বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬
জীবনযাপন

অ্যান্টি-অ্যাংজাইটি জুয়েলারি: স্ট্রেস কমাবে গয়না?

c69f22a91cb2d5f3c337ef82194823ba-6a64992229820

ফ্যাশন এখন আর শুধু সৌন্দর্যের প্রকাশ নয়; বরং ব্যক্তিগত স্বস্তি, মানসিক সুস্থতা ও দৈনন্দিন অভ্যাসের সঙ্গেও জড়িয়ে যাচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে অ্যান্টি-অ্যাংজাইটি জুয়েলারি বা ফিজেট জুয়েলারি। দেখতে সাধারণ আংটি, ব্রেসলেট কিংবা নেকলেসের মতো হলেও এগুলোর নকশায় থাকে এমন কিছু চলমান বা স্পর্শনির্ভর উপাদান, যা আঙুল দিয়ে ঘোরানো, চাপ দেওয়া কিংবা নাড়ানো যায়। অনেকেই মনে করছেন, এই ছোট্ট অভ্যাস উদ্বেগের মুহূর্তে মনকে কিছুটা শান্ত রাখতে সাহায্য করে।

কী এই অ্যান্টি-অ্যাংজাইটি জুয়েলারি?

অ্যান্টি-অ্যাংজাইটি জুয়েলারি মূলত এমন গয়না, যেগুলো ব্যবহারকারী ইচ্ছেমতো নাড়াতে বা ঘোরাতে পারেন। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত স্পিনার রিং। এই আংটির বাইরের অংশটি আলাদাভাবে ঘোরানো যায়।

এ ছাড়া ব্রিদিং নেকলেস, পুঁতির ব্রেসলেট কিংবা খাঁজযুক্ত বা স্পর্শে ভিন্ন অনুভূতি দেয়, এমন আংটিও এ ধরনের গয়নার অন্তর্ভুক্ত। বাইরে থেকে এগুলো সাধারণ গয়নার মতোই দেখায়। তাই কর্মক্ষেত্র, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে আলাদা করে নজরে না পড়েও ব্যবহার করা যায়।

Advertisements

এখানে আলাদা করে উল্লেখ করা হলো ব্রিদিং নেকলেস সম্পর্কে। এটি এমন একটি পরিধানযোগ্য (ওয়্যারেবল) ওয়েলনেস অনুষঙ্গ, যা ধীরে, গভীর ও নিয়ন্ত্রিতভাবে শ্বাস ছাড়তে উৎসাহ দেয়। এই নেকলেসের পেনডেন্টে থাকা সরু ফাঁপা নকশা শ্বাসের প্রবাহকে ধীর করে, ফলে স্বাভাবিকভাবেই গড়ে ওঠে ছন্দময় ও সচেতন শ্বাসপ্রশ্বাসের অভ্যাস। উদ্বেগ, মানসিক চাপ বা অতিরিক্ত অস্থিরতার মুহূর্তে নিজেকে শান্ত রাখতে এটি অনেকেই ব্যবহার করেন। ওয়েলনেস অ্যাকসেসরি হিসেবে ব্রিদিং নেকলেস জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্বেগের সময় অনেকেই অজান্তেই কলম ঘোরান, পা নাড়ান, নখ কামড়ান, কাপড়ের প্রান্ত নিয়ে খেলেন কিংবা আঙুল নড়াচড়া করেন। মনোবিজ্ঞানে এই আচরণকে ফিজেটিং বলা হয়। অ্যান্টি-অ্যাংজাইটি জুয়েলারি সেই স্বাভাবিক প্রবণতাকেই আরও নান্দনিক ও ব্যবহারযোগ্য রূপ দিয়েছে। বিশেষ করে জেন–জি এমন পণ্য পছন্দ করছে, যা একদিকে ফ্যাশন অনুষঙ্গ, অন্যদিকে ব্যক্তিগত স্বস্তির একটি ছোট্ট মাধ্যম।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবও। টিকটকে ‘কমফোর্ট নেকলেস’ নামে একটি প্রবণতায় দেখা যায়, অনেক তরুণ-তরুণী উদ্বেগ বা অস্থিরতার মুহূর্তে গলার হার স্পর্শ করেন বা ধরে রাখেন। লাখো দর্শক পাওয়া ভিডিওগুলোর মাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। মনোবিজ্ঞানীদের ভাষ্য, প্রিয় কোনো গয়না অনেকের জন্য গ্রাউন্ডিং অবজেক্ট বা মানসিক স্থিতি ফিরিয়ে আনতে সহায়ক বস্তু হিসেবে কাজ করতে পারে। পরিচিত কোনো বস্তু স্পর্শ করার মাধ্যমে কেউ কেউ সাময়িক মানসিক স্বস্তি বা নিরাপত্তাবোধ অনুভব করেন। তবে এটি সবার ক্ষেত্রে একইভাবে কাজ করে না; এর কার্যকারিতা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে।

চিকিৎসকেরা কী বলছেন?

মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যান্টি-অ্যাংজাইটি জুয়েলারি কিছু মানুষের ক্ষেত্রে উদ্বেগ বা চাপের মুহূর্তে মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে নিতে কিংবা হাত ব্যস্ত রাখার মাধ্যমে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। আংটি ঘোরানো, পুঁতি সরানো বা একই ধরনের পুনরাবৃত্তিমূলক নড়াচড়া অনেকের জন্য আত্মনিয়ন্ত্রণের একটি উপায় হিসেবেও কাজ করতে পারে। তবে চিকিৎসকদের জোরালো মত হলো, এ ধরনের গয়না উদ্বেগজনিত সমস্যার কোনো চিকিৎসা নয় এবং এটি ওষুধ বা কাউন্সেলিংয়ের বিকল্পও হতে পারে না। উদ্বেগ, আতঙ্ক বা মানসিক চাপ যদি দীর্ঘদিন ধরে থাকে কিংবা দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে, তাহলে অবশ্যই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

বিজ্ঞান কী বলছে?

এ বিষয়ে গবেষণার ফল এখনো একমুখী নয়। মনোবিজ্ঞানের কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, ফিজেটিং মানুষের স্বাভাবিক আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের (সেলফ-রেগুলেশন) একটি অংশ। অর্থাৎ ছোট ছোট পুনরাবৃত্তিমূলক নড়াচড়া অনেকের ক্ষেত্রে মনোযোগ ধরে রাখতে বা অস্থিরতা সামলাতে সহায়ক হতে পারে। ফিজেট জুয়েলারি সেই কাজটিই আরও নান্দনিক ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য উপায়ে করার সুযোগ দেয়। তবে এ বিষয়ে ভিন্ন মতও রয়েছে। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ফ্যাশনবিষয়ক অনলাইন প্রকাশনা ‘ফ্যাশনিস্তা’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিউইয়র্কের ফ্যাশন ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এফআইটি) মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড্যানিয়েল বেঙ্কেনডর্ফ বলেন, ফিজেট ডিভাইস বা ফিজেট জুয়েলারি উদ্বেগ কমায়, এমন জোরালো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতাকে অলৌকিক সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারও কারও জন্য এটি উদ্বেগের মুহূর্তে সাময়িক স্বস্তি বা মনোযোগ ধরে রাখার একটি ব্যক্তিগত উপায় হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ, আতঙ্ক বা মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো পেশাদার চিকিৎসা, কাউন্সেলিং এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ।

Advertisements
অ্যান্টি-অ্যাংজাইটিঅ্যান্টি-অ্যাংজাইটি জুয়েলারিস্ট্রেস