Skip to content

১১ই আগস্ট, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | বৃহস্পতিবার | ২৭শে শ্রাবণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

বোধে আমরা কবে দীক্ষা পাবো

মানুষ মানুষের জন্য,জীবন জীবনের জন্য। ভুপেন হাজারিকা বলে গেছেন অনেক বছর আগে। গানটা আমরা সবাই প্রায় গুনগুনকরে গেয়ে উঠি। কিন্তু আমরা কি এই গানের অর্থ কখনো মেনে নেই? আমরা কতটা একজন মানুষকে অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করি তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে আমরা কেমন আচরণ করি মানুষের সঙ্গে ! আমাদের আচরণে কোন মানুষটা খুশি হয়, আর কোন আচরণে সেই মানুষটা কষ্ট পায়, সেটা আমরা কখনো ভেবে দেখি না।

সবসময়ই কি আমরা নিজেদের আশেপাশের মানুষের কথা বলার ভাষা,গায়ের রঙ কিংবা তাঁর পোশাক নিয়ে কথা নিজের অজান্তেই মন্তব্য করে ফেলি না? কিন্তু কেনো করি আমরা এমন? আমাদের শিক্ষা না হয় আছে একটা কাগজে কলমে । আমাদের দীক্ষা কোথায়?

দীক্ষা হচ্ছে, বিদ্যার্জন ও আচরণ, লেখাপড়া ও স্বভাব অর্জন। অর্থ্যাৎ, কেবল পাঠ্যপুস্তক না, এর বাইরেও আচরণ ও স্বভাব অর্জনই হচ্ছে দীক্ষার উদ্দেশ্য। যাকে আমরা ইংরেজিতে ম্যানার্স বলি। একজন মানুষ কতটুকু সদ্ভাব বজায় রেখে চলবে, সেই শিক্ষাই সে দীক্ষা থেকে পায়।

আর শিক্ষা হচ্ছে পাঠপুস্তক পড়ে, জ্ঞান অর্জন করে সেই শিক্ষাকে কাজে লাগানো। কিন্তু শিক্ষা আমরা যতটা গ্রহণ করি ততটা দীক্ষা অর্জন করি না। দীক্ষা অনেকটা আমাদের কাছে একটা এক্সট্রা কারিকুলাম এক্টিভিটিসের মতো। অনুসরণ করলে করলাম, না করলে কোনো বাড়তি নম্বর কাটা যায় না। দীক্ষার যাবতীয় বিষয় শুনতে অপ্রয়োজনীয় শোনালেও দীক্ষার অভাব মানবজীবনে মানবতার অবক্ষয় নিয়ে আসে প্রবল রূপে।

আমাদের দীক্ষার যে কতটা অভাব, সেটা রাস্তাঘাটে দুই কদম এগোলেই বোঝা যায়। রাস্তাঘাটের চারিদিকে লোকের ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট, রাস্তাঘাটে লোকজনের কথা বার্তা বলার ধরন এবং মানুষের প্রতি মানুষের নির্দয় দৃষ্টিভঙ্গিই দীক্ষা পাওয়ার অংশের বহির্প্রকাশ।

একথা অস্বীকরার করার উপায় নেই যে, আমাদের মধ্যে ন্যূনতম ভদ্রতা জ্ঞানটুকু নেই। ভদ্রলোক হলে আমরা কখনো রাস্তাঘাটে যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলতাম না। আমরা কখনো এই কথা ভেবে নিতাম না যে, অমুক মানুষের পোশাক দিয়ে তাঁকে বিচার করা যায়। আমরা কখনো শিক্ষা রাস্তায় অভদ্রের মতো বিনা কারণে হর্ন বাজাতাম না। কিন্তু অভদ্রতা বিষয়টা এমনই যে এটা কখনো লুকোনো যায় না। কোনো না কোনোভাবে সামনে চলেই আসে।

গুরুজনকে সম্মান করা, শিক্ষককে সম্মান করা এটাও একটা দীক্ষার অংশ। আমরা এখন শিক্ষকদের নিজ হাতে মারধর করি। শিক্ষক মানে যে একজন সম্মানীয় ব্যক্তি । শিক্ষক যে মাতা পিতার সমান সেটা হয়তো আমরা ভুলেই গেছি। আমরা শিক্ষককে গ্রেফতার করাই নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য।

যেকোনো পাবলিক প্লেসে গেলে মানুষ সবসময় নিজের সুবিধা আগে দেখে। তার কাছে কখনোই অন্যের প্রতি সদয় দৃষ্টিভঙ্গির কথা মাথায়ও আসে না। কখনো মনে হয় না, নিজের জায়গাটা ছেড়ে অন্যকে জায়গা করে দেই বরং অন্যের কাজকে নিজের মনে করার চেষ্টা করি।

এইসব সাধারণ দীক্ষাবোধ কাজ করে না বলেই নারীদের প্রতি দৃশটিভঙ্গি কখনোই সদয় হয় না। সদয় দৃষ্টিভঙ্গি নারীর দরকার নেই। অন্তত ন্যায্য বোধটাও কাজ করে না । সে কারণে নারীদের রাস্তাঘাটে একটা ন্যূনতম নিরাপদ পরিবেশও থাকে না। এখনো নারীদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলাকে নিজের গৌরব বলে মনে করে মানুষ।

আমাদের বোধে দীক্ষা পাওয়ার শিক্ষাটি শুরু করা উচিত ছোটবেলা থেকেই। পরিবার থেকে মানুষ নিজেকে গ্রুমিং করে নেয় ছোটোকাল থেকেই । কিন্তু একজন মানুষের নিজেরই যদি বোধ না থাকে কোনো তাহলে কিভাবে সে নিজের সন্তানকে শিক্ষা দেবে? তাই দিনের পর দিন এমন দুষ্ট চক্র ভর করেছে আমাদের ওপর। চাইলেই আমরা সভ্য জাতি হয়ে উঠতে পারি না। চাইলেই আমরা নিজের জন্য এবং অন্যের জন্য একটা সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারি না। কারণ সমস্যাটা আমাদের মূলে।

তাই এখন থেকে বোধের শিক্ষা শুরু করতে হবে স্কুল ও পরিবার থেকেই। একজন শিশু যেন বড় হয়ে আরেকজন মানুষের জীবনে দুর্দশার কারণ না হয়, সেটা খেয়াল রাখতে হবে। তার জন্য পাঠ্যবই পড়ানোর পাশাপাশি স্কুল থেকেই শিক্ষা দিতে হবে, কিভাবে নিজের যত্ন নিতে হয়। কিভাবে একজন দায়িত্বশীল নাগরিকের মতো আচরণ করতে হয় এবং কিভাবে অন্যকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করতে হয়। তাহলেই একজন মানুস বোধে উন্নত হবে । এবং দীক্ষিত হবে।