বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬
বিশ্লেষণ

বাংলাদেশে একচেটিয়া স্তন্যপানের হার নেমেছে ৫৬.৬ শতাংশে

IMG_3369

বাংলাদেশে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের একচেটিয়া বুকের দুধ খাওয়ানোর হার কমে ২০২৫ সালে ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে, যা ২০১৯ সালে ছিল ৬২ দশমিক ৬ শতাংশ। একই সময়ে জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর হারও ৪৬ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে। বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫-এর তথ্যের বরাত দিয়ে মঙ্গলবার এক যৌথ বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফ বাংলাদেশ।

সংস্থাগুলো বলেছে, এই পরিসংখ্যান মায়েদের ও পরিবারের জন্য বুকের দুধ খাওয়ানোর সহায়তা আরও জোরদার করার জরুরি প্রয়োজন তুলে ধরছে। বিশ্ব বুকের দুধ খাওয়ানো সপ্তাহ ২০২৬ শেষ হলেও এ বিষয়ে ধারাবাহিক উদ্যোগ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তারা।

ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফের মতে, শিশুর জীবনের প্রথম ছয় মাস শুধু বুকের দুধ খাওয়ালে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া যায়। পাশাপাশি সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, শারীরিক বৃদ্ধি এবং মস্তিষ্কের বিকাশেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মায়েদের জন্যও বুকের দুধ খাওয়ানোর রয়েছে স্বাস্থ্যগত উপকার। এতে স্তন ও ডিম্বাশয়ের ক্যানসার এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের মতো রোগের ঝুঁকি কমতে পারে।

তবে গর্ভাবস্থা, সন্তান জন্মদান এবং প্রসব-পরবর্তী সময়ে অনেক মা প্রয়োজনীয় পরামর্শ, উৎসাহ ও ব্যবহারিক সহায়তা পান না বলে জানিয়েছে সংস্থা দুটি। কর্মজীবী মায়েদের জন্য সমস্যাটি আরও জটিল হয়ে ওঠে। পর্যাপ্ত মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা, ছুটি কিংবা কর্মস্থলে বুকের দুধ খাওয়ানোর উপযোগী পরিবেশ না থাকায় কাজে ফেরার পর তাদের নানা বাধার মুখে পড়তে হয়।

Advertisements

এ ছাড়া বুকের দুধের বিকল্প পণ্যের অনুপযুক্ত বিপণন, বিশেষ করে ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণাও মায়েদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে বলে সতর্ক করেছে ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফ। জরুরি ও মানবিক সংকটের পরিস্থিতিতে এসব সমস্যা আরও তীব্র হতে পারে।

এ বছরের বিশ্ব বুকের দুধ খাওয়ানো সপ্তাহের প্রতিপাদ্য ছিল ‘Breastfeeding for a Sustainable Start in Life: Strengthen What Works’। এর মাধ্যমে ইতিমধ্যে কার্যকর প্রমাণিত উদ্যোগগুলো আরও বিস্তৃত ও দীর্ঘস্থায়ী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বুকের দুধ খাওয়ানোর হার বাড়াতে শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী, কমিউনিটি পর্যায়ে সহায়তা এবং সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে বেবি-ফ্রেন্ডলি হাসপাতাল উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থা দুটি।

কর্মজীবী মায়েদের জন্য বেতনসহ ছুটি, কর্মস্থলে বুকের দুধ খাওয়ানোর বিরতি এবং এ উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বুকের দুধের বিকল্প পণ্যের বিপণনসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক নীতিমালা কঠোরভাবে কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছে ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফ। ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুপযুক্ত বিপণন ঠেকাতেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতেও বুকের দুধ খাওয়ানোর সহায়তা যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থা দুটি, যাতে ঝুঁকিতে থাকা মায়েরা প্রয়োজনীয় সহায়তা পান।

ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফ বলেছে, বুকের দুধ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে বিনিয়োগের অর্থনৈতিক সুফলও রয়েছে। তাদের হিসাবে, বুকের দুধ খাওয়ানোর পেছনে প্রতি এক ডলার বিনিয়োগে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমা, শিশুদের জ্ঞানীয় বিকাশ, শিক্ষাগত অর্জন এবং ভবিষ্যৎ আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রায় ৫৯ ডলারের অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যেতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো সমাধানের চেয়ে ইতিমধ্যে কার্যকর প্রমাণিত উদ্যোগগুলো বড় পরিসরে বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখাই বেশি জরুরি বলে মনে করছে সংস্থা দুটি। একই সঙ্গে অগ্রগতি পরিমাপ ও কার্যকর নীতি নির্ধারণের জন্য তথ্য সংগ্রহ, পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে তারা।

বুকের দুধ খাওয়ানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে সরকার, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, স্বাস্থ্যকর্মী, নিয়োগকর্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফ বাংলাদেশ। প্রতিটি স্বাস্থ্যকর্মীর এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা নিশ্চিত করা এবং বেবি-ফ্রেন্ডলি হাসপাতাল উদ্যোগে জবাবদিহি ও কমিউনিটির অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে তারা।

সংস্থা দুটি বলেছে, প্রতিটি শিশুর জীবনের শুরুটা সর্বোচ্চ মানের হওয়ার অধিকার রয়েছে এবং প্রতিটি মায়ের সফলভাবে বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।

Advertisements
দুধশিশু