ভর্তি পরীক্ষা নয়, লটারিতেই প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী বাছাই করবে স্কুলগুলো

আগামী শিক্ষাবর্ষ (২০২৭) থেকে স্কুলের প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অভিভাবকদের উদ্বেগ, শিক্ষাবিদদের আপত্তি এবং ছোট শিশুদের ওপর বাড়তি চাপ ও কোচিংনির্ভরতা বৃদ্ধির আশঙ্কার কারণে আগের নিয়মেই লটারির মাধ্যমে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, প্রথম শ্রেণিতে কোনো ধরনের ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে না। আগের মতোই লটারির মাধ্যমেই শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হবে। তবে দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তির ক্ষেত্রে সীমিত পরিসরে বা নামমাত্র ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

ওই কর্মকর্তা বলেন, প্রথম শ্রেণির ভর্তির ক্ষেত্রে লটারির পদ্ধতিই বহাল থাকবে। অন্য শ্রেণির ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়ে পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
ভর্তি পরীক্ষা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়ে পিছু হটল সরকার
এর আগে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত লটারির মাধ্যমে ভর্তি ব্যবস্থা বাতিল করে পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তির সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
গত ১৬ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সভাকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছিলেন, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে সব শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা চালু করা হবে। একই দিন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতেও বলা হয়েছিল, অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন ভর্তি পদ্ধতি চালু করা হবে এবং প্রচলিত লটারি ব্যবস্থা বাতিল করা হবে।
সেই সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন, আগামী বছর থেকে সব শ্রেণির ভর্তিতে পরীক্ষা নেওয়া হবে। তবে পরীক্ষাটি জটিল হবে না, বরং সাধারণ একটি পরীক্ষার মাধ্যমেই ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
তবে পরবর্তীতে অভিভাবক, শিক্ষাবিদসহ বিভিন্ন মহলের উদ্বেগ ও আপত্তির পর প্রথম শ্রেণির ভর্তিতে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে লটারি পদ্ধতি বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কেন চালু হয়েছিল লটারি পদ্ধতি
এক সময় দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমেই শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হতো। তবে অল্প বয়সী শিশুদের ওপর অতিরিক্ত প্রতিযোগিতার চাপ, কোচিং নির্ভরতা বৃদ্ধি, প্রশ্ন ফাঁস ও ভর্তি প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগসহ বিভিন্ন কারণে ভর্তি পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়।
এসব বিষয় বিবেচনা করে ২০১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমে ভর্তি বাধ্যতামূলক করা হয়। পরবর্তীতে একই পদ্ধতি বেসরকারি বিদ্যালয়েও চালু করা হয়।
করোনাভাইরাস মহামারির সময় ২০২১ শিক্ষাবর্ষে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত সব শ্রেণির ভর্তিতেই লটারি পদ্ধতি চালু করা হয়। এরপর থেকে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের বিদ্যালয়ে এই পদ্ধতিই অনুসরণ করা হচ্ছিল।
শিশুদের ভর্তি পরীক্ষার বিরোধিতা করেছিলেন শিক্ষাবিদরা
প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা চালুর সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছিলেন দেশের অনেক শিক্ষাবিদ। তাদের মতে, এত অল্প বয়সে শিশুদের পরীক্ষার চাপের মধ্যে ফেললে তাদের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
শিক্ষাবিদদের একটি অংশ মনে করেন, ভর্তি পরীক্ষা চালু হলে আবারও কোচিং সংস্কৃতি জোরদার হবে। এতে আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের শিশুরা বাড়তি সুবিধা পাবে, অন্যদিকে পিছিয়ে পড়া পরিবারের শিশুরা প্রতিযোগিতায় বৈষম্যের শিকার হবে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, শিশুদের জন্য ভর্তি পরীক্ষা একটি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা। কারণ এ ধরনের পরীক্ষায় সাধারণত কোচিং বা প্রাইভেট পড়ার সুযোগ পাওয়া শিক্ষার্থীরাই এগিয়ে থাকে। এতে আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের শিশুরা বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন বলেন, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত কোনোভাবেই ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া উচিত নয়। তার মতে, ভর্তি পরীক্ষা চালু হলে কোচিং বাণিজ্য আবারও বাড়বে। ছোট শিশুদের পরীক্ষার ফলাফলের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হলে তাদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

লটারি পদ্ধতি বহালের সিদ্ধান্তকে স্বাগত অভিভাবকদের
প্রথম শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমে ভর্তি কার্যক্রম চালু রাখার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে অভিভাবক ঐক্য ফোরাম।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শুধু প্রথম শ্রেণি নয়, প্রাথমিক স্তরের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সব শ্রেণিতেই লটারির মাধ্যমে ভর্তি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উচিত।
সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. জিয়াউল কবির দুলু এবং সাধারণ সম্পাদক মো. সেলিম মিয়া সরকারের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান।
একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হবে এসএসসির ফলের ভিত্তিতে
এদিকে এবারও একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের কোনো ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে না। এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই একাদশ শ্রেণির ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আগের বছরের মতো এবারও কেন্দ্রীয়ভাবে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হবে। শিক্ষার্থীদের মেধাক্রম, পছন্দের তালিকা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কোটা বিবেচনা করে কলেজ নির্বাচন করা হবে।
সরকার পরিবর্তনের পর একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত আগের পদ্ধতিই বহাল রাখার উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পরপরই একাদশ শ্রেণির ভর্তি সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা ও সময়সূচি প্রকাশ করা হবে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান জানিয়েছেন, ফল প্রকাশের এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই একাদশ শ্রেণির ভর্তি কার্যক্রমের বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।



