প্রিয়জনকে শান্ত করার কৌশল

হঠাৎ বুক ধড়ফড় করা, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, মাথা ঘুরে যাওয়া কিংবা কোনো কারণ ছাড়াই তীব্র মৃত্যুভয়- এমন অভিজ্ঞতা প্যানিক অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে মুহূর্তটি অত্যন্ত ভয়াবহ মনে হলেও সাধারণত প্যানিক অ্যাটাক কয়েক মিনিট থেকে আধা ঘণ্টার মধ্যে কমে আসে এবং নিজে থেকে প্রাণঘাতী নয়। তবে কাছের কাউকে এ অবস্থায় দেখলে কীভাবে তাকে সামলাতে হবে, তা না জানলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
মনোবিশেষজ্ঞদের মতে, প্যানিক অ্যাটাকের সময় আক্রান্ত ব্যক্তিকে জোর করে শান্ত করার চেষ্টা, অযথা প্রশ্ন করা কিংবা তার ভয়কে গুরুত্ব না দেওয়া উল্টো উদ্বেগ বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই এমন পরিস্থিতিতে প্রিয়জনের পাশে থেকে তাকে নিরাপত্তার অনুভূতি দেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমে নিজেকে শান্ত রাখুন
প্যানিক অ্যাটাকের সময় আক্রান্ত ব্যক্তি চারপাশের পরিবেশকে অনিরাপদ মনে করতে পারেন। তাই পাশে থাকা মানুষটি নিজেই যদি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন, তাহলে তার ভয় আরও বেড়ে যেতে পারে। এ সময় প্রথমে নিজের শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক করার চেষ্টা করুন। নিচু ও শান্ত স্বরে কথা বলুন এবং ধীরে ধীরে নড়াচড়া করুন। আপনার স্থির আচরণ আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যেও নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
নীরবে পাশে থাকুন
সব সময় কথা বলে আক্রান্ত ব্যক্তিকে শান্ত করতে হবে—এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে পাশে চুপচাপ বসে থাকাটাই বেশি কার্যকর। তিনি যদি কিছুক্ষণ একা থাকতে চান, সেই ইচ্ছাকেও সম্মান করতে হবে। তবে পুরোপুরি দূরে চলে না গিয়ে বলতে পারেন, ‘আমি কাছেই আছি।’ এতে তিনি বুঝতে পারবেন, প্রয়োজন হলে সাহায্যের জন্য কাউকে পাশে পাবেন।
স্পর্শ করার আগে অনুমতি নিন
আতঙ্কিত কাউকে শান্ত করতে অনেকে হঠাৎ জড়িয়ে ধরেন কিংবা হাত ধরে ফেলেন। কিন্তু তীব্র আতঙ্কের সময় অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ কারও কারও কাছে আরও অস্বস্তিকর বা হুমকির মতো মনে হতে পারে। তাই হাত ধরা, কাঁধে হাত রাখা বা জড়িয়ে ধরার আগে জিজ্ঞাসা করুন, তিনি এতে স্বস্তি বোধ করবেন কি না।
ছোট ও আশ্বস্ত করার মতো কথা বলুন
প্যানিক অ্যাটাকের সময় দীর্ঘ আলোচনা কিংবা একের পর এক প্রশ্ন আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। ‘কী হয়েছে?’ কিংবা ‘এমন কেন হচ্ছে?’—এর বদলে ছোট ও সহজ বাক্যে আশ্বস্ত করা ভালো। যেমন বলতে পারেন, ‘আমি তোমার পাশে আছি’, ‘তুমি নিরাপদে আছ’ কিংবা ‘এটা ধীরে ধীরে কমে যাবে।’ তার অনুভূতিকে ছোট না করে শান্তভাবে পাশে থাকাই গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের শ্বাস-প্রশ্বাস দিয়ে উদাহরণ তৈরি করুন
আতঙ্কের সময় শ্বাস দ্রুত ও অগভীর হয়ে যেতে পারে। ফলে মাথা ঘোরা বা অস্বস্তি আরও বাড়তে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে বারবার ‘গভীর শ্বাস নাও’ বলার পরিবর্তে পাশে থেকে নিজেই ধীরে ও স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়ার উদাহরণ তৈরি করা যেতে পারে।
তবে জোর করে নির্দিষ্ট ছন্দে শ্বাস নিতে বাধ্য করা উচিত নয়। তিনি স্বস্তি বোধ করলে ধীরে শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার দিকে মনোযোগ দিতে উৎসাহিত করা যেতে পারে।
ব্যবহার করতে পারেন ৫-৪-৩-২-১ গ্রাউন্ডিং
তীব্র আতঙ্কের সময় মন ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় বা আশঙ্কায় আটকে যেতে পারে। তখন মনোযোগকে বর্তমান মুহূর্তে ফিরিয়ে আনতে ‘৫-৪-৩-২-১ গ্রাউন্ডিং’ পদ্ধতি কাজে লাগতে পারে।
আক্রান্ত ব্যক্তিকে ধীরে ধীরে বলতে উৎসাহিত করুন—
৫টি জিনিস: যা তিনি দেখতে পাচ্ছেন
৪টি জিনিস: যা স্পর্শ করতে পারছেন
৩টি শব্দ: যা তিনি শুনতে পাচ্ছেন
২টি গন্ধ: যা অনুভব করতে পারছেন
১টি স্বাদ: যা মুখে অনুভব করছেন
তবে তিনি এতে অস্বস্তি বোধ করলে জোর করা যাবে না।
কোলাহল থেকে দূরে রাখুন
জনাকীর্ণ রাস্তা, বাস, শপিং মল কিংবা অতিরিক্ত আলো-শব্দের পরিবেশে প্যানিক অ্যাটাক হলে শান্ত ও নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া যেতে পারে। তবে তাকে টেনে-হিঁচড়ে সরিয়ে নেওয়া ঠিক নয়। বরং নরম স্বরে জিজ্ঞাসা করুন, তিনি শান্ত কোনো জায়গায় যেতে চান কি না।
কখন জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন?
প্যানিক অ্যাটাক সাধারণত গুরুতর শারীরিক বিপদের কারণ হয় না। কিন্তু বুকের তীব্র ব্যথা, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্ট, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, শরীরের কোনো অংশ অবশ হয়ে আসা কিংবা অন্য কোনো গুরুতর শারীরিক উপসর্গ দেখা দিলে সেটিকে শুধু প্যানিক অ্যাটাক ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে আগে থেকে হৃদরোগ বা অন্য কোনো গুরুতর শারীরিক সমস্যা থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। উপসর্গ গুরুতর হলে স্থানীয় জরুরি চিকিৎসাসেবা বা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যোগাযোগ করতে হবে।
যা করবেন না
প্যানিক অ্যাটাকের সময় ‘শান্ত হও’, ‘এত ভয় পাওয়ার কী আছে’, ‘সবই তোমার মনের ভুল’ কিংবা ‘নাটক করছ’—এ ধরনের কথা বলা উচিত নয়। এতে আক্রান্ত ব্যক্তি আরও অসহায়, লজ্জিত বা বিব্রত বোধ করতে পারেন। এ সময় পাশে বসে মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকাও ঠিক নয়। আপনার মনোযোগ ও উপস্থিতি তাকে নিরাপত্তার অনুভূতি দিতে পারে।
অ্যাটাকের পরও প্রয়োজন যত্ন
প্যানিক অ্যাটাক কমে যাওয়ার পরও আক্রান্ত ব্যক্তি ক্লান্ত, দুর্বল বা মানসিকভাবে বিধ্বস্ত বোধ করতে পারেন। তাই সঙ্গে সঙ্গে অনেক প্রশ্ন না করে তাকে কিছুটা সময় বিশ্রামের সুযোগ দিন। প্রয়োজন হলে পানি পান করতে দিন এবং তিনি কথা বলতে চাইলে মনোযোগ দিয়ে শুনুন।
তবে বারবার প্যানিক অ্যাটাক হলে বিষয়টি উপেক্ষা করা উচিত নয়। কারণের সন্ধান ও ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি সামলানোর জন্য মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উপকারী হতে পারে।



