বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬
জীবনযাপন

তেল-দুধ-চিনিতে মিলছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, বছরে হাজারো কণা যাচ্ছে শরীরে: গবেষণা

IMG_3204

দুধ, চিনি ও সয়াবিন তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন গবেষণা। গবেষকদের দাবি, এসব পণ্যের মাধ্যমে একজন মানুষ নিয়মিত হাজার হাজার প্লাস্টিক কণা শরীরে গ্রহণ করছেন। তবে এসব কণা মানবদেহে দীর্ঘমেয়াদে ঠিক কী ধরনের ক্ষতি করে, সে বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

গবেষণা অনুযায়ী, কেবল সয়াবিন তেলের মাধ্যমেই একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন গড়ে ১৭ দশমিক ৬৫টি এবং বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করেন। শিশুদের ক্ষেত্রে এ সংখ্যা আরও বেশি। তাদের শরীরে প্রতিদিন গড়ে ৭৭ দশমিক ২১টি, অর্থাৎ বছরে প্রায় ২৮ হাজার ১৮০টি কণা প্রবেশ করতে পারে।

গবেষকরা বলছেন, খাবারে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের প্রধান তিনটি উৎস হলো প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট ও বস্তা; প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত মেশিন, পাইপ ও কনভেয়ার বেল্টের ক্ষয়; এবং পরিবেশে ছড়িয়ে থাকা প্লাস্টিক বর্জ্য, যা ভেঙে মাটি, পানি ও বাতাসের মাধ্যমে খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে।

বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় আট হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়, যার অর্ধেকেরও বেশি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয় না। গবেষকদের মতে, এসব বর্জ্যই ধীরে ধীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়ে খাদ্যে মিশছে।

Advertisements

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা কাঁচা ও প্রক্রিয়াজাত দুধ পরীক্ষা করে দেখা গেছে, প্রতি ১০ মিলিলিটার প্রসেসড দুধে গড়ে ১৫৬ দশমিক ০৬টি এবং কাঁচা দুধে ৯৩ দশমিক ৩৯টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে। গবেষকদের মতে, দুধ সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং প্লাস্টিক বোতল বা প্যাকেটে সংরক্ষণের বিভিন্ন ধাপে এসব কণা মিশছে। দুধে টেফলন (পিটিএফই), পিইটি, নাইলন-৬ ও পিভিসিসহ বিভিন্ন ধরনের পলিমার শনাক্ত হয়েছে।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক জার্নাল জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালিসিস-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় ঢাকার বিভিন্ন বাজার থেকে সংগ্রহ করা খোলা ও প্যাকেটজাত চিনি পরীক্ষা করে দেখা যায়, প্রতি কেজি ব্রান্ডেড চিনিতে গড়ে ৩২২টি এবং খোলা চিনিতে প্রায় ৪০৩টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে। গবেষকদের মতে, প্লাস্টিকের বস্তা, প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্রপাতি এবং পরিবহন ও সংরক্ষণের সময় পরিবেশগত দূষণ এর প্রধান কারণ।

একই জার্নালে প্রকাশিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের যৌথ গবেষণায় ৬০টি সয়াবিন তেলের নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, খোলা তেলে প্রতি লিটারে প্রায় ৪৫ হাজার থেকে ৭০ হাজার এবং বোতলজাত তেলে ৪৪ হাজার থেকে ৫৪ হাজার পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে। গবেষকদের মতে, শিল্পাঞ্চলের দূষণ, প্লাস্টিক কারখানার প্রভাব এবং খোলা তেল সংরক্ষণের পাত্র বারবার ব্যবহার করার কারণে দূষণের মাত্রা বেড়েছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ১৩০ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করতে পারে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, প্রদাহ এবং কোষের ক্ষতির মতো ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে এখনো নির্দিষ্টভাবে কত পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য নেই।

বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণায় মানবদেহের রক্তনালী, হাড়, পেশি এবং এমনকি মস্তিষ্কেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। তবে এসব কণার সঙ্গে বিভিন্ন রোগের সরাসরি সম্পর্ক এখনো নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি।

এদিকে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) জানিয়েছে, পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক ও আইনগত যাচাই ছাড়া কোনো ব্রান্ড বা পণ্যকে অনিরাপদ বলা উচিত নয়। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, টুথপেস্টসহ বিভিন্ন পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে গবেষণার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন হলে বাজার থেকে নমুনা নিয়ে পুনরায় পরীক্ষা করা হবে। মান পূরণে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরকারও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, এটি শুধু একটি পণ্যের সমস্যা নয়, বরং বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই এ বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

Advertisements
চিনিতেলদুধমাইক্রোপ্লাস্টিকস্বাস্থ্য