেখার, কাজ করার, লড়াই করার এবং জীবনকে নতুন করে গড়ে তোলার গল্প। তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদের সম্পর্কও ছিল তেমনই—যেখানে ভালোবাসার সঙ্গে মিশে ছিল চলচ্চিত্র, সৃজনশীলতা, বন্ধুত্ব এবং সহযাত্রার এক গভীর বন্ধন।

তারেক মাসুদ ছিলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এক অনন্য নির্মাতা। সিনেমাকে ঘিরে তার স্বপ্ন ছিল বিস্তৃত, আর সেই স্বপ্নের সবচেয়ে কাছের সহযাত্রীদের একজন ছিলেন ক্যাথরিন মাসুদ। জীবনসঙ্গী হিসেবে যেমন পাশে ছিলেন, তেমনি চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও ছিলেন তার সহযোগী ও সহকর্মী। তাদের দীর্ঘ পথচলায় ‘আমি’ আর ‘তুমি’ ধীরে ধীরে জায়গা করে নিয়েছিল ‘আমরা’ শব্দটিকে।
কিন্তু ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট এক সড়ক দুর্ঘটনায় হঠাৎ থেমে যায় সেই যৌথ পথচলা। ‘কাগজের ফুল’ চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের লোকেশন দেখে ঢাকায় ফেরার পথে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে দুর্ঘটনায় নিহত হন তারেক মাসুদ ও চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীর। সেই দিন শুধু বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনই হারায় একজন গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতাকে নয়, ক্যাথরিন হারান তার জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ ও দীর্ঘদিনের সহযাত্রীকে।
যেখান থেকে শুরু
১৯৮৭ সালে তারেক মাসুদের সঙ্গে প্রথম পরিচয় ক্যাথরিনের। তখন তারেক নির্মাণ করছিলেন প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের জীবন ও দর্শন নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র ‘আদম সুরত’। সেই পরিচয়ই ক্যাথরিনকে নিয়ে যায় চলচ্চিত্রের এক নতুন জগতে।
চলচ্চিত্রের প্রতি তারেকের গভীর ভালোবাসা ধীরে ধীরে ক্যাথরিনের জীবনেও জায়গা করে নেয়। তাদের সম্পর্ক শুধু ব্যক্তিগত ভালোবাসায় থেমে থাকেনি; বরং সৃজনশীলতার জায়গাতেও তারা হয়ে উঠেছিলেন একে অপরের পরিপূরক।
ক্যাথরিনের স্মৃতিতে সেই সময়ের কথা এখনও বিশেষ হয়ে আছে। তার ভাষায়, সিনেমার সেই ‘বিশৃঙ্খল এবং সুন্দর’ দুনিয়ায় প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি যেন একইসঙ্গে তারেক ও সিনেমার প্রেমে পড়েছিলেন।
এরপর তাদের জীবনের সঙ্গে চলচ্চিত্রের সম্পর্ক আরও গভীর হয়। একসঙ্গে তারা নির্মাণ করেন ‘মুক্তির গান’, ‘মাটির ময়না’, ‘অন্তর্যাত্রা’, ‘রানওয়ে’র মতো গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র। প্রতিটি সিনেমার পেছনে ছিল তাদের সম্মিলিত শ্রম, ভাবনা, স্বপ্ন ও ভালোবাসা।
ক্যাথরিন একসময় বলেছিলেন, তাদের তৈরি সিনেমাগুলো ছিল তাদের সন্তানের মতো। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যত্ন নিয়ে তৈরি করে সেগুলোকে নিজেদের মতো করে দাঁড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিতেন তারা। এই কথার মধ্যেই বোঝা যায়, চলচ্চিত্র তাদের কাছে কেবল একটি পেশা ছিল না; বরং ছিল তাদের যৌথ জীবনেরই একটি অংশ।
‘আমরা’ থেকে ‘আমি’
একটি সম্পর্কের সবচেয়ে গভীর জায়গাগুলো বোঝা যায় অনেক সময় ছোট্ট একটি শব্দে। তারেক ও ক্যাথরিনের জীবনে সেই শব্দটি ছিল—‘আমরা’।

দুজন একসঙ্গে পথ চলেছেন, কাজ করেছেন, স্বপ্ন দেখেছেন, প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন। তাদের ব্যক্তিগত জীবন ও পেশাগত জীবন যেন পাশাপাশি এগিয়েছে। তাই তারেকের আকস্মিক মৃত্যু শুধু একজন প্রিয় মানুষকে হারানোর ঘটনা ছিল না; এটি ক্যাথরিনের পরিচিত জীবনব্যবস্থাকেও আমূল বদলে দেয়।
যে জীবনে দীর্ঘদিন ‘আমরা’ ছিল, সেখানে হঠাৎ করেই এসে দাঁড়ায় ‘আমি’।
ক্যাথরিনের ভাষায়, তারা একসঙ্গে বহু পথ পাড়ি দিয়েছেন, অনেক যুদ্ধ মোকাবিলা করেছেন। তারপর একদিন সেই ‘আমরা’ আর থাকল না। হয়ে গেল ‘আমি’। মাত্র একটি মানুষের চলে যাওয়া যে একটি জীবনের ভাষা, পরিচয় ও দৈনন্দিন বাস্তবতাকে এতটা বদলে দিতে পারে, তার অভিজ্ঞতা যেন তারই এক নিঃশব্দ দলিল।
হারানো যায় না কিছু বোঝাপড়া
জীবনসঙ্গী হারানোর বেদনার পাশাপাশি ক্যাথরিন হারিয়েছিলেন তার সবচেয়ে কাছের সৃজনশীল সহকর্মীকেও। তারেকের সঙ্গে যে বিশেষ কাজের বোঝাপড়া তৈরি হয়েছিল, সেটি ছিল তাঁদের দীর্ঘ সহযাত্রার অন্যতম শক্তি।
একসঙ্গে কাজ করতে করতে তারা একে অপরের ভাবনা, পছন্দ, দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃষ্টিশীল ভাষা বুঝে নিয়েছিলেন। ফলে তারেকের চলে যাওয়ার পর অন্য কারও সঙ্গে কাজ করলেও সেই একই ‘ওয়ার্ক-কেমিস্ট্রি’ আর ফিরে পাননি ক্যাথরিন।
এ এক ধরনের শূন্যতা, যার পরিমাপ করা যায় না। কারণ এটি শুধু একজন সহকর্মীকে হারানোর শূন্যতা নয়; হারিয়ে যাওয়া একজন এমন মানুষকে, যার সঙ্গে কথা না বলেও অনেক কথা বোঝা যেত।
সন্তানের কাছে বাবাকে বাঁচিয়ে রাখা
তারেক মাসুদের স্মৃতি অবশ্য শুধু ক্যাথরিনের ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাদের ছেলে নিষাদের কাছেও বাবার উপস্থিতিকে জীবন্ত রাখার দায়িত্ব নিজের মধ্যে ধারণ করেছেন ক্যাথরিন।
একজন মা হিসেবে তার আকাঙ্ক্ষা—নিষাদ যেন তার বাবাকে শুধু পুরোনো ছবি, চলচ্চিত্র কিংবা অন্যের মুখে শোনা গল্পের একজন মানুষ হিসেবে না চেনে। বরং বড় হয়ে যেন বাবার মানুষ হিসেবে পরিচয়, তার ভালোবাসা, মূল্যবোধ এবং সৃষ্টিশীলতার ব্যাপ্তি বুঝতে পারে।
ক্যাথরিন চান, নিষাদ সবসময় অনুভব করুক তার বাবা তাকে কতটা ভালোবাসতেন এবং মানুষ হিসেবে তারেক মাসুদ কতটা বড় মাপের ছিলেন।
এই চাওয়ার মধ্যে একদিকে যেমন মায়ের ভালোবাসা, অন্যদিকে তেমনি রয়েছে একজন জীবনসঙ্গীর স্মৃতি ধরে রাখার গভীর দায়বোধ।
তারেক নেই, ‘আমরা’ও কি নেই?
সময় অনেক কিছু বদলে দেয়। মানুষ চলে যায়, জীবন নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেয়। কিন্তু কিছু সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে মুছে যায় না; বরং অন্য এক রূপে থেকে যায়।

তারেক মাসুদ আজ শারীরিকভাবে নেই। তার সঙ্গে ক্যাথরিনের সেই আগের যৌথ জীবনও নেই। তবু তাদের তৈরি চলচ্চিত্র, তাদের কাজ, তাদের স্বপ্ন এবং তাদের রেখে যাওয়া স্মৃতির ভেতর সেই ‘আমরা’ এখনও বেঁচে আছে।
একজন নারী হিসেবে ক্যাথরিনের পথচলাও তাই কেবল একজন প্রখ্যাত নির্মাতার স্ত্রী হিসেবে দেখার নয়। তিনি ছিলেন একজন সহযাত্রী, সহকর্মী, সৃষ্টিশীল অংশীদার এবং একজন মা—যিনি ব্যক্তিগত শোককে সঙ্গে নিয়েও স্মৃতি ও সৃষ্টির ধারাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন।
তারেকের চলে যাওয়ার ১৫ বছর পরও তার জীবনে হয়তো ‘আমরা’ শব্দটি আগের মতো নেই। কিন্তু তাদের যৌথ স্বপ্নের ভেতর, চলচ্চিত্রের ফ্রেমে এবং সন্তানের স্মৃতিতে সেই ‘আমরা’ এখনও অমলিন।
কারণ কিছু মানুষ চলে গেলেও সম্পর্কের গল্প শেষ হয় না। কখনও তা বদলে যায় স্মৃতিতে, কখনও সৃষ্টিতে, আবার কখনও একজন মানুষের নীরব অথচ দৃঢ় পথচলায়।



