বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬
জীবনযাপন

রঙিন প্যাকেট, লুকানো ঝুঁকি: সন্তানের প্রিয় খাবার কতটা নিরাপদ?

bd_54.1785570358

প্যাকেটের রঙিন মোড়ক, আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন আর মজার স্বাদের আড়ালে অনেক সময় লুকিয়ে থাকে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও ক্ষতিকর চর্বি। সচেতনতার অভাবে পরিবারের অজান্তেই এসব খাবার হয়ে উঠছে শিশুদের প্রতিদিনের সঙ্গী।

শিশুর মুখে হাসি দেখতে কে না চান? সন্তানের আবদার পূরণ করতে, তাকে খুশি রাখতে কিংবা ব্যস্ততার মধ্যে দ্রুত কিছু খাওয়ানোর জন্য অনেক অভিভাবকই হাতে তুলে দেন চিপসের প্যাকেট, চকোলেট, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, কোমল পানীয় কিংবা বিভিন্ন ধরনের প্যাকেটজাত খাবার। অনেক সময় এসব খাবারকে ‘ছোট্ট আনন্দ’ হিসেবেই দেখা হয়।

কিন্তু এই ছোট্ট আনন্দের পেছনে যে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি লুকিয়ে থাকতে পারে, তা অনেকেরই অজানা।

বছরের পর বছর ধরে স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিয়ে কাজ করা অনেক বিশেষজ্ঞও স্বীকার করেন—শুধু তথ্য জানলেই সব সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। বাজারের আকর্ষণীয় প্রচারণা, আধুনিক প্যাকেজিং এবং বড় ব্র্যান্ডের প্রতি আস্থার কারণে অনেক অভিভাবকই মনে করেন, পরিচিত প্রতিষ্ঠানের তৈরি খাবার মানেই নিরাপদ খাবার। অথচ বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন।

Advertisements

মোড়কের সামনে নেই পুরো সত্য

একটি খাবারের প্যাকেট হাতে নিলে সাধারণত আমরা দেখি ব্র্যান্ডের নাম, আকর্ষণীয় ছবি কিংবা স্বাদের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু সেই খাবারে কত পরিমাণ চিনি, লবণ বা স্যাচুরেটেড ফ্যাট রয়েছে—তা অনেক সময় সাধারণ ভোক্তার কাছে পরিষ্কার থাকে না।

এই তথ্যের ঘাটতিই তৈরি করে বড় ধরনের বৈষম্য। খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জানে তাদের পণ্যের প্রতিটি উপাদানের হিসাব, কিন্তু ভোক্তা অনেক সময় জানেন না তিনি নিজের বা সন্তানের শরীরে কী গ্রহণ করছেন।

ফলাফল—অজান্তেই তৈরি হচ্ছে এমন এক খাদ্যাভ্যাস, যা ভবিষ্যতে ডেকে আনতে পারে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি।

এক প্যাকেট চিপস, এক বোতল কোমল পানীয়ের অজানা হিসাব

গবেষণা ও জনস্বাস্থ্য তথ্য বলছে, অনেক প্যাকেটজাত খাবারে অতিরিক্ত পরিমাণে লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি থাকতে পারে। একটি ছোট প্যাকেট চিপসেও থাকতে পারে শরীরের জন্য প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি লবণ। আবার একটি কোমল পানীয়ের বোতলে লুকিয়ে থাকতে পারে কয়েক চামচ পরিমাণ চিনি।

সমস্যা হলো, এসব উপাদান সব সময় সাধারণ চোখে বোঝার সুযোগ থাকে না। ফলে শিশুরা আনন্দের সঙ্গে যে খাবার খাচ্ছে, সেটিই ধীরে ধীরে তাদের খাদ্যাভ্যাসের অংশ হয়ে যাচ্ছে।

অসংক্রামক রোগের নতুন চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশ এখন অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান চাপের মুখোমুখি। হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক ও স্থূলতার মতো সমস্যা এখন শুধু বয়স্কদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তরুণ, কিশোর এমনকি শিশুদের মধ্যেও এসব ঝুঁকি বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ঘরে তৈরি পুষ্টিকর খাবারের জায়গা দখল করছে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবার।

শিশুর স্থূলতাকে অনেক সময় শুধু শারীরিক গঠনের বিষয় হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এটি ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগসহ নানা জটিলতার পূর্বাভাস হতে পারে।

সমাধানের পথে সতর্কতামূলক লেবেল

এই পরিস্থিতিতে ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং বা এফওপিএল গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্যাকেটের সামনের অংশে সহজে বোঝা যায় এমন সতর্কতামূলক চিহ্ন থাকলে একজন ক্রেতা কয়েক সেকেন্ডেই বুঝতে পারবেন—কোনো খাবারে অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা ক্ষতিকর চর্বি রয়েছে কি না।

এটি শুধু ভোক্তাকে সচেতন করবে না, খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তাদের পণ্যের মান ও উপাদান পুনর্বিবেচনা করতে উৎসাহিত করবে।

বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সহজ ও স্পষ্ট খাদ্য সতর্কতা মানুষকে স্বাস্থ্যকর সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।

ভালোবাসার নামে ভুল সিদ্ধান্ত নয়

সন্তানের জন্য অভিভাবকের ভালোবাসার কোনো কমতি নেই। ভালো স্কুল, ভালো পোশাক, ভালো চিকিৎসা—সবকিছুর ব্যবস্থা করতে পরিবারগুলো চেষ্টা করে। কিন্তু প্রতিদিনের খাবারের বিষয়টি অনেক সময় অবহেলায় থেকে যায়।

একটি শিশুর হাতে তুলে দেওয়া খাবার শুধু তার আজকের আনন্দ নয়; এটি তার আগামী দিনের স্বাস্থ্যের সঙ্গেও জড়িত।

ব্যস্ততার কারণে সহজ পথ বেছে নেওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু খাবারের ক্ষেত্রে একটু সচেতনতা ভবিষ্যতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। শিশুকে শুধু ক্ষুধা মেটানোর জন্য নয়, সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য খাবার দিতে হবে।

প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ

স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে শুধু পরিবারের সচেতনতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নীতিগত উদ্যোগও। প্যাকেটজাত খাদ্যে বাধ্যতামূলক সতর্কতামূলক লেবেল, শিশুদের লক্ষ্য করে অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্যালয়ের আশপাশে স্বাস্থ্যকর খাবারের পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

একটি ছোট সতর্কতামূলক চিহ্ন হয়তো একদিনে পুরো খাদ্যসংস্কৃতি বদলে দেবে না। কিন্তু সেটি একজন অভিভাবককে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভাবতে শেখাতে পারে।

একজন মায়ের একটি সচেতন সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ। আর অসংখ্য পরিবারের সচেতনতা তৈরি করতে পারে একটি সুস্থ প্রজন্ম।

চকচকে মোড়কের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ঝুঁকি চেনার সময় এখনই।

Advertisements
খাবারপ্যাকেটসন্তান