পরিবারকে বাঁচাতে রুকসানার চ্যালেঞ্জ

২০০৯ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর। জম্মু ও কাশ্মীরের রাজৌরি জেলার একটি ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম। গভীর রাতে চারদিকে যখন নিস্তব্ধতা, তখনই নেমে আসে আতঙ্ক। লস্কর-ই-তৈবার তিন সশস্ত্র জঙ্গি হানা দেয় কৃষক পরিবারের একটি সাধারণ বাড়িতে। তাদের লক্ষ্য ছিল পরিবারের কুড়ি বছর বয়সী তরুণী রুকসানা কওসারকে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া।
রুকসানা ছিলেন এক সাধারণ গ্রামের মেয়ে। আর্থিক সংকটের কারণে দশম শ্রেণির পর তাঁর পড়াশোনা থেমে যায়। কিন্তু জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাঁকে যে সাহস, ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাস শিখিয়েছিল, সেটিই পরবর্তীতে তাঁকে অসাধারণ এক ইতিহাসের অংশ করে তোলে।
সেই রাতে জঙ্গিরা দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে পরিবারের সদস্যদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে। তারা রুকসানাকে তাদের হাতে তুলে দিতে বলে। কিন্তু তাঁর বাবা দৃঢ়ভাবে অস্বীকৃতি জানান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে জঙ্গিরা বন্দুকের বাঁট দিয়ে তাঁর বাবা, মা ও ভাইকে মারধর শুরু করে।
ঘরের এক কোণে লুকিয়ে থাকা রুকসানা নিজের চোখের সামনে পরিবারের ওপর এই নির্মম নির্যাতন দেখতে থাকেন। ভয় ছিল, আতঙ্কও ছিল। কিন্তু খুব দ্রুত তিনি বুঝে যান- নীরব থাকলেও মৃত্যু নিশ্চিত হতে পারে। তাই পালানোর বদলে তিনি প্রতিরোধের পথই বেছে নেন।
ঘরের কোণে রাখা একটি কুঠার হাতে তুলে নিয়ে তিনি আচমকা জঙ্গিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। প্রথম আঘাতেই দলের এক সদস্য গুরুতর আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। সুযোগ বুঝে রুকসানা তার কাছ থেকে রাইফেল ছিনিয়ে নেন এবং গুলি চালান। ঘটনাস্থলেই নিহত হয় সেই জঙ্গি।
এরপর তিনি আরেকটি অস্ত্র তুলে দেন তাঁর ভাইয়ের হাতে। ভাই-বোন মিলে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত এই প্রতিরোধে হতভম্ব হয়ে পড়ে বাকি দুই জঙ্গি এবং শেষ পর্যন্ত পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
নিহত জঙ্গির পরিচয় পরে প্রকাশ পায়। সে ছিল লস্কর-ই-তৈবার কুখ্যাত কমান্ডার আবু ওসামা, যাকে দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী খুঁজছিল। তার মাথার ওপর পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, রুকসানা কওসারের কোনো সামরিক প্রশিক্ষণ ছিল না। বন্দুক চালানোরও কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল না। তবু চরম বিপদের মুহূর্তে তিনি যে সাহস ও উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছিলেন, তা শুধু তাঁর পরিবারকেই রক্ষা করেনি, বরং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের এক শক্তিশালী প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
এই অসাধারণ সাহসিকতার স্বীকৃতি হিসেবে ভারত সরকার তাঁকে দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ শান্তিকালীন বীরত্ব পদক কীর্তি চক্র প্রদান করে। পরে তিনি জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশে কনস্টেবল হিসেবে যোগ দেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করেন। রুকসানা কওসারের গল্প শুধু একজন সাহসী নারীর গল্প নয়; এটি সংকটের মুহূর্তে মানুষের অদম্য মানসিক শক্তিরও গল্প। তিনি প্রমাণ করেছেন, অসাধারণ সাহস জন্মগত কোনো বৈশিষ্ট্য নয়। অনেক সময় জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণেই একজন সাধারণ মানুষ ইতিহাস রচনা করেন।
রুকসানার সেই এক রাত আজও মনে করিয়ে দেয়-অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করে দাঁড়িয়ে যাওয়ার সাহস কখনও কখনও সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হয়ে ওঠে।



