মুভ অন করতে চাইছেন, তবু কেন কাজের ফাঁকে মনে পড়ে তার কথা?

অফিসে গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ করছেন। হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই তার কথা মনে পড়ে গেল। আবার মনোযোগ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন, কিন্তু কিছুক্ষণ পর একই ঘটনা। এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই হয়। বিশেষ করে সম্পর্কের বিচ্ছেদ, একতরফা ভালোবাসা বা প্রিয় কাউকে হারানোর পর এই অনুভূতি আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

অনেকে মনে করেন, কাজের মাঝেও বারবার কারও কথা মনে পড়া মানেই হয়তো তারা সামনে এগোতে পারছেন না। তবে মনোবিজ্ঞান বলছে, বিষয়টি সব সময় এতটা সরল নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া, যেখানে অতীতের আবেগ ও অভ্যাস ধীরে ধীরে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।
কেন কাজের মাঝেও তার কথা মনে পড়ে?
মস্তিষ্ক এখনো তাকে গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি হিসেবে ধরে রেখেছে
যে মানুষটির সঙ্গে দীর্ঘদিন সময় কেটেছে, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা হয়েছে কিংবা গভীর আবেগ জড়িয়ে ছিল, তাকে মস্তিষ্ক সহজে ভুলে যায় না। তাই কোনো পরিচিত গান, গন্ধ, জায়গা, সময় বা ছোট্ট কোনো ঘটনা মুহূর্তেই সেই স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলতে পারে।
চাপা পড়ে থাকা আবেগ মাঝেমধ্যে সামনে চলে আসে
অনেকে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করেন, যাতে পুরোনো স্মৃতি ফিরে না আসে। কিন্তু মস্তিষ্ক দীর্ঘ সময় ধরে আবেগকে পুরোপুরি চাপা দিয়ে রাখতে পারে না। কাজের ফাঁকে বা মন একটু ফাঁকা হলেই সেই অনুভূতিগুলো আবার সামনে চলে আসতে পারে।
মনোযোগ কমে যাওয়ার কারণ হতে পারে অসমাপ্ত আবেগ
শরীর হয়তো ডেস্কে বসে কাজ করছে, কিন্তু মনের একটি অংশ পড়ে আছে অতীতের কোনো কথোপকথন, স্মৃতি কিংবা “যদি এমন হতো” ধরনের ভাবনায়। ফলে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায় এবং কাজের গতি কমে যেতে পারে।
মস্তিষ্ক আসলে পুরোনো অভ্যাসও খুঁজে বেড়ায়
একসময় হয়তো কাজের বিরতিতে তাকে ফোন করতেন, বার্তা পাঠাতেন কিংবা দিনের ছোট ছোট ঘটনা ভাগ করে নিতেন। সম্পর্ক শেষ হলেও সেই অভ্যাস একদিনে বদলায় না। তাই পুরোনো রুটিনের জায়গা ফাঁকা হয়ে গেলে মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই সেই অভ্যাসের মানুষটিকে খুঁজতে থাকে।
অসমাপ্ত অনুভূতি উৎপাদনশীলতাকেও প্রভাবিত করতে পারে
অনেক সময় মানুষ বুঝতেই পারেন না কেন আগের মতো কাজে মন বসছে না। কারণ, ভেতরে ভেতরে মস্তিষ্ক এখনো সেই সম্পর্ক, বিচ্ছেদ বা অপূর্ণ অনুভূতিকে বোঝার এবং গ্রহণ করার চেষ্টা করছে। এই মানসিক প্রক্রিয়া অজান্তেই মনোযোগ ও কর্মক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
‘ভাবব না‘ বললেই কেন আরও বেশি মনে পড়ে?
মনোবিজ্ঞানে Ironic Process Theory নামে একটি ধারণা রয়েছে। এর অর্থ, কোনো চিন্তাকে জোর করে দূরে সরিয়ে রাখতে চাইলে মস্তিষ্ক উল্টো সেটির দিকেই বেশি নজর দেয়। ফলে যত বেশি নিজেকে বলেন, “তার কথা ভাবব না”, ততই সেই স্মৃতি অপ্রত্যাশিতভাবে ফিরে আসতে পারে।
এর মানে কি আপনি সামনে এগোতে পারছেন না?
সব সময় নয়। কাউকে গভীরভাবে ভালোবাসার পর তার স্মৃতি মাঝে মাঝে ফিরে আসা একেবারেই স্বাভাবিক। এটি অনেক ক্ষেত্রেই মানসিক পুনরুদ্ধার বা হিলিং প্রসেসের অংশ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতির তীব্রতা কমে আসে, যদি মানুষ নিজের অনুভূতিগুলোকে অস্বীকার না করে বরং সেগুলোকে স্বীকার করে স্বাস্থ্যকর উপায়ে সামলাতে শেখে।
তবে যদি সেই স্মৃতি প্রতিদিনের কাজ, ঘুম, মনোযোগ, সম্পর্ক বা স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাহত করতে থাকে, তাহলে সেটিকে শুধু সময়ের ওপর ছেড়ে না দিয়ে একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের সহায়তা নেওয়া উপকারী হতে পারে।
মুভ অন মানে ভুলে যাওয়া নয়
অনেকেই মনে করেন, মুভ অন করা মানে প্রিয় মানুষটিকে পুরোপুরি ভুলে যাওয়া। বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন। মুভ অন মানে হলো স্মৃতিগুলোকে অস্বীকার না করে সেগুলোর সঙ্গে এমনভাবে মানিয়ে নেওয়া, যাতে সেগুলো আর প্রতিদিনের জীবন, কাজ বা মানসিক শান্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে।
কাজের মাঝেও যদি হঠাৎ তার কথা মনে পড়ে, সেটি সব সময় দুর্বলতার লক্ষণ নয়। বরং এটি ইঙ্গিত দিতে পারে যে আপনার মন এখনো কিছু অসমাপ্ত অনুভূতি গুছিয়ে নিচ্ছে। নিজেকে সময় দেওয়া, নতুন অভ্যাস গড়ে তোলা, কাছের মানুষের সঙ্গে কথা বলা এবং প্রয়োজনে পেশাদার সহায়তা নেওয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে সেই আবেগের তীব্রতা কমে আসে। তখন শুধু কাজে নয়, জীবনেও আবার স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে পাওয়া সম্ভব।



