বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬
জীবনযাপন

নারীর চেয়ে ৩ কোটি বেশি পুরুষ, চীনে বিয়ের নামে চলছে কোটি টাকার প্রতারণা

119446-1

চীনে দীর্ঘদিনের লিঙ্গবৈষম্য ও জনসংখ্যাগত সংকটকে কাজে লাগিয়ে কিছু ঘটকালি সংস্থা প্রতারণার ফাঁদ পেতেছে। বিয়ের আশায় এসব সংস্থার দ্বারস্থ হয়ে বিপুল অর্থ ও সম্পদ হারাচ্ছেন একাকী পুরুষেরা। দ্রুত বিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে লাখ লাখ ইউয়ান হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বিবিসির এক প্রতিবেদনে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

বিশেষ করে গুইঝৌ প্রদেশের গুইয়াং শহরকে কেন্দ্র করে ‘ফ্ল্যাশ ম্যারেজ’ বা দ্রুত বিয়ে দেওয়ার নামে প্রতারণার ঘটনা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে বিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পাত্রদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ, মূল্যবান সামগ্রী ও বিভিন্ন ধরনের পণ দাবি করছে কিছু ঘটকালি এজেন্সি। পরে দেখা যাচ্ছে, কথিত পাত্রী সম্পর্কে দেওয়া তথ্যের বড় একটি অংশই মিথ্যা।

চীনে কয়েক দশক ধরে চলা এক সন্তানের নীতি এবং ছেলেসন্তানের প্রতি সামাজিক পক্ষপাতের কারণে দেশটির জনসংখ্যায় নারী-পুরুষের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। বর্তমানে দেশটিতে নারীর তুলনায় পুরুষের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি বেশি। এর ফলে বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চল ও ছোট শহরগুলোতে ৩০ বছরের বেশি বয়সী অনেক পুরুষের জন্য জীবনসঙ্গী খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে।

এই সংকটকেই নিজেদের ব্যবসার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে কিছু ঘটকালি সংস্থা। গুইয়াং শহরের কয়েকটি এজেন্সি তিন দিনের মধ্যেই বিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পাত্রদের আকৃষ্ট করছে। বিয়ের জন্য উপযুক্ত পাত্রী খুঁজে দেওয়ার পাশাপাশি এসব সংস্থা পাত্রদের কাছে পাত্রী সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য যাচাই করে দেওয়ার আশ্বাসও দেয়। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে সেই তথ্য যাচাই করা হয় না, কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন রাখা হয়।

Advertisements

চার-পাঁচ লাখ ইউয়ান দিয়েও প্রতারণার শিকার

প্রতারণার শিকার ৩৭ বছর বয়সী ওয়াং ঝুয়াং জানান, একটি ঘটকালি সংস্থা তাকে পাত্রী সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিল। সেই বিশ্বাসে তিনি সংস্থাটিকে চার থেকে পাঁচ লাখ ইউয়ান অর্থ দেন।

বিয়ের কয়েক মাস পর ওয়াং জানতে পারেন, তার স্ত্রী সম্পর্কে আগে যে তথ্য দেওয়া হয়েছিল, তার সঙ্গে বাস্তবতার বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। ওই নারী এর আগে একাধিকবার বিয়ে করেছিলেন এবং তার তিন সন্তান রয়েছে। শুধু তাই নয়, তিনি গুরুতর ঋণের মধ্যে ছিলেন এবং যৌনব্যাধিতেও আক্রান্ত ছিলেন বলে পরে জানতে পারেন ওয়াং।

প্রতারণার বিষয়টি সামনে আসার পর ওয়াং যে ঘটকালি সংস্থার মাধ্যমে বিয়ে করেছিলেন, সেটিও দ্রুত কার্যালয় বন্ধ করে দেয়। এরপর সংশ্লিষ্টরা গা-ঢাকা দেন। ফলে বিপুল অর্থ হারানোর পাশাপাশি বিয়ের সম্পর্ক নিয়েও চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন তিনি।

ছেলের বিয়েতে পাঁচ লাখ ইউয়ান খরচ, সাত দিনেই কনে উধাও

আরেক ভুক্তভোগী ৫৯ বছর বয়সী শু রুলিন। ছেলের জন্য জীবনসঙ্গী খুঁজতে গিয়ে তিনিও একটি ঘটকালি সংস্থার দ্বারস্থ হন। ছেলের বিয়ের জন্য প্রায় পাঁচ লাখ ইউয়ান খরচ করেন তিনি।

কিন্তু বিয়ের মাত্র সাত দিন পরই শু রুলিন জানতে পারেন, তার ছেলের নববিবাহিতা স্ত্রী বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছেন। পরে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হলে তদন্ত শুরু হয়। এ ঘটনায় পুলিশ ওই নারী এবং ঘটকালি সংস্থার মালিকদের গ্রেপ্তার করে।

এসব ঘটনা চীনে বিয়েকে কেন্দ্র করে নতুন ধরনের প্রতারণার চিত্র সামনে এনেছে। বিশেষ করে যেসব পুরুষ দীর্ঘদিন ধরে জীবনসঙ্গী খুঁজে পাচ্ছেন না, তারা দ্রুত বিয়ের আশায় সহজেই এসব সংস্থার প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।

বাড়ছে আইনি ব্যবস্থা

চীনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ঘটকালি ও বিয়েসংক্রান্ত অপরাধের ঘটনায় ১ হাজার ৫৪৬ জনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সম্প্রতি চীনের পাঁচটি সরকারি সংস্থা যৌথভাবে দেশব্যাপী অভিযান শুরু করেছে। ঘটকালি সংস্থাগুলোর কার্যক্রম, তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি এবং বিয়ের নামে অর্থ লেনদেনের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রতারণার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

তবে প্রতারিত ব্যক্তিদের জন্য অর্থ ফেরত পাওয়া এবং অপরাধ প্রমাণ করা সহজ হচ্ছে না। নাসচিংয়ের আইনজীবী ফ্যান বিংহে জানান, বিয়ে ও পারিবারিক সম্পর্কসংক্রান্ত আইনি জটিলতার পাশাপাশি প্রতারকরা কৌশলগতভাবে নিজেদের দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ফলে ভুক্তভোগীদের পক্ষে তাদের অর্থ ফেরত পাওয়া এবং আদালতে প্রতারণার অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

ন্যায়বিচারের আশায় শহরে পড়ে আছেন অনেকে

বিয়ের আশায় সর্বস্ব হারানো অনেক নিঃসঙ্গ পুরুষ এখন ন্যায়বিচারের আশায় গুইয়াং শহরে অবস্থান করছেন। কেউ কেউ প্রতারকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছেন, আবার অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে অন্যদের সতর্ক করছেন।

চীনে নারী-পুরুষের সংখ্যাগত ভারসাম্যহীনতা যত বাড়ছে, ততই জীবনসঙ্গী খুঁজতে গিয়ে পুরুষদের ওপর সামাজিক ও আর্থিক চাপও বাড়ছে। এই বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু ঘটকালি সংস্থা দ্রুত বিয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে পুরুষদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আদায় করছে।

ফলে ‘ফ্ল্যাশ ম্যারেজ’ প্রতারণা এখন শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভোগের বিষয় নয়; বরং দেশটির দীর্ঘদিনের জনসংখ্যাগত ও লিঙ্গসংকটের সুযোগ নিয়ে গড়ে ওঠা একটি বড় সামাজিক ও আইনি সমস্যায় পরিণত হচ্ছে।

Advertisements
চীননারীপ্রতারণাবিয়ে