বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬
বিশ্লেষণ

সরকারি চাকরিতে নারী কোটা: প্রয়োজন ফুরিয়েছে, নাকি এখনো প্রাসঙ্গিক?

2-20240709104420

সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা নিয়ে বাংলাদেশে বিতর্ক নতুন নয়। গত এক দশকে এই বিতর্ক রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংবিধানিক নানা মাত্রা পেয়েছে। বিশেষ করে ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় কোটা প্রশ্নটি নতুনভাবে আলোচনায় আসে। কিন্তু এই দীর্ঘ বিতর্কের মধ্যে একটি বিষয় তুলনামূলকভাবে আড়ালেই থেকে গেছে—সরকারি চাকরিতে নারীদের জন্য সংরক্ষিত কোটার বিলুপ্তি এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব।

কোটা নিয়ে আলোচনায় সাধারণত দুটি ধারণা সামনে আসে—সমতা (Equality) এবং ন্যায্যতা (Equity)। এই দুটি শব্দ অনেক সময় একই অর্থে ব্যবহার করা হলেও বাস্তবে তাদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সমতা বলতে সবাইকে একই সুযোগ দেওয়া বোঝায়, আর ন্যায্যতা বলতে বোঝায় প্রত্যেককে তার বাস্তব অবস্থান ও প্রয়োজন অনুযায়ী সুযোগ নিশ্চিত করা। সমাজের সব মানুষ যদি একই জায়গা থেকে যাত্রা শুরু না করে, তাহলে সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য করলেই প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না।

বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে নারী কোটার সূচনা হয়েছিল স্বাধীনতার পরপরই। তখন রাষ্ট্রের লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন কারণে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় যুক্ত করা। সময়ের সঙ্গে কোটার ধরন ও পরিমাণ পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু নারীদের জন্য সংরক্ষিত অংশ দীর্ঘ সময় ধরে বহাল ছিল। এর পেছনে যুক্তি ছিল স্পষ্ট—শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীরা তখনও উল্লেখযোগ্য বৈষম্যের শিকার ছিলেন।

২০১৮ সালে কোটা সংস্কারের দাবিতে দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটাব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগের সুযোগ বৃদ্ধি। আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে প্রায় সব ধরনের কোটা বাতিল করে দেয়। এর সঙ্গে নারীদের জন্য সংরক্ষিত ১০ শতাংশ কোটাও বিলুপ্ত হয়।

Advertisements

এই সিদ্ধান্তে অনেকের মতে নিয়োগব্যবস্থায় সমতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু অন্য একটি মত হলো, একই সঙ্গে নারী কোটা বাতিলের ফলে এমন একটি জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যারা এখনো সামাজিক ও কাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি প্রকৃত সমতা, নাকি ন্যায্যতার ঘাটতি?

গত কয়েক বছরে সরকারি বিভিন্ন ক্যাডারে নারীদের অংশগ্রহণ নিয়ে বিভিন্ন পরিসংখ্যান নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে প্রশাসন, পুলিশ, কূটনীতি এবং কিছু কারিগরি ক্যাডারে নারীদের নিয়োগ আগের তুলনায় কমেছে বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। কিছু বিসিএস পরীক্ষায় নির্দিষ্ট ক্যাডারে কোনো নারী সুপারিশ না পাওয়ার ঘটনাও জনপরিসরে আলোচিত হয়েছে। যদিও এই পরিবর্তনের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে, তবু নারী কোটা বাতিলের প্রভাব নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

বাংলাদেশের সংবিধান নারী-পুরুষের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা দিয়েছে। একই সঙ্গে সংবিধানে রাষ্ট্রকে নারীদের এবং অন্যান্য অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগও দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সংবিধান একদিকে সমান অধিকারের কথা বলে, অন্যদিকে বাস্তব বৈষম্য দূর করতে প্রয়োজন হলে ইতিবাচক ব্যবস্থা নেওয়ার পথও উন্মুক্ত রেখেছে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক সংবিধান বিশেষজ্ঞ মনে করেন, কোটা কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নয়; বরং এটি একটি নীতিগত উপকরণ, যা সামাজিক বাস্তবতার আলোকে প্রয়োগ, সংশোধন কিংবা প্রত্যাহার করা যেতে পারে। অর্থাৎ রাষ্ট্র চাইলে নির্দিষ্ট সময় পরপর নারী কোটার প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও সরকারি চাকরি, শিক্ষা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে বিভিন্ন ধরনের ইতিবাচক ব্যবস্থা দেখা যায়। কোথাও কোটা, কোথাও সংরক্ষিত আসন, আবার কোথাও নিয়োগ বা পদোন্নতিতে বিশেষ নীতিমালা অনুসরণ করা হয়। এসব ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য একটাই—ঐতিহাসিক ও সামাজিক বৈষম্যের প্রভাব কমিয়ে নারীদের জন্য তুলনামূলক সমান সুযোগ তৈরি করা।

অবশ্য নারী কোটার সমালোচনাও রয়েছে। সমালোচকদের মতে, সরকারি চাকরিতে একমাত্র যোগ্যতাই বিবেচ্য হওয়া উচিত। তাদের যুক্তি, সংরক্ষিত কোটা দীর্ঘদিন বহাল থাকলে প্রতিযোগিতার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। তাদের মতে, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে নারীদের সক্ষমতা বাড়ানোই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।

অন্যদিকে নারী অধিকারকর্মী ও নীতিনির্ধারণী বিষয়ে গবেষকদের একটি অংশের মত হলো, শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ এখনও সমাজের সব স্তরের নারীর জন্য সমান নয়। গ্রামীণ ও শহুরে নারীর বাস্তবতা এক নয়, অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল ও প্রান্তিক পরিবারের মেয়েদের সুযোগও সমান নয়। তাই শুধু কাগজে-কলমে সমান সুযোগ ঘোষণা করলেই বাস্তব বৈষম্য দূর হয় না।

এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—রাষ্ট্র কি কেবল সমান নিয়ম প্রণয়ন করলেই দায়িত্ব শেষ, নাকি বাস্তব বৈষম্য কমানোর জন্য বিশেষ উদ্যোগও নেওয়া উচিত?

নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে হয়তো সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ পথ হতে পারে নিয়মিত মূল্যায়ন। যদি দেখা যায়, সরকারি চাকরিতে নারীদের প্রতিনিধিত্ব স্থিতিশীল ও সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাহলে কোটা পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। আবার যদি পরিসংখ্যান দেখায় যে নারীদের অংশগ্রহণ ধারাবাহিকভাবে কমছে বা কাঠামোগত বাধা এখনো বিদ্যমান, তাহলে সীমিত ও যৌক্তিক আকারে ইতিবাচক ব্যবস্থা বিবেচনা করা হতে পারে।

নারী কোটা নিয়ে বিতর্ক মূলত মেধা বনাম কোটার নয়; বরং সমান সুযোগ এবং ন্যায্য সুযোগের মধ্যে ভারসাম্য খোঁজার প্রশ্ন। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রয়োজন এমন নীতি, যা একদিকে মেধাকে মূল্যায়ন করবে, অন্যদিকে সমাজের বাস্তব বৈষম্যকেও অস্বীকার করবে না।

সরকারি চাকরিতে নারী কোটার ভবিষ্যৎ কী হবে, সে সিদ্ধান্ত নেবে রাষ্ট্র। তবে সেই সিদ্ধান্ত যেন রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে গিয়ে তথ্য, গবেষণা, সংবিধানের চেতনা এবং সমাজের বাস্তব প্রয়োজনের ভিত্তিতে নেওয়া হয়—এটাই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা।

Advertisements
কোটাচাকরিনারীসরকার